আশা ভোসলেকে নিয়ে কুমার শানু। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আমি দেশের বাইরে। আমেরিকায়। সেখানে বসে শুনলাম, আশা ভোসলে প্রয়াত। ওঁর কাছে আমি সন্তানসম। আশাদিদি আমার মা। খবর শুনে মনে হল, আজ নিজের মা ছেড়ে চলে গেলেন।
শাড়ির সঙ্গে মানানসই ব্রেসলেট। হয় মুক্তো, নয় হিরে। এই আমার আশাদিদি। ভীষণ আধুনিকা, সমসাময়িক। কিন্তু কখনও ভারতীয় সংস্কৃতিকে অশ্রদ্ধা করেননি। ওঁর যাবতীয় সাজ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা শাড়িকে কেন্দ্র করেই। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলে-- দু’জনের সঙ্গেই আমার অনেক জনপ্রিয় গান। অনেক অনুষ্ঠান, অনেক স্মৃতি। আশাদিদি ভিন্ন ধাতুতে গড়া। লতাদিদি যেমন প্রয়োজনের বাইরে কথাই বলতেন না। খুব চুপচাপ। আশাদিদি উল্টো। সারা ক্ষণ হইহই করছেন।
বিদেশে আমরা একবার গানের অনুষ্ঠান করতে গিয়েছি। আশাদিদির সঙ্গে আমি। ছ’দিন এক সঙ্গে ছিলাম আমরা। ওই সময়ে ওঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। অনেক কিছু শিখেছি। ভীষণ ভোলেভালা একজন মানুষ। এই রাগ তো পর ক্ষণেই সেটা গলে জল।
ওই সময়ের একটা ঘটনা বলি। অনুষ্ঠানমঞ্চের গ্রিন রুমে আমরা। আশাদিদি মঞ্চে উঠবেন। আমি ওঁর হাত জড়িয়ে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে দেখি, ওঁর হাত বরফের মতো ঠান্ডা! আমি অবাক। এত বছরের অভিজ্ঞতা। ঝুলিতে এত গান। এত সাধনা। এত মঞ্চানুষ্ঠান। তার পরেও ভয়? হাত ঠান্ডা! প্রশ্ন করেছিলাম আশাদিদিকে। দিদি বলেছিলেন, ‘‘এটা আছে বলেই আমি এখনও গাইতে পারছি। যে দিন এই ভয়, এই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া থাকবে না, সে দিন আশা ভোসলে শেষ।’’
মায়ের মতো দিদির থেকে শিখেছি, কী ভাবে মাটির কাছাকাছি থাকতে হয়। কী ভাবে কখনও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হতে নেই। কী ভাবে গাইলে শ্রোতার মন ছুঁতে পারব, এ রকম অনেক কিছু। লতা এবং আশাদিদিকে নিয়ে অনেক কথা। আমি বিশ্বাস করি না। করি না, কারণ, প্রতিভা কখনও দাবিয়ে রাখা যায় না। সে ঠিক প্রকাশিত হবেই। এক জায়গায় না হলে অন্য জায়গায়। আশা ভোসলের ক্ষেত্রেও আমার সেটাই মত।
দিদি চলে গেলেন। আমার কাছে ওঁর কত স্মৃতি। ‘ইজাজ়ত’ ছবিতে দিদির গাওয়া সেই গানের মতো, ‘মেরা কুছ সামান/তুমহারে পাস পড়া হ্যায়...’। জানি, দিদি বলবেন না, ‘উহ ভিজওয়া দো / মেরা উও সামান লৌটা দো...।’ আপাতত এই নিয়েই আমার দিনযাপন।