হার্টের রোগের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত।
ধমনীর বয়স বৃদ্ধি পাওয়া বা হৃদ্রোগ মূলত বয়স্কদের সমস্যা— এই ছবিটি আর পাল্টে গিয়েছে নতুন যুগে। সম্প্রতি চিকিৎসকেরা লক্ষ করছেন, অনেকের ক্ষেত্রেই ৩০-এর কোঠাতেই বুড়িয়ে যাচ্ছে ধমনী। শুরু হয়ে যাচ্ছে হার্টের রোগের সমস্যা। এখন আর বয়সের উপর রোগ নির্ভর করছে না। যাপনের বদলে সমস্ত সূত্র ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় ধমনীগুলি নমনীয় থাকে। কিন্তু এখনকার জীবনযাপন ও বিপাকজনিত সমস্যার কারণে ধীরে ধীরে ধমনীর দেওয়াল শক্ত হতে শুরু করে এবং ভিতরে চর্বির স্তর জমতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। এর ফলেই পরবর্তী সময়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
মেডিসিনের চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাস জানাচ্ছেন, ধমনীর কাজই হল, হার্ট থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত সারা শরীরে সরবরাহ করা। ধমনীর পাম্পিং সে কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এই পাম্পিংয়ের ফলেই রক্ত চলাচল ভাল হয়। ফলে ধমনীকে অত্যন্ত নমনীয় ও সক্রিয় হতে হয়। চিকিৎসকের কথায়, ‘‘বয়স বাড়লে এই ধমনী বা আর্টারিগুলিতেই প্রচুর ফ্যাট জমে শক্ত হতে থাকে। এ ভাবেই অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত হয় রোগী। তখন ধমনী সে ভাবে নড়াচড়া করতে পারে না। সেটা ৫০ বছরের পর থেকে হয় সাধারণত। কিন্তু নতুন ধরনের যাপনের অভ্যাসের কারণে ৩০ বছরের কোঠাতেও অ্যাথেরোসক্লেরোসিস হতে পারে। সেটাই ভয়ের। প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, কম ঘুমোনো, যখন-তখন ঘুমোনো, মানসিক চাপ নেওয়া, এই সমস্ত কারণেই স্থূলত্ব, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির সমস্যা শুরু হচ্ছে আর হার্টও দুর্বল হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ফলে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায় আর ইস্কেমিক হার্ট ডিজ়িজ় শুরু হয়।’’
ধমনীর এই অকাল বার্ধক্যের তত্ত্বে সহমত মধুমেহ রোগের চিকিৎসক অভিজ্ঞান মাঝিও। চিকিৎসকের মতে, দশকের পর দশক যে ধমনীর নমনীয় থাকা দরকার, তা শক্ত হয়ে যাচ্ছে, পাম্পিং হচ্ছে না সুষ্ঠু ভাবে। একাধিক ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি দেখতে পাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। মধুমেহর চিকিৎসক এর নেপথ্যে কয়েকটি কারণের কথা বললেন—
১. এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হল, ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স। অনেক সময় টাইপ ২ ডায়াবিটিস হওয়ার আগেই শরীরে এই সমস্যা দেখা দেয়। ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্সের ফলে শরীরে প্রদাহ বাড়ে এবং রক্তনালির ভিতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এতে ধমনীর ক্ষয় দ্রুত হয়।
২. কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াও বড় ভূমিকা নেয়। বিশেষ করে এলডিএল কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকলে ধমনীর ভিতরে চর্বির স্তর জমে যায়। ধীরে ধীরে এই স্তরই ধমনীর পথ সঙ্কীর্ণ করে দেয়।
৩. স্থূলত্ব, অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া ও দীর্ঘ দিনের মানসিক চাপ থেকেও শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এর ফলে ধমনীর ভিতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্তনালির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করে। এক জায়গায় বসে থাকা, যাপন ও শরীরচর্চার অভাবও ধমনীর ক্ষতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। নিয়মিত শারীরিক ভাবে সক্রিয় না থাকলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উৎপাদন কমে যায়। এই উপাদানই ধমনীগুলিকে নমনীয় রাখতে সাহায্য করে।
৪. ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং পরিবেশের নানা বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শেও রক্তনালিতে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়। এর ফলে ধমনীর ক্ষতি আরও দ্রুত হতে পারে।
৫. দেরি করে ঘুমোনো, ঘুমের সময় বার বার বদলে যাওয়া বা শরীরের জৈবিক ঘড়ির ছন্দ নষ্ট হয়ে গেলে বিপাকক্রিয়ায় নানা সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, বিপাকের গোলমাল এবং ধমনী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ফলে চিকিৎসকেরা বলছেন, ধমনীর অকালবার্ধক্য রোধ করা সম্ভব কেবল জীবনযাপনের উন্নতি ঘটিয়ে। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান এড়িয়ে চললে অনেক ক্ষেত্রেই এই ঝুঁকি কমে যায়। তবে বুকে ব্যথা, বুকে চাপ লাগা ইত্যাদি বোধ করলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নির্দিষ্ট পরীক্ষাগুলি করাতে হবে। তা সে ইসিজি, ইকো, সিটি স্ক্যান হোক বা সিটি অ্যা়ঞ্জিওগ্রামই হোক।