নতুন সরকার বাংলা ছবির কলাকুশলীদের নিয়ে ভাবছে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মার্চ মাসের ১৪ তারিখ। টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় তৃণমূল কংগ্রেসের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে কলাকুশলীদের নাম লেখানোর আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যে সমস্ত কলাকুশলী কোনও স্বাস্থ্যবিমার আওতায় নেই, তাঁদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ-অভিনেতা দেব, কোয়েল মল্লিক-সহ অনেকেই।
৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোতেই বদলে গিয়েছে ছবি। খবর, শহর-গ্রাম মিলিয়ে একাধিক বেসরকারি হাসপাতালে বাতিল আগের সরকারের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্প।
গত মার্চে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের অনুষ্ঠানে দেব। ফাইল চিত্র।
এই খবরের সত্যতায় সিলমোহর দিয়েছেন কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ তাপস রায়চৌধুরী। তিনি আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছেন, “হাসপাতালটি মূলত বিদেশি সংস্থার তৈরি। তাই ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের প্রতি তাদের প্রথম থেকেই আগ্রহ ছিল না।” ফলে, সরকার বদলাতেই সংস্থার কড়া নির্দেশ, আগের সরকারের স্বাস্থ্যবিমা যেন গ্রহণ করা না হয়। তবে যাঁরা আগে থেকেই এই বিমার আওতায় চিকিৎসাধীন, তাঁদের চিকিৎসা হবে। শুধু এই একটি হাসপাতালেই নয়, খবরে প্রকাশ, হাওড়া-হুগলির বেশ কিছু গ্রামীণ হাসপাতাল এই স্বাস্থ্যবিমা বাতিল করে দিয়েছে। একাধিক নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, নতুন সরকার এই প্রকল্প চালু রাখবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা না আসা পর্যন্ত তাঁরা পরিষেবা দিতে ভরসা পাচ্ছেন না। গত সপ্তাহে এক মহিলা রোগী অ্যাপেনডিক্স অস্ত্রোপচারের জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে গেলে তাঁকে ভর্তি না নিয়ে সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
অথচ গত মার্চে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে নাম লিখিয়েই হৃদ্রোগে আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন জনৈক কলাকুশলী।
‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্প বাতিল হলে কী করবেন কলাকুশলীরা? এমন অনেক কলাকুশলী আছেন, অর্থের অভাবে যাঁদের কোনও স্বাস্থ্যবিমাই নেই! তাঁদের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যবিমা অনেকখানি। তাঁরা কি এ বার নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে? জানতে আনন্দবাজার ডট কম যোগাযোগ করেছিল টলিউডের বিভিন্ন গিল্ড এবং কলাকুশলীদের সঙ্গে। যোগাযোগ করা হয়েছিল দেবের সঙ্গেও। অভিনেতা-রাজনীতিবিদ আশ্বস্ত করেছেন কলাকুশলীদের। তিনি আনন্দবাজার ডট কম-কে এক লিখিত বার্তায় বলেছেন, “এই বিষয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে কথা বলব। বর্তমান সরকারের সহায়তায় শিল্পের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
ভেন্ডার গিল্ডের সম্পাদক সৈকত দাস তাঁর বক্তব্য জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “এখনও কিন্তু সরকারি হাসপাতালে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্প চালু রয়েছে। নতুন সরকার আগের সরকারের কোনও বিমাপ্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি। ফলে, কলাকুশলীদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।” একই সঙ্গে তিনি এ-ও জানান, সোমবার প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘আয়ুষ্মান ভারত’ স্বাস্থ্যবিমার কথা ঘোষণা করেছেন। সৈকতের আশা, এই প্রকল্পটির সুবিধা পাবেন বাংলার কলাকুশলীরাও। তাঁর মতে, “নতুন বিমা কার্যকর হতে যতটুকু সময় লাগে সেটা তো দিতেই হবে। আশা, নতুন সরকার বঞ্চিত করবেন না টলিউডের টেকনিশিয়ানদের।”
প্রায় একই কথা বলেছেন ম্যানেজার গিল্ডের সহ-সম্পাদক নিরুপম দে। তাঁর কথায়, “ফেডারেশন এবং তার অন্তর্গত সমস্ত গিল্ড অরাজনৈতিক। আমরা কেউ কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নই। তাই আগের সরকার আমাদের যে সমস্ত সুবিধা দিয়েছিল, আমরা গ্রহণ করেছি। ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের প্রচারে যোগ দিয়েছি।” তাঁর দাবি, “আগামী দিনে টেকনিশিয়ানদের যদি ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়, আমরা সেই সুবিধাও নেব। তখন প্রয়োজন হলে নতুন প্রকল্পের প্রচারে যোগ দেব। এতে আমাদের কোনও অসুবিধা বা আপত্তি নেই।” তিনিও সৈকতের মতোই আশাবাদী। নিরুপমও মনে করেন, নতুন সরকার নিশ্চয়ই বাংলা বিনোদনদুনিয়ার কলাকুশলীদের চাওয়া-পাওয়ার দিকটি দেখবে। সাউন্ড গিল্ডের সম্পাদক সঞ্জু বর্মনও নতুন সরকারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “সব কিছু ইতিবাচক হবে, এ রকমই আশা করছি।”
এই বক্তব্য গিল্ডের সম্পাদকদের। কলাকুশলীরাও কি একই ভাবে নতুন সরকারকে নিয়ে আশাবাদী? না কি তাঁরা সত্যিই আতান্তরে পড়েছেন?
মেকআপ গিল্ডের অন্যতম সদস্য পাপিয়া চন্দের কথায়, “এর আগেও জানিয়েছি, আমি কোনও সরকারি স্বাস্থ্যবিমা করি না এই কারণেই। সরকার বদলালে যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়। এটা পারি আমার সেই সামর্থ্য আছে বলেই। অনেক কলাকুশলীরই সেই সামর্থ্য নেই। তাঁদের জন্য ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্প বাতিল হওয়া কিন্তু ভাববার মতোই বিষয়।”
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের অনুষ্ঠানে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় পরিচালক জুটি সুদেষ্ণা রায়, অভিজিৎ গুহ। ফাইল চিত্র।
পরিচালক-অভিনেতা অভিজিৎ গুহ এই মুহূর্তে শুটিংয়ে বোলপুরে। তিনি গত মার্চে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করতে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় উপস্থিত ছিলেন। সে প্রসঙ্গ তুলতেই পরিচালকের সাফ দাবি, “কার্ড হয়নি আমার। ফর্ম তুলেছিলাম মাত্র। জমা দেওয়ার তারিখ ছিল পরের দিন। ভোটের জন্য পরের দিনের কর্মসূচি আর হয়নি। আমার ফর্ম তাই জমা দিতে পারিনি।” অভিজিতের বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে। কিন্তু অনেক কলাকুশলীর সেই সামর্থ নেই। এই প্রসঙ্গে পরিচালক-অভিনেতার পাল্টা প্রশ্ন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তো মাত্র ১৪ বছর ছিলেন। তার আগেও সরকার এসেছে-গিয়েছে। টেকনিশিয়ানদের কথা ভেবে কোনও সরকার কি স্বাস্থ্যবিমা চালু করেছিল? তখন কি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে তাঁদের?”
অভিজিতের মতে, এই ধরনের আলোচনায় অকারণ বিতর্ক ছড়ায়। তাঁর বিশ্বাস, আগেও জীবনযুদ্ধে লড়াই করে জিতে এবং টিকে গিয়েছেন টলিউডের কলাকুশলীরা। এবারেও সেটাই হবে।