বয়স অনুপাতে মেয়েদের চোখের সমস্যা ও তার প্রতিকারের উপায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মনের যে কোনও ভাব, সংলাপ ভেসে ওঠে চোখে। তাই চোখের সাজ সব সময়েই গুরুত্ব পায়। নারীর কাজল কালো চোখের স্তুতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এখন অবশ্য শুধু কালো নয়, চোখের সাজে অন্য রঙের ছোঁয়াও লেগেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পাতায় মাসকারা বা কাজল টানার সময়ে যতটা ধৈর্য থাকে, চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে ততটা সচেতনতা আছে কি? কাজল কালো চোখ তখনই সুন্দর, যখন তার দৃষ্টি স্বচ্ছ। অথচ চোখের সাজ নিয়ে একজন মহিলা যতটা ভাবেন, ততটা বোধ হয় চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে নয়। পরিষ্কার দেখতে পেলেই তো হল। এর বেশি মাথা ঘামাতে কেউই চান না। চোখ কড়কড় করলে আই ড্রপেই কাজ সারা হয়ে যায়। কিন্তু গবেষণা বলছে, একজন মহিলা তাঁর জীবনের নানা পর্যায়ে চোখের সমস্যয় সবচেয়ে বেশি ভোগেন। কৈশোর থেকে বার্ধক্য, বয়স অনুযায়ী চোখের ভাবসাব বদলে যায়। বদল আসে চোখের স্বাস্থ্যেও। প্রতিটি পর্যায়ে চোখের সেই বদলগুলি সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না মোটেও।
পরিসংখ্যান বলে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের চোখের জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। চক্ষুরোগ চিকিৎসক সৌমেন মণ্ডল জানিয়েছেন, বয়ঃসন্ধি, ঋতুচক্র, গর্ভাবস্থা থেকে রজোনিবৃত্তি— প্রতি পর্বেই বদল আসে মেয়েদের চোখের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যে। ‘ড্রাই আই’ বা শুষ্ক চোখের সমস্যা মেয়েদেরই বেশি হয়। আবার রেটিনার অসুখ গ্লকোমায় আক্রান্ত হওয়ারও হারও মেয়েদের বেশি। বয়সজনিত চোখের সমস্যা ‘ম্যাকুলার ডিজেনারেশন’ (এমডি)-এ মহিলারাই বেশি ভোগেন। এর কারণই হল মহিলাদের শরীরে হরমোনের ওঠানামা এবং চোখ নিয়ে নিদারুণ অবহেলা।
চোখের কী কী সমস্যা হতে পারে মেয়েদের? ছবি: ফ্রিপিক।
২০ থেকে ৬০— কোন বয়সে চোখের কী সমস্যা ভোগায়?
১০ থেকে ২০ বছর
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ট্যাবের দিকে সর্ব ক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে ব্য়থা, চোখ জ্বালা।
এই বয়সে অ্যালার্জিক কনজাঙ্কটিভাইটিস বেশি হয়। শুষ্ক চোখের সমস্যাও বেশি ভোগায়।
২০ থেকে ৩০ বছর
হরমোনের নানা বদলের কারণে চোখ ফুলে ওঠা, চোখের চারপাশের ত্বকে কালচে ছোপ পড়ে যাওয়া।
ডিজিটাল আই স্ট্রেন এই বয়সে খুব ভোগায়। তা থেকে মাথা যন্ত্রণা, মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কনট্যাক্ট লেন্স থেকে চোখে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
চোখে জলের শুকিয়ে যাওয়া, ঝাপসা দৃষ্টির সমস্যা ভোগায়।
কাজল, মাসকারা বা চোখের প্রসাধনী থেকে অ্যালার্জির সমস্যাও হয়। চোখের মেকআপ থেকে চোখের পাতায় প্রদাহ বা ব্লেফারাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চোখের নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি। ছবি: ফ্রিপিক।
৩০ থেকে ৪৫ বছর
গর্ভাবস্থায় হরমোনের বদলের কারণে চোখের চাপ বাড়তে পারে। এর থেকে রেটিনার জটিল অসুখ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
থাইরয়েড থাকলে সে কারণে চোখ ফুলে যেতে পারে। একে বলে ‘থাইরয়েড আই ডিজ়িজ়’, যা মেয়েদের বেশি হয়। চোখের পিছনের পেশি ফুলে যায় ফলে মনে হয় চোখ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসছে।
৫০ বছরের ঊর্ধ্বে
রজোনিবৃত্তি পর্বে বা রজোনিবৃত্তির পরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের কমে যাওয়া ও বার্ধক্যজনিত কারণে চোখের কোষের ক্ষয় হতে থাকে। এই পর্বে গিয়ে ছানি পড়া, গ্লকোমা ও ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের সমস্যা বেশি হয়।
বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এবং ডায়াবেটিক ম্যাকুলার এডিমা— এই দুই রোগ মেয়েদের ভোগাতে পারে। ডায়াবেটিক ম্যাকুলার এডিমা মূলত সুগার থাকলে হয়। অত্যধিক মানসিক চাপ থেকেও রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, তখন তা থেকেও এই রোগ হতে পারে।
চোখ ভাল রাখার সহজপাঠ। ছবি: ফ্রিপিক।
পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলাদের চোখের আরও এক ধরনের অসুখ বেশি হয়, যার নাম ইউভিআইটিস। একে চোখের প্রদাহ বা আই ইনফ্ল্যামেশনও বলে। রেটিনার পিছনে থাকে মধ্যম স্তর, এটি ইউভিয়া নামে পরিচিত। প্রদাহ হলে এটি ফুলতে থাকে। প্রদাহ যত বাড়বে, সাদা অংশের উপরে তত চাপ সৃষ্টি হবে। তখন চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে যাবে, ব্যথা অনুভূত হবে। অনেক সময়ে দৃষ্টি কিছুটা ক্ষীণ হয়েও পড়তে পারে। এতে তাড়াতাড়ি ছানি পড়ে চোখে। দেখা গিয়েছে, বাতের ব্য়থায় বেশি ভোগেন যাঁরা, তাঁরা এই রোগে আক্রান্ত হন। স্পন্ডিলোসিসও এর অন্যতম কারণ।
চোখ ভাল রাখতে
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস থাকলে অথবা হার্টের রোগ থাকলে চোখের প্রেশার পরীক্ষা করানো খুব জরুরি। অপটিক নার্ভ পরীক্ষা করলেই ধরা পড়ে ক্ষতির মাত্রা ঠিক কতটা।
বাড়ির বয়স্ক মহিলারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখেন। সে ক্ষেত্রে দেখে নিতে হবে, ঠিক কতটা দূরে বসে টিভি দেখছেন তাঁরা। কম করেও টিভি থেকে দূরত্ব যেন ৪ থেকে ৫ ফুট থাকে। টিভির পর্দা ৪৩ বা ৫০ ইঞ্চি হলে ৬ ফুটের বেশি দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
চলন্ত ট্রেন, বাস বা মেট্রোয় যাওয়ার সময় বই পড়লে চোখে চাপ পড়ে। ছোট ছোট কম্পমান অক্ষর পড়তে গিয়ে রেটিনার উপর চাপ বাড়ে। অন্ধকারে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বা কম আলোতেও বই পড়লে চোখের ক্ষতি হবে।
খাওয়াদাওয়ার উপরেও নজর রাখতে হবে। বেশি করে মরসুমি ফল, শাকসব্জি, লিন প্রোটিন, শস্যজাতীয় খাবার ডায়েটে রাখতে হবে। ধূমপানেও রাশ টানা জরুরি।
পরীক্ষাতেই ধরা পড়বে রোগ
বয়স ৩০ বছর পেরোলেই চোখের কিছু পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে, যেমন মায়োপিয়া, হাইপারোপিয়া এবং প্রেসবায়োপিয়া। তিন পরীক্ষাই দৃষ্টিশক্তির মান যাচাই করবে।
পরিবারে যদি গ্লকোমা বা চোখের ভিতরের চাপ বৃদ্ধিজনিত রোগের ইতিহাস থাকে, তা হলে টোনোমেট্রি পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।
স্লিট ল্যাম্প পরীক্ষাও জরুরি। এই পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক কর্নিয়া, লেন্স এবং আইরিস খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। কর্নিয়ার ক্ষত, চোখের সংক্রমণ, অল্প বয়সে ছানি পড়ার ঝুঁকি আছে কি না, তা বোঝা যায় এই পরীক্ষায়।
রেটিনা ও অপটিক নার্ভের পরীক্ষাও জরুরি। সুগার থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির ঝুঁকি আছে কি না, তা-ও ধরা পড়ে এই পরীক্ষায়।