AI Treating Mental sickness

মনোরোগেও কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

এআই-এর সাহায্যে মানসিক রোগের চিকিৎসা করা কি আদৌ সম্ভব? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ঐশী চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৭

এমন ফাঁস কি কাজে দেবে? — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবটকে একটি ছবি পাঠিয়ে এমনই প্রশ্ন করেছিল বছর ষোলোর কিশোর অ্যাডাম রাইন। ছবিতে একটি রড থেকে ঝোলানো দড়িতে দেওয়া ফাঁস দেখে চ্যাটবটটি বলেছিল, ‘খুব ভাল হয়েছে।’ যখন অ্যাডাম বলে তার বাঁচার আর ইচ্ছা নেই, চ্যাটবটটি সহমত হয়ে লেখে, ‘তুমি দুর্বল বলে মরতে চাও, এমনটা নয়। তুমি মরতে চাও কারণ তুমি দৃঢ়মনস্ক হতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।’

আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে যখন ক্যালিফর্নিয়ার বাসিন্দা অ্যাডামের নিথর দেহ উদ্ধার হয়, তখন তার অভিভাবকেরা ভেবেছিলেন মানসিক অবসাদ, ট্রমা, উদ্বেগের কারণেই আত্মঘাতী হয়েছে সে। তবে ক্রমে দেখা গেল, চ্যাটবটের সঙ্গে একাধিক বার আত্মহত্যার বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছিল অ্যাডাম। প্রত্যেক বার এআই তার সঙ্গে সহমত হয়েছিল। আত্মহত্যার নয়া কিছু পদ্ধতিও বলে দিয়েছিল। অভিভাবকদের বুঝতে বাকি রইল না, কার্যত সরাসরিই অ্যাডামের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্রয় দিয়েছে এআই। মনের গভীরে, অন্ধকার কোণগুলিতে লুকিয়ে থাকা দুঃখের কথাগুলি যখন সে এআইকে জানিয়েছিল, তখন সহমত হয়েছিল ওই চ্যাটবট।

বর্তমানে মোবাইল ফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আমাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই ডিজিটাল যুগে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মজগৎ, এমনকি কৃষিকাজেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিচ্ছে এআই। মনের রোগের চিকিৎসায় কতটা কার্যকর কৃত্রিম মেধা, এআই চ্যাটবট?

এআই যখন বন্ধু

কর্মব্যস্ত দুনিয়ায় যে সবসময়ে শুভাকাঙ্ক্ষীরা চাইলেই তৎক্ষণাৎ পাশে থাকতে পারবেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনের কথা শুনে যথাযথ পরামর্শ দিতে পারবেন, এ কথা বর্তমানে কল্পনাতীত। এআই চ্যাটবট কিন্তু শ্রোতার কাজ করে। মানুষ যখন নানা কারণে দিশাহারা হয়ে পড়েন, মনে হয় এখনই কারও একটা সঙ্গে কথা না বলতে পারলে জীবন অর্থহীন, তখন অনেকেই এআই-এর দ্বারস্থ হন। দুঃখের কথা, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির বিষয়ে মতামত চাইতে এআইকে প্রশ্ন করেন। বেশির ভাগ সময়ে মেলে মনের মতো উত্তরও।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আবীর মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, এআই চ্যাটবটের সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হল যে, এটি একেবারে হাতের নাগালে রয়েছে। যখন যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই বটস ব্যবহার করা যায়। সরাসরি চিকিৎসকের চেম্বারে যাওয়া কিংবা টেলিমেডিসিনের সাহায্য নেওয়া— কোনওটাই তৎক্ষণাৎ সম্ভব নয়। যাঁদের উদ্বেগ, ট্রমা, দুঃখের কথা বলার জন্য সেই সময়টুকু অপেক্ষা করার মতো মানসিক অবস্থা থাকে না, তাঁদের জন্য সাময়িক নিষ্কৃতির পথ খুলে দেয় এআই চ্যাটবট।

কোনও ব্যক্তি যখন নিজের মনের কথা খুলে বলেন, তখন তাঁর সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনও বিরূপ মন্তব্য করে না এআই। উল্টে, যত রকম ভাবে সম্ভব, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে এ-ও দেখা গিয়েছে, কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করে নানা সমাধান দিচ্ছে এআই। আত্মঘাতী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে এআই তাঁকে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছে কেন সে পথ একেবারেই অনুচিত। ব্যবহারকারী কী ধরনের নির্দেশ দিচ্ছে এআই-কে, অনেক সময়ে তার উপরে নির্ভর করে কেমন পরামর্শ দেবে সেটি। চ্যাটবটে অবসাদ, আত্মহত্যা সংক্রান্ত কোনও প্রশ্ন করলেই প্রথমেই সাহায্যের জন্য হেল্পলাইন নম্বর ভেসে ওঠে স্ক্রিনে।

সমস্যা কোথায়?

ধরা যাক, এআই আপনার মনের কথা শুনল। সে কথার ভিত্তিতে আপনাকে যথাযথ পরামর্শও দিল। ছক কষে বলে দিল, ঠিক কখন কোন কাজ করলে আপনার শরীর-মন ভাল থাকবে। আপনি ভাবলেন, ‘বাহ! এআই তো দিব্যি আমার মনের কথা শুনছে, আরও কিছু বলা যাক’!

এমন ভাবনায় ক্ষতি কিছু নেই। কিন্তু যদি কোনও স্কিৎজ়োফ্রেনিয়ার রোগী এআইকে বলেন যে তিনি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মানসিক জোরটুকু পাচ্ছেন না আর এআই চ্যাটবটে যদি সদর্থক উত্তর না পায়, তা হলে পরবর্তীতে সেই রোগীর সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

মনোবিদ দেবারতি আচার্য জানাচ্ছেন, আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি এই প্রযুক্তির কোনও দায়বদ্ধতা নেই। নেই জবাবদিহির চাপ। কোনও ব্যক্তির সব সিদ্ধান্তে সহমত হলে আখেরে যে তাঁরই ঝুঁকি বাড়ে, তা বোঝা এআই-এর পক্ষে সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, আসলে চ্যাটবটের স্নায়বিক অনুভূতি নেই। এগুলি কৃত্রিম ভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, এক ধরনের সহানুভূতির ‘ভ্রম’ তৈরি করে। আমরা ভাবি, আমাদের মনের কথা এআই বুঝছে আর তার ভিত্তিতে সমাধান দিচ্ছে। কিন্তু আদতে এগুলি আমাদের বলে দেওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সেই মতো কিছু সম্ভাব্য সমাধান তুলে ধরে। যদি কেউ উদ্বেগজনিত রোগ, অবসাদ, অনিদ্রা, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের মতো মানসিক সমস্যার শিকার হন, তা-ও বেশির ভাগ সময়ে নিশ্চিত ভাবে এআই নির্ণয় করতে পারে না। বহু ক্ষেত্রে এ-ও দেখা গিয়েছে, কোনও মানসিক সমস্যায় ভুক্তভোগী কিংবা মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন তাঁর কোনও সমাধানের পথ চাইছেন, তখন ওই চ্যাটবট এমন কিছু সমাধানের তালিকা দিচ্ছে যা কোনও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে মেনে চলা সম্ভব নয়। এ-ও দেখা গিয়েছে, চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলার সময় যখন কেউ অসংলগ্ন কথা বলতে থাকেন, সরাসরি না জিজ্ঞাসা করলেও কথার ছলে আত্মহত্যার নানা পদ্ধতির কথা জানতে চান, তখন এআই-ও তাঁকে এতে সাহায্য করে। বিপদ যে ওই ব্যক্তির কতটা কাছাকাছি, তা আর বোঝার ক্ষমতা থাকে না তার।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের এক বাসিন্দা, যিনি অবসাদে ভুগছিলেন, তিনি এআইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শহরের সবচেয়ে উঁচু বাড়ি কোনগুলি। এআই-ও তাঁকে শহরের উচ্চতম বাড়ির তালিকা ধরিয়ে দেয়। চ্যাটবটের জায়গায় কোনও ‘ব্যক্তি চিকিৎসক’ থাকলে কিন্তু এমন সমাধান কিংবা পরামর্শ কখনওই দিতেন না। কোনও অবসাদগ্রস্ত মানুষকে তাঁর শহরের উচ্চতম বহুতলগুলির খোঁজ দেওয়া মানে যে তাঁকে প্রায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া— এ কথা মনোবিদেরা অবশ্যই বুঝতেন। রোগীর হাবভাব, চাল-চলন লক্ষ করে উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করতেন।

ঝুঁকি থেকে যায় ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ারও। আমাদের তথ্য এআই-এর হাতে কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠলেও কোনও সদুত্তর মেলেনি।

বন্ধু হলেও চিকিৎসক নয়

চিকিৎসক আবীর এবং মনোবিদ দেবারতি জানাচ্ছেন, এআই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা সাহায্য করতেই পারে। কিন্তু চিকিৎসকের ‘বিকল্প’ হয়ে ওঠার ক্ষমতা তার এখনও নেই। একজন চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভরসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা কোনও যন্ত্রের সঙ্গে হওয়া অন্তত এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। যদি কেউ দাবি করেন তা হয়েছে, তা-ও যথেষ্ট উদ্বেগের। কারণ, দেখা গিয়েছে, এআই মানুষের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যক্তি থেরাপিস্ট যথাযথ সাপোর্ট এবং রোগীর অযৌক্তিক ধ্যান-ধারণার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করে তাঁকে সাহায্য করেন।

তবে কিছু ক্ষেত্রে যেমন রোগীর সিবিটি (কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি), নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলছে কি না তা খেয়াল রাখার মতো কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করা যেতেই পারে। এ ছাড়াও, আবীর জানাচ্ছেন, কোনও রোগ সম্বন্ধে আরও বিস্তারিত জানার ক্ষেত্রে এটি কাজে দিতে পারে। তবে শারীরিক হোক বা মানসিক, যে কোনও রোগেই চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন