শীতের তুলনায় গ্রীষ্ম ও বর্ষায় সর্পদংশনের খবর বেশি শোনা যায়। যদিও খবর বলছে, সম্প্রতি কলকাতার উপকণ্ঠে নির্মাণকাজ এত বেড়ে গিয়েছে যে শীতঘুমে বিঘ্ন ঘটছে সাপেদের। তাদের মধ্যে গোখরো, কেউটে, চন্দ্রবোড়ার মতো বিষধর সাপ আছে। শীতের শুরুতে এক সপ্তাহে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে প্রায় ২০জন সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিষধর সাপের বিষের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য প্রতিষেধক আছে। সর্প দংশনে ঠিক সময়ের মধ্যে আক্রান্তের চিকিৎসা শুরু হওয়া এবং সাপ ও সর্প দংশন সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি।
আমাদের রাজ্যে একাধিক প্রজাতির সাপ আছে। তার মধ্যে গোখরো, কেউটে, চন্দ্রবোড়া, কালাচ বিষধর। “বিষধর সাপের বিষগ্রন্থিতে বিষ জমা থাকে। সাপ বিষ প্রয়োগ করে শিকার ধরার জন্য। কিন্তু মানুষকে দংশন করে স্রেফ আত্মরক্ষার জন্য। অধিকাংশ বিষধর সাপ ফণা তোলে। ব্যতিক্রম কালাচ বা কমন ক্রেট। এদের ফণা নেই। প্রচলিত ধারণা শীতে সাপ শীতঘুমে যায়। কিন্তু তা নয়। গ্রীষ্ম, বর্ষার চেয়ে গতিবিধি কমে গেলেওওরা থাকে। বিশেষ করে শীত চন্দ্রবোড়ার প্রজনন সময়। তাই যে কোনও ঋতুতে জঙ্গলে, খেতে, গ্রামাঞ্চলে চলাফেরার সময়ে সর্তক থাকতে হবে,” বললেন সরীসৃপ বিশারদ এবং তাড়োবা অভয়ারণ্যের ফিল্ড গাইড স্বর্ণ চক্রবর্তী।
সাপ কামড়েছে, বোঝার উপায়
দংশনের চিহ্ন থাকবে, জায়গাটি লাল হয়ে ফুলে উঠবে, প্রবল যন্ত্রণা হবে। “বিষধর সাপ কামড়ালে যত সময় যাবে, শরীরে রক্ততঞ্চন প্রক্রিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে অর্থাৎ রক্ত জমাট বাঁধবে না। প্রস্রাব, কাশি বা বমির সঙ্গে রক্ত নির্গত হবে। ব্রেন হেমারেজ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্রমশ শরীরের স্নায়ু নিষ্ক্রিয় করে প্যারালাইসড করে দেবে। বিশেষ করে চোখের পাতা খুলতে অসুবিধে হবে, চোখের মণি উল্টে যাবে, ঢোঁক গিলতে পারবে না, স্বর অস্পষ্ট হয়ে আসবে,” বললেন মেডিক্যাল কলেজের জেরিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান অরুণাংশু তালুকদার। অন্যান্য বিষধর সাপের চেয়ে কালাচের দংশনে ব্যতিক্রম আছে। “কালাচের দংশন যন্ত্রণাহীন, ফলে কামড়ালে তৎক্ষণাৎ বোঝা যায় না। অনেকক্ষণ পরে পেটে ব্যথা, চোখ খুলতে না পারা, নার্ভ অসাড় হওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়। কালাচ বেশি সক্রিয় হয় রাতে। তাই যেখানে সাপের চলাফেরা বেশি, সেখানে রাতে মশারি ব্যবহার করা উচিত,” বললেন স্বর্ণ চক্রবর্তী।
সাপে কামড়ালে যা করবেন
সর্প দংশনের পরে গোল্ডেন টাইম হল প্রথম ১০০ মিনিট। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে আসা জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় সাপে কামড়ানোর পরে আক্রান্ত এবং তার আশপাশের মানুষজন দিশেহারা হয়ে যান। যাঁকে কামড়েছে তিনি এতটাই ভয় পেয়ে যান যে অনেক সময়ে দেখা গিয়েছে সাপের বিষে নয়, প্যানিক অ্যাটাকে মানুষটি মারা গিয়েছেন! “দিশেহারা না হয়ে মনে রাখতে হবে ‘রাইট’ (Right)। এখানে আর অর্থাৎ রিঅ্যাসিয়োরার বা রেস্ট। যাঁকে সাপে কামড়েছে তিনি যাতে প্যানিক না করেন তার জন্য তাঁকে নিশ্চিত করা যে তিনি ভাল হয়ে উঠবেন। আই, ইমমোবিলাইজ, যতটা কম সম্ভব নড়াচড়া করা। যত বেশি নড়চড়া হবে তত তাড়াতাড়ি বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। জিএইচ অর্থাৎ গো টু হসপিটাল। সাপে কামড়ানো ব্যক্তিকে ওঝা-গুণিনের কাছে নয়, দ্রুত নিয়ে যেতে হবে নিকটবর্তী হাসপাতালে। টি অর্থাৎ ট্রিটমেন্ট। যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যাবে তত ভাল,” বললেন ডা. তালুকদার। সর্প দংশনের জায়গায় ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে বিষ বার করার চেষ্টা করবেন না, দংশন স্থানে কোনও কিছু দিয়ে ঘষাঘষি বা কাপড় বাঁধা যাবে না।
কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যাবে
পশ্চিমবঙ্গের শহর, মফস্সল, গ্রামের সব সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থকেন্দ্রে (যেখানে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক থাকেন এবং রোগীর জন্য শয্যা আছে) সাপের বিষের প্রতিষেধক বা অ্যান্টি-স্নেক ভেনম মজুত থাকে। সরকারি হাসপাতালের বাইরে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমেরও এই ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে সাপে কামড়ানো ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রতিষেধক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
চিকিৎসা
কোন প্রজাতির সাপ দংশন করেছে তা চিকিৎসককে জানালে চিকিৎসা শুরু করতে সুবিধে হয়। কিন্তু সাপ চেনা বা সাপটিকে দেখা অনেক সময়েই সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে ডা. তালুকদার বললেন, “যদি কেউ ছবি তুলে আনেন, তা দেখে চেনার চেষ্টা করি, সেটি বিষধর কি না! যদি কোনও ক্লু না থাকে তাতেও সমস্যা নেই। বিষ আছে কী নেই জানার আগেই স্যালাইন চালু করা হয়। তার পরে আক্রান্তের শরীর থেকে কিছুটা রক্ত নিয়ে একটি টেস্ট টিউবে রাখা হয়। স্বাভাবিক নিয়মে রক্ত ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে জমাট বেঁধে যায়। যদি ওই সময়ের মধ্যে রক্ত জমাট না বাঁধে, তার মানে রক্তে বিষ ছড়িয়েছে অর্থাৎ বিষধর সাপ কামড়েছে। তখন স্যালাইনের মধ্যেই অ্যান্টি-স্নেক ভেনম ইনজেক্ট করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া দংশনের জায়গার চামড়ার রং কালশিটের মতো হয়ে গেলেও বুঝতে হবে বিষধর সাপ কামড়েছে।”
অনেক সময়ে আক্রান্তকে নিয়ে আসা হয় দেরিতে। তখন রক্তপরীক্ষার সময় থাকে না। “যদি আক্রান্তর প্রস্রাব, কাশি বা বমির সঙ্গে রক্ত বেরোয় বা তিনি চোখ খুলতে না পারেন, তখন দেরি না করে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়া হয়। কিডনি ড্যামেজ হলে ডায়ালিসিস করতে হয়। নার্ভ প্যারালাইজ়ড হয়ে গেলে ইঞ্জেকশন দিয়ে সুস্থ করে তোলা সম্ভব, যদি না তাঁর অন্য কঠিন রোগ থাকে। তবে প্রস্রাবে রক্ত আসা, নার্ভ প্যারালাইজ়ড হতে সময় লাগে। তাই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা দরকার,” বললেন ডা. তালুকদার। টেস্ট টিউবে রাখা রক্ত যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমাট বেঁধে যায়, তা হলে বুঝতে হবে বিষধর সাপ কামড়ায়নি। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাঁচ-ছ’ঘণ্টা পরে আবার রক্তপরীক্ষা করা হয়। তখনও রক্ত জমাট বাঁধলে বুঝতে হবে বিপদসীমার বাইরে। তখন দংশনের ক্ষত সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক মলম, ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়।
তবে সাপের ব্যাপারে সচেতন করলেন স্বর্ণ চক্রবর্তী, “মনে রাখবেন সাপ নিজেকে বাঁচানোর জন্য মানুষকে দংশন করে। তাই বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখুন, যাতে তা সাপের ডেরা না হয়ে ওঠে। প্রয়োজনে বাড়ির চারপাশে ব্লিচিং পাউডার, কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে দিন।”
সাপের বিষে মানুষ মারা যেতে পারে আবার সেই সাপের বিষ থেকে নানা জীবনদায়ী ওষুধও তৈরি হয়। তাই অকারণ ভয় না পেয়ে সতর্ক থাকুন।