Vikram Chatterjee Interview

জীবনের যে কোনও বড় ঘটনা মানুষকে বদলে দেয়, আমাকেও বদলেছে: বিক্রম

সম্প্রতি অভিনেতা থেকে প্রযোজক হয়ে ‘তারকাটা’ ওয়েব সিরিজ় নিয়ে ফিরেছেন তিনি। ইন্ডাস্ট্রিতে অন্ধকার সময় থেকে আলোয় ফেরা, আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডায় অভিনেতা তথা নতুন প্রযোজক বিক্রম চট্টোপাধ্যায়।

Advertisement
অনসূয়া বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ১০:১৩
প্রযোজনায় হাতেখড়ি বিক্রমের।

প্রযোজনায় হাতেখড়ি বিক্রমের। ছবি: সংগৃহীত।

বড়পর্দা দিয়ে টলিউডে অভিষেক। তবে ছোটপর্দায় তাঁকে আপন করে নিয়েছে দর্শক। প্রথম থেকেই অন্য ধারার চরিত্র তাঁর পছন্দের। আর নতুন পালক যুক্ত হয়েছে তাঁর মুকুটে। অভিনেতা থেকে প্রযোজক হয়েছেন বিক্রম। ‘তারকাটা’ ওয়েব সিরিজ় নিয়ে ফিরেছেন তিনি। ইন্ডাস্ট্রিতে অন্ধকার সময় থেকে আলোয় ফেরা, আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডায় বিক্রম চট্টোপাধ্যায়।

Advertisement

প্রশ্ন: প্রযোজক হিসাবে পথচলা শুরু করলেন, উপলব্ধি কেমন?

বিক্রম: খুবই উচ্ছ্বসিত আমি। তবে প্রযোজকের কাজ চ্যালেঞ্জিংও বটে। সব মিলিয়ে মিশিয়ে অন্য অনুভূতি। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল, সিনেমা নিয়ে কত কিছু শেখার বাকি ছিল আমার। নানা চ্যালেঞ্জ নতুন করে শেখা। অভিনেতা হিসাবে কখনওই জানতে হয়নি। এগুলো নতুন করে শেখা। প্রযোজকদের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি দুটোই বেড়েছে। এটা আসলে ‘থ্যাঙ্কলেস জব’। সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে এসে পড়লে বোঝা যায়। আগে তো অভিনেতা হিসাবে নানা অভিযোগ করেছি, কী কী সমস্যা হতে পারে বুঝিনি। নিজে না করলে বুঝতে পারা যায় না।

প্রশ্ন: আপনি তো ফ্যামিলি ম্যান, পরিবার এবং কাজকে আলাদা করে রাখেন কী ভাবে?

বিক্রম: জীবন থেকে ঠেকে শিখেছি। জীবনের কোনও একটা সময় মনে হয়েছিল, যা-ই হয়ে যাক না কেন, আসলে হাতে গোনা কিছু মানুষ পাশে থাকেন। পরিবার বাবা-মা, বোন, কাছের বন্ধুরাই পাশে থাকেন। এদের বাইরে কাউকে পাওয়া যায় না। কঠিন সময়ে যাঁরা পাশে থাকেন তাঁদের প্রাধান্য দেওয়া আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমার ঠেকে শেখা।

‘ফ্যামিলি ম্যান’ বিক্রম।

‘ফ্যামিলি ম্যান’ বিক্রম। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: কাজের বাইরে, অবসর যাপন কী ভাবে করেন?

বিক্রম: পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই। আর পাহাড়ে বেড়াতে যাই। সিনেমা দেখাটা এর মধ্যে বললাম না। কারণ, ওটা আমার রোজকার হোমওয়ার্কের মধ্যে পড়ে। সব ধরনের ছবি দেখতে পছন্দ করি। সিনেমা দেখে শেখার চেষ্টা করি, নিজেকে উন্নীত করি। সবচেয়ে ভাল সিনেমা, সবচেয়ে খারাপ সিনেমা, সবচেয়ে বোরিং সিনেমা, সবচেয়ে এন্টারটেনিং সিনেমা দেখি। সব কিছুই কিছু না কিছু শেখায়। অভিনেতা হিসাবেও এবং আগামী দিনে প্রযোজক হিসাবেও।

প্রশ্ন: ভাল ছবি, খারাপ ছবি বলে আদৌ কিছু হয়, বিশ্বাস করেন?

বিক্রম: ভাল ছবি, খারাপ ছবির সংজ্ঞাটা ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন। আমার মনে হয়, ছবি সততার সঙ্গে বানালে প্রত্যেক ছবিরই দর্শক তৈরি হয়। কারও খারাপ লাগবে, কারও ভাল লাগবে। নিজের দুশো ভাগ দিয়ে বিশ্বাস রেখে ছবি তৈরি করা এবং আশা করা যাতে দর্শক রিলেট করতে পারেন এবং এন্টারটেন্ড হন। বেশকিছু দিন ধরে ক্রমাগত করে যেতে পারলে ভাল ছবি তৈরি হয়।

প্রশ্ন: বিক্রমের মন ভাল রাখার মন্ত্র কি তা হলে পাহাড়?

বিক্রম: আমার কাছে পাহাড় এক অন্য অভিজ্ঞতা। রোজকার জীবন থেকে সম্পূর্ণ ছুটি নিতে পাহাড়ে চলে যাই। অভিনেতা হিসাবে যখন কাজে জর্জরিত হয়ে যাই বা এখন প্রযোজকের দায়িত্বে ডুবে যাই তখন পাহাড়ে চলে যাই। পাহাড় আমায় মাটিতে পা রেখে চলতে সাহায্য করে বলে আমার মনে হয়। পাহাড় এতই বিশাল, পাহাড়ের কোলে গেলে আমি কতটুকু এবং আমার আশপাশের সমস্যাগুলো কতটুকু সেটা বুঝি। তখন আমি কিছু আর জোর করে পর্যবেক্ষণ করি না। নিজের সঙ্গে সময় কাটাই অনেকটা। আমি ২০২৩ থেকে সোলো ট্রিপ করি। গত চার বছরে বেশিরভাগ বেড়াতে যাওয়াই একা একা। আগে মনে হত একা কী করব? কী ভাবে কাটাব? এখন মনে হয় একা বেড়াতে যাওয়াটা নেশার মতো। আমি পাহাড়ে পালিয়ে যাই, যাতে আবার নতুন করে শুরু করি। ওই সময় অভিনেতা বিক্রমও ছুটিতে থাকে।

রোজকার জীবন থেকে সম্পূর্ণ ছুটি নিতে পাহাড়ে চলে যাই।

রোজকার জীবন থেকে সম্পূর্ণ ছুটি নিতে পাহাড়ে চলে যাই। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: নেটাগরিকদের একটা প্রশ্ন থাকে, সোলো ট্রিপের ছবিগুলো কে তুলে দেয়?

বিক্রম: স্থানীয় মানুষ তুলে দেন, ড্রাইভার ছবি তুলে দেন। কতরকম মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়, তাঁরা ছবি তুলে দেন। শুধু এক বার হিমাচলে গিয়ে শুধু ঋজু বলে এক জন গিয়েছিল আমার সঙ্গে, তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা তিন জন অনেক ঘুরেছিলাম।

প্রশ্ন: পাহাড় তো বুঝলাম। আর প্রেম?

বিক্রম: পাহাড়ের প্রতি প্রেম আছে আমার। আর জীবনের প্রেমের কথা বলতে গেলে বলব, প্রেম জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালবাসাও জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা এই মুহূর্তে জীবনে না থাকলে তার পিছনে দৌড়োতে আমি বিশ্বাসী নই। এমন কোনও মানুষ নিশ্চয়ই জীবনে ছিল, থাকবে বা কেউ আসবে যাঁদের প্রতি জোর না করেই ভালবাসা তৈরি হবে। এমন কিছু হলে নিশ্চয়ই ভাল হবে। আমি খুবই প্রেমে বিশ্বাসী, কিন্তু জীবনে সব সময় যে প্রেম থাকতে হবে, এমন বাধ্যতামূলক বিষয় নেই আমার। যদি না টেকে কী করব। আমি নিজে সাহচর্যে বিশ্বাসী, আমার সঙ্গে একটা মানুষ যদি থাকে, আমার গোটা সফরের সঙ্গী হয় বুড়ো বয়সে গিয়ে আমার সুখ-দুঃখ, চড়াই, উতরাই, কঠিন সময়, ভাল সময়— সবটা নিয়ে নতুন করে বাঁচব তাঁর সঙ্গে। জীবনে দেখার তেমন কোনও মানুষ না থাকলে, বুড়ো বয়সে রিলিভ করব কী করে? এই লড়াই লড়ার, আনন্দগুলো ভাগ করে নেওয়ার বা স্মৃতিচারণ করার তো কেউ থাকবে না।

প্রশ্ন: ‘তারকাটা’ র চরিত্র আসলে কতটা ব্যতিক্রমী?

বিক্রম: আমাকে এই চরিত্রের কথা যখন বলা হয়েছিল তখনও এই গল্প তৈরি হয়নি। ‘তারকাটা’ এই নামটা আমার দেওয়া। এর আগে সিরিজ়টার অন্য নাম ছিল। আমার এই নামটা খুব মজার লাগে। আমরা কথায় কথায় তারকাটা বলে অভ্যস্ত। দুটো আলাদা চরিত্র এবং গল্পে দুটো আলাদা সময় দেখানো হয়েছে। এক জন পুলিস অফিসার তাঁর ভাইকে খুব ভালবাসেন। তাঁদের জীবনের কিছু ঘটনা ঘটে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার গল্প এটি। গল্পটার চরিত্রায়ণও অন্যরকম। আমরা ওয়েবের ক্ষেত্রে খুব সেফ থাকি। এই ধরনের গল্প আমরা কম করার চেষ্টা করি। ওয়েবে অন্য ভাষায় অনেক সাহসী কনটেন্ট তৈরি হয়। আমি চাইব সেই ধরনের কাজ আরও হোক বাংলায়।

‘তারকাটা’ সিরিজ়ের নামটা আমার দেওয়া।

‘তারকাটা’ সিরিজ়ের নামটা আমার দেওয়া। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: ‘তারকাটা’ শব্দের ভুল প্রয়োগে এটি অসম্মানজনকও হতে পারত, ভেবেছিলেন?

বিক্রম: আমরা যে জগতে বাস করি তাতে ভাল কিছু করতে গেলেও অসম্মানিত হতে হয়। সমাজমাধ্যমে আরও বেশিই তা হয়। যে কোনও কিছুরই একটা উল্টো দিক থাকতে পারে। সেটার জন্য নাম বদলাতাম না।

প্রশ্ন: টলিউডের বদল নিয়ে কী ভাবনা?

বিক্রম: আশা করছি ভাল হবে। আমাদের সকলের এই আশাই থাকে, আগে যা খারাপ হয়েছে হয়েছে। যেন ভাল কিছু ঘটে। সেই পাতাটা উল্টে বদল আসবে। আশা করব ভাল কিছু হবে। কেমন হচ্ছে না হচ্ছে সেটা অবশ্য সময় বলবে।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগত জীবনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রম কতটা বদলেছেন?

বিক্রম: নানা সময়ে বদল এসেছে। জীবনের যে কোনও বড় ঘটনা মানুষকে বদলায়, আমাকেও বদলেছে। তবে তার পরিপ্রেক্ষিতে কাছের মানুষদের আঁকড়ে থেকেছি। এটাও বুঝতে পেরেছি কারা আপন, বড় শিক্ষা এটা নিশ্চয়। যদিও জীবনের কঠিন সময় নিয়ে আলোচনার সময় নয় এটা। অন্য কোনও সময়ে এটা নিয়ে কথা বলার সুযোগ এলে বলব নিশ্চয়। আমি কাজের বাইরে কোনও কিছু নিয়ে থাকি না। সেই ভাবেই জীবনযাপন করছি। এই যাপন আমার। পরিবার আর কাছের বন্ধুরা রয়েছে। অনেকটা জুড়ে আমার কাজ রয়েছে। আমি এইটুকু নিয়েই থাকতে চাই।

Advertisement
আরও পড়ুন