Anhedonia Symptoms

মন ভাল নেই, কিছুই যেন ভাল লাগে না, অবসাদকে পিছনে ফেলে দেবে ‘অ্যানহেডোনিয়া’! কী এই অবস্থা?

মনখারাপ মানেই অবসাদ নয়। অবসাদকে যদি বিরাট এক ছাতা বলে ধরে নেওয়া যায়, তা হলে এর এক টুকরো জায়গা দখল করে থাকবে এই ভাল না লাগার অনুভূতি। চিকিৎসবিজ্ঞানে এরই নাম ‘অ্যানহেডোনিয়া’।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ১০:১২
Decoding Anhedonia, the Inability to Feel Joy and How to Overcome it

কোনও কিছুই ভাল লাগছে না, অ্যানহেডোনিয়া নয় তো! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

না, মন লাগে না…. এ জীবনে কিছু ভাল না লাগার কারণ অবসাদ ঠিক নয়। ঘুম থেকে উঠতে ভাল লাগছে না, ভালমন্দ খেতে ভাল লাগছে না, ঘুরতে যেতে ভাল লাগছে না, এমনকি কাছের মানুষদেরও ঠিক ভাল লাগছে না আজকাল। সর্বোপরি, ভাল না লাগার যে অনুভূতি, তাকে ‘ডিপ্রেশন’ ভেবে ফেললে ভুল হবে। এ-ও মনের এক জটিল অবস্থা। ইতিবাচক ভাবনাগুলির উপরে চেপে বসে নেতিবাচক চিন্তাগুলি। তাতেই মনখারাপের মেঘ ঘনায়। এক দিনে তা হয় না। হয় ধীরে ধীরে। তিলে তিলে এর বীজ রোপিত হয় মনের অন্তরালে। এক দিন তারাই ডালপালা মেলে চরম উৎকণ্ঠা ও অবসাদের কারণ হয়ে ওঠে। মনখারাপ মানেই অবসাদ নয়। অবসাদকে যদি বিরাট এক ছাতা বলে ধরে নেওয়া যায়, তা হলে এর এক টুকরো জায়গা দখল করে থাকবে এই ভাল না লাগার অনুভূতি। মনোবিজ্ঞানের জগতে মনের এই অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যানহেডোনিয়া’। কখনও তা অবসাদের চেয়েও মারাত্মক হয়ে ওঠে। জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দেয়। নিংড়ে নেয় সবটুকু সুখ।

Advertisement
কোনও কাজেই উৎসাহ পাওয়া যায় না।

কোনও কাজেই উৎসাহ পাওয়া যায় না। ফাইল চিত্র।

সংসার, কর্মজীবন, সম্পর্কের ঘেরাটোপে থেকে উদ্বেগ আসাটা খুবই স্বাভাবিক। দুশ্চিন্তার মেঘ কখন যে মনের স্বতঃস্ফূর্ততাকে ভেঙে তছনছ করে দেয়, তা টের পাওয়া যায় না। জীবনের প্রতিটি ছোট ছোট মুহূর্তকে গভীর ভাবে বোঝা, জানা বা দেখার ইচ্ছাটাই চলে যায়। তখন খারাপ চিন্তাগুলিই দখল করে নেয় মনের সিংহভাগ জায়গা। ‘অ্যানহেডোনিয়া’ তেমনই। ‘জামা’ মেডিক্যাল জার্নালে মনের এই জটিল অথচ আশ্চর্য অনুভূতিগুলি নিয়ে এক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে সতেচনতা বরাবরই কম। শরীরের অসুখবিসুখ নিয়ে যতটা কথাবার্তা হয়, মনের অসুখ ততটাই অন্তরালে থাকে। ‘অ্যানহেডোনিয়া’ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হওয়ার কারণ হল, এর নাম। যা অচেনা। অথচ উপসর্গগুলি খুবই চেনা। প্রায় সকলেই এমন মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন কখনও না কখনও। তা হঠাৎ করে আসা শোক হোক, দুর্ঘটনার কারণে প্রাপ্ত গভীর বিষাদ হোক বা আচমকাই ঘনিয়ে ওঠা মনখারাপ হোক। কারণ যা-ই হোক না কেন, তার ফল একটাই— সুখ হারিয়ে ফেলা। পছন্দের জিনিসও অপছন্দের কারণ হয়ে ওঠা। অথবা কোনও কিছুতেই ভাল না লাগা। এক দিগন্তব্যাপী হতাশা, বিষাদ ও ক্লান্তি ধীরে ধীরে গ্রাস করে মনোজগতকে। কারও ক্ষেত্রে তা সাময়িক, আবার কারও ক্ষেত্রে তা-ই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে অবসাদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আনন্দ হারিয়ে ফেলার অনুভূতি ‘অ্যানহেডোনিয়া’

অ্যানহেডোনিয়াকে সহজ সরল ভাবে ব্যক্ত করতে হলে বলতে হবে, আনন্দ পেতে ভুলে যাওয়া। তার মানে দুঃখবিলাস নয় কিন্তু। শুধু আনন্দের অনুভূতিটা হারিয়ে যাওয়া। এ বিষয়ে মনোরোগ চিকিৎসক কেদাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত, ‘‘আনন্দ, উল্লাস বা তৃপ্তি অনুভব করার অক্ষমতাই হল অ্যানহেডোনিয়া। এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন মানুষ তাঁর জীবনের সবচেয়ে খুশির বা পছন্দের মুহূর্তগুলিতেও নেচিবাচক চিন্তা করতে থাকেন। হয়তো কেউ বহু দিনের চেষ্টার পরে চাকরি পেয়েছেন, তার পরেও আনন্দ পেলেন না। অথবা পছন্দের জায়গায় ঘুরতে গিয়েও হতাশায় ভুগছেন। প্রিয় মানুষটিকে আর ভালই লাগছে না। কৌতুকের কথা শুনেও তিতিবিরক্ত হচ্ছেন। মন সম্পূর্ণ উদাসীন ও অনুভূতিহীন হয়ে পড়ার অবস্থাই হল অ্যানহেডোনিয়া।’’

জট পাকিয়ে যায় চিন্তাভাবনা, আনন্দের অনুভূতিই চলে যায়।

জট পাকিয়ে যায় চিন্তাভাবনা, আনন্দের অনুভূতিই চলে যায়। ছবি: ফ্রিপিক।

বদল শুধু মনে নয়, মস্তিষ্কেও

আমেরিকার ভ্যানডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, যাপনকে উপভোগ না করতে পারাই হল অ্যানহেডোনিয়ার লক্ষণ। এর নেপথ্যে রয়েছে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ও স্নায়বিক বদল। মস্তিষ্কের একটি অংশ হল ‘মেসোলিম্বিক রিওয়ার্ড পাথওয়ে’। যখন কোনও পছন্দের কাজ করা হয়, যেমন পছন্দের খাবার খাওয়া, গান শোনা, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা ইত্যাদির সময়ে মস্তিষ্কের ওই বিশেষ অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাতেই ভাল লাগার অনুভূতি জন্মায়। অ্যানহেডোনিয়ায় আক্রান্ত হলে ওই এলাকাটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে কোনও কাজেই উদ্দীপনা আসে না, উৎসাহও হারিয়ে যেতে থাকে। ফলে মানুষটি আর কোনও রকম আনন্দের অনুভূতিই টের পান না।

মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য হারিয়ে গেলেও সুখের অনুভূতি চলে যেতে পারে। ডোপামিনকে বলা হয় ‘মোটিভেশন হরমোন’। এটির ভারসাম্য চলে গেলে তখন অতি উৎসাহী ও উদ্যমী ব্যক্তিও যে কোনও কাজে উদাসীন হয়ে পড়বেন। অ্যানহেডোনিয়ায় ঠিক সেটাই হয়।

কী বদল হয় মস্তিষ্কে?

কী বদল হয় মস্তিষ্কে? ছবি: ফ্রিপিক।

এর আরও একটা কারণ হল অত্যধিক মানসিক চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে যদি মনের উপর চাপ বাড়ে তা হলে কর্টিসল হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাও বাড়ে। এর থেকেও অ্যানহেডোনিয়ার মতো মানসিক অবস্থার শিকার হতে পারেন যে কেউ।

ওষুধ নয়, ইতিবাচক চিন্তাতেই হবে চিকিৎসা

অ্যানহেডোনিয়ার দাওয়াই কোনও ওষুধ নয়, বরং ইতিবাচক চিন্তা দিয়েই এর মোকাবিলা করা সম্ভব। গবেষকেরা এক নতুন রকম চিকিৎসাপদ্ধতির কথা বলেছেন যার নাম ‘পজ়িটিভ এফেক্ট ট্রিটমেন্ট’। অর্থাৎ, খারাপ চিন্তাগুলিকে দূর করার চেষ্টা না করে, বরং ইতিবাচক চিন্তাশক্তিকে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করা। বিষাদে মন কতটা ভারী, তা লাঘব করার চেষ্টা এখানে হবে না। বরং ভারাক্রান্ত মনকেই হাশিখুশি করে তোলার প্রয়াস হবে এই চিকিৎসায়।

এই প্রসঙ্গে মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের মত, ভালমন্দ, হাসিকান্না, ওঠাপড়া নিয়েই জীবন। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগও সেই জীবনের অঙ্গ। অনুভূতিরও ভাল বা খারাপ আছে। তাই অতীতে যদি কোনও খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় বা বর্তমানে মানসিক দিক থেকে কোনও আঘাত আসে, তা কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হবে না। খারাপ অনুভূতি থেকে জোর করে পালানোর চেষ্টা না করে জীবনে যা আসছে, আসতে দিন। দুঃখের স্মৃতি এলেও তাকে ইচিবাচক ভাবনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। হলেই ভাল অনুভূতি নতুন করে তৈরি হবে। খারাপ স্মৃতিগুলি ফিকে হয়ে আসবে। সব সময় মনে রাখতে হবে একটাই আপ্তবাক্য— জীবন আসলে একটি বহতা নদীর মতো। সেখানে ভাল-খারাপ, কোনওটাই স্থায়ী নয়। আজ যদি খারাপ সময় যায়, সে চলে যাবে। তেমনই ভাল সময়ও বরাবর টিকবে না। তাই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ না করে জীবনের ছোট ছোট আনন্দে ভেসে যাওয়াই অ্যানহেডোনিয়া থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হতে পারে।

Advertisement
আরও পড়ুন