Holi Detox Drink

নেশার দ্রব্য নয়, অবাঙালিসুলভও নয়! দোলের সুস্বাদু শরবত ঠান্ডাই আদতে বাঙালির বসন্তের ‘ডিটক্স’

দুনিয়া জুড়ে যখন ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা চলছে, তখন বসন্তোৎসব হাতের কাছে এগিয়ে দিচ্ছে এমন একটি পানীয়, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দহন জুড়োতে পারে। ঠান্ডাই কী ভাবে তৈরি করা হয়, তা জানলেই এর কারণ আরও স্পষ্ট হবে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৭
বিষ নাই, ওষুধ আছে!

বিষ নাই, ওষুধ আছে! ছবি : সংগৃহীত।

শরবতে ‘বিষ নাই’, তবে নেশার দ্রব্য আছে! দোলের পানীয় ‘ঠান্ডাই’ নিয়ে জনমানসে ধারণা এমনই। এ বাদে ‘ঠান্ডাই’ বললে আর যে কথাটি মনে পড়ে, তা হল— ব্যাপারটি বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ নয় মোটেই। মগনলাল মেঘরাজের হিন্দি টানে বাংলা বলার মতোই বেনারসের জনপ্রিয় ওই পানীয় ঘোরতর অবাঙালি, যা তেড়েফুঁড়ে বঙ্গের দোল-সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছে বলে মনে করে বাঙালি। কিন্তু ঠান্ডাই নিয়ে এই দুই ধারণাই বেঠিক।

Advertisement

নেশার দ্রব্য তো নয়ই, অবাঙালিসুলভও নয় ঠান্ডাই। বরং স্বাস্থ্যকর এই পানীয় বহু বছর ধরে জড়িয়ে আছে বাঙালি দোলের উৎসবের সঙ্গে। এক কালে উদ্যমবর্ধক হিসাবে খাওয়া হত। নামছিল ‘ঘোঁটা’। বাঙালির বাবুসংস্কৃতির দলিল ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখেছিলেন সেই পানীয়ের কথা। যদিও এ কালের লব্জে একে দোলের ‘ডিটক্স ড্রিঙ্ক’ বলা যেতে পারে।

কেন ‘ডিটক্স’?

নামেই তাঁর আঁচ পাওয়া যায়— ঠান্ডাই। অর্থাৎ এমন পানীয়, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখে। দুনিয়া জুড়ে যখন ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা চলছে, তখন বসন্তোৎসব হাতের কাছে এগিয়ে দিচ্ছে এমন একটি পানীয়, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দহন জুড়োতে পারে। ঠান্ডাই কী ভাবে তৈরি করা হয়, তা জানলেই এর কারণ আরও স্পষ্ট হবে।

পোস্ত, মগজদানা, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, গোলমরিচ, গোলমরিচ, মৌরি, ছোটএলাচ, জাফরান এবং গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি হয় ঠান্ডাই। এর মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবে শরীর ঠান্ডা রাখতে ওস্তাদ হল পোস্ত। বাঙালির ডাল-ভাতের পাতে থাকা পোস্ত চড়া রোদে শরীরকে যেমন শীতল রাখে, তেমনই স্নায়ুকেও শান্ত রাখতে সাহায্য করে।

দোলে হুটোপাটি করে ক্লান্তি আসতেই পারে, কাঠবাদাম আর কাজু প্রোটিনের মাধ্যমে শরীরে শক্তি এবং উদ্যমের জোগান দেয়। আবার মগজদানায় বা চারমগজে রয়েছে ওমেগা থ্রি ফ্য়াটি অ্য়াসিড, যা মস্তিষ্ককে সচল রাখে। জাফরান সাহায্য করে মেজাজ ভাল রাখতে। যা উৎসবের আমেজ ধরে রাখতে জরুরি।

গোলমরিচ, ছোটএলাচ, মৌ্রি— এ সবই প্রদাহ কমিয়ে, হজমশক্তি বৃদ্ধি করে শরীরকে ভিতর থেকে ভাল রাখে। দোলে যখন বাইরে রোদে-জলে রং খেলবেন, মিষ্টি-নোনতা-সহ ভারী খাবার খাবেন, তখন ওই শরবত শরীরের সমস্যাগুলি দূর করে উৎসবে মেতে থাকার চনমনে ভাব বজায় রাখবে নীরবে। একে ‘ডিটক্স’ বা বিষমুক্তকরণ বলা হবে না তো আর কাকে বলা হবে!

বাঙালি-যোগ ও ‘বঙ্গীয়করণ’

এ হেন দোলের বিষমুক্তি শরবতের সঙ্গে বাঙালির সখ্য যদিও আজকের নয়। উনিশ শতকে কলকাতার বনেদি বাবুদের একটা বড় অংশের কাশীতে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। বাদামবাটা, গোলাপের পাপড়ি, জাফরান, দুধ-মিছরির শরবতের রাজকীয় আমেজ মনে ধরেছিল বাঙালির, ফলে ঠান্ডাই কাশীর ঘাট থেকে বাঙালি বাবুদের হাত ধরে অচিরেই কলকাতার বনেদি বাড়িতে জায়গা করে নেয়। তার বানানোর প্রণালীতে কিছু বঙ্গীয় বদলও আনা হয়।

বেনারসের ঠান্ডাই খুব বেশি মিষ্টি ছিল না। কিন্তু মিষ্টিপ্রেমী বাঙালি তাকে এক ধরনের তরল মিষ্টিই বানিয়ে ফেলে। ঠান্ডাইয়ে পোস্তের মিশ্রণও বাঙালির পোস্ত-প্রীতির ফল বলেই মনে করেন অনেকে। উত্তর ভারতের ঠান্ডাই মূলত বাদাম, মগজদানা আর মৌরি-নির্ভর ছিল, বঙ্গে আগমনের পরে তাতে মেশে পোস্ত। তবে সেই মিশেলে উপকারই হয়েছে। কারণ, প্রাচীন ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিতে পোস্তকে বলা হত শীতবীর্য। যা শরীর দ্রুত ঠান্ডা করতে পারে। তা ছাড়া উত্তর ভারতের ঠান্ডাইয়ে যে বিভিন্ন ধরনের চড়া স্বাদের মশলার দাপট, পোস্ত দিয়ে তাদের শান্তও করেছে বাঙালি। ঠান্ডাইয়ের বঙ্গীয়করণে তাই ঔষধি হিসাবে তো বটেই এবং স্বাদেও আরও সমৃদ্ধ হয়েছে ঠান্ডাই।

কখন বিষ?

তবে হ্যাঁ, শরীর জুড়োনোর এই ভেষজ দাওয়াই তত ক্ষণই ‘ডিটক্স’, যত ক্ষণ তাতে ভাং বা সিদ্ধির মতো নেশার বস্তু না মেশানো হচ্ছে। ঠান্ডাইয়ের যাবতীয় উপকরণের গুণাগুণ নিমেষে নষ্ট হয়ে যাবে, যদি এর সঙ্গে নেশার উপদান যোগ করা হয়। কারণ, ভাং বা সিদ্ধি স্নায়ুকে শিথিল করে দেয়, যা শরীরকে ভাল রাখার বদলে ক্লান্তি এবং অবসাদ ডেকে আনতে পারে।

তাই রঙের উৎসবে যদি প্রকৃতই স্বাস্থ্যগুণ সম্পন্ন এক পানীয়ের স্বাদ পেতে চান, তবে নেশার দ্রব্য বর্জিত ঠাণ্ডাইয়ের গ্লাসে চুমুক দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

কারণ, ওই শরবতে বিষ নেই, ওষুধ আছে।

কীভাবে বানাবেন বিষমুক্তির পানীয়?

উপকরণ: ১০টি আমন্ড, ১০টি কাজুবাদাম, ৩ চামচ পোস্ত, ১ চামচ মৌরি, ১০-১২টি গোলমরিচ, ৫-৬টি ছোটএলাচ, জাফরান এবং শুকনো গোলাপের পাপড়ি। এ ছাড়া ১ লিটার দুধ এবং স্বাদ অনুযায়ী মিছরি।

পদ্ধতি: সব উপকরণ সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখুন। আমন্ডের খোসা ছাড়িয়ে সব উপাদান একসাথে মিহি করে বেটে নিন। এবার ঠান্ডা দুধের সঙ্গে এই মিশ্রণ এবং স্বাদমতো মিছরি মিশিয়ে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে নিলেই তৈরি রাজকীয় ঠান্ডাই।

Advertisement
আরও পড়ুন