মহাকাশেও বিপদ, ভয়াবহ বদল ঘটে মহিলা নভোচারীদের শরীরে। ফাইল চিত্র।
সুনীতা উইলিয়ামস এবং বুচ উইলমোর যখন একটানা ন’মাস মহাশূন্যে দিন যাপন করেছিলেন, তখন তাঁদের শরীরের বাহ্যিক বদলগুলি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, শরীরের বাইরে কেবল নয়, মাইক্রোগ্র্য়াভিটি বা শূন্য মাধ্যাকর্ষণে দিনের পর দিন থাকার কারণে শরীরের ভিতরেও নানা বদল ঘটে গিয়েছে দুই মহাকাশচারীর। তার মধ্যে হাড়ের ক্ষয় বা পেশির ঘনত্ব কমে যাওয়া তো আছেই, তা ছাড়া নানা মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণ ক্যানসারের আশঙ্কাও বাড়িয়ে দেয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা আরও ভয় ধরানো কিছু খবর দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, মহাশূন্যে একটানা থাকলে মহিলা মহাকাশচারীদের মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরীক্ষায় এ তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিতও হয়েছেন গবেষকেরা।
দীর্ঘ সময় মাধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকলে ওজন কমে। হেরফের হয় রক্তচাপের। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে পৃথিবীর কক্ষপথে পাক খেয়ে চলা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের শূন্য মাধ্যাকর্ষণে দিনের পর দিন থেকে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার কাজ কেবল কঠিনই নয়, কঠিনতম বললেও ভুল হবে না। মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা শূন্য মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব একজনের শরীরকে কতটা নাস্তানাবুদ করতে পারে, তা কেবল মহাকাশ স্টেশনে থাকা মহাকাশচারীই বলতে পারবেন। মাইক্রোগ্র্যাভিটি শরীরের মধ্যস্থ তরল ও রক্তচাপের উপর হস্তক্ষেপ করে প্রতিনিয়ত। তরল জমা হতে থাকে মস্তিষ্কে, দুর্বল হয়ে পড়ে রোগ প্রতিরোধ শক্তি। এই বিষয়টি নিয়েই গবেষণা চালিয়েছে কানাডার সাইমন ফ্রেজ়ার ইউনিভার্সিটির অ্যারোস্পেস ফিজিয়োলজি ল্যাবরেটরি ও কানাডার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। গবেষকেরা দাবি করেছেন, মহাশূন্যে একজন মহিলা মহাকাশচারীর শরীরে বদল বেশি আসে। বিশেষত তাঁর শিরা-উপশিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেশি থাকে।
বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। ১৮ জন মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি জলপূর্ণ আধারে কিছু দিন ভেসে থাকতে বলা হয়। জলরোধী পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের। আধারটি এমন ভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ভেসে থাকার সময়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ না করে তাঁদের শরীরে। এই অবস্থায় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, প্রত্যেক মহিলার শরীরেই রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। 'রোটেশনাল থ্রম্বোইলাস্টোমেট্রি' পরীক্ষায় রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ ও ধরন পরীক্ষা করেন। তাতে দেখা যায়, শিরা-উপশিরায় রক্ত জমাট বাঁধছে খুব দ্রুত। এমন ‘ব্লাড ক্লট’ স্থায়ী হচ্ছে ও তা নিরাময়ের পথও খুব জটিল।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মধ্যে থাকা অবস্থায় শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার ধরন ও মহাকাশে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে রক্ত জমাট বাঁধার ধরনে অনেক পার্থক্য আছে। পৃথিবীতে কারও শরীরে রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে পায়ে। সেখান থেকে তা পৌঁছয় ফুসফুসে ও হার্টে। কিন্তু মহাকাশে রক্ত জমাট বাঁধে ঘাড় ও মস্তিষ্কে। এবং তা খুব দ্রুত সারা শরীরকে কব্জা করে নেয়। এতে মহাকাশচারীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
নাসা তাদের এক গবেষণায় বলেছিল, পৃথিবীর মানুষের তুলনায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভশ্চরদের প্রায় ২০ গুণ বেশি বিকিরণ সহ্য করতে হয়। ফলে তাঁদের নানাবিধ স্বাস্থ্য সঙ্কট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্বল্পমেয়াদি মিশনের জন্য তা খুব একটা উদ্বেগের না হলেও, দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ক্ষেত্রে এই শারীরিক সমস্যা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।