যৌনস্বাস্থ্য বা ব্যক্তিগত অঙ্গের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার পরিসর এখনও খুব কম। নানা শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যায়, কিন্তু যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গেলেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় সঙ্কোচ। অথচ চিকিৎসকদের মতে, এই নীরবতাই সমস্যাকে জটিল করে তোলে। স্ত্রীরোগ চিকিৎসক অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায় বললেন, “ব্যক্তিগত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও তার পার্শ্ববর্তী অংশের ঠিক পরিচর্যার অভাবে হতে পারে সংক্রমণ, চুলকানি, দুর্গন্ধ, অস্বস্তি, এমনকি অন্য গুরুতর সমস্যাও। অথচ অস্বস্তির কারণে অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন নন।”
মেয়েরা কী করবেন
চিকিৎসকদের মতে, অন্তরঙ্গ পরিচ্ছন্নতা মানে দামি পণ্য ব্যবহার নয়। বরং প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাসই সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। ব্যক্তিগত অঙ্গ পরিষ্কার রাখা, রোজ পরিষ্কার ও শুকনো অন্তর্বাস ব্যবহার করা, অতিরিক্ত ঘাম জমতে না দেওয়া, ব্যায়ামের পরে পোশাক বদলানো— এই বিষয়গুলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, অনেকেই মনে করেন সুগন্ধিযুক্ত ‘ইন্টিমেট ওয়াশ’ বা নানা পণ্য ব্যবহার করলেই পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে। বাস্তবে তার তেমন প্রয়োজন নেই। অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, মহিলাদের যৌনাঙ্গ স্বাভাবিক ভাবেই একটি সেল্ফ ক্লিনিং অর্গ্যান। সেখানে উপকারী ব্যাক্টিরিয়া ও স্বাভাবিক পিএইচ ব্যালান্স থাকে, যা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু অতিরিক্ত সাবান, সুগন্ধিযুক্ত প্রডাক্ট বা দীর্ঘক্ষণ ভিজে পরিবেশ এই স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। সাধারণ, হাল্কা গরম জলই রোজকার পরিচ্ছন্নতার জন্য যথেষ্ট। প্রয়োজনে মৃদু, সুগন্ধিহীন ইন্টিমেট ওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেকে দুর্গন্ধ কমানোর জন্য ইন্টিমেট স্প্রে বা ডুশিং করেন, যা উল্টে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ঋতুচক্র চলাকালীন পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ একই স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করা, পুনর্ব্যবহার যোগ্য কাপড় ঠিক মতো না শুকিয়ে ব্যবহার করার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করলে তা নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা জরুরি বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। প্যাড বদলাতে হবে প্রতি ৪-৬ ঘণ্টা অন্তর। এ ছাড়াও, টয়লেট ব্যবহারের পরে সব সময় সামনে থেকে পিছনের দিকে (ফ্রন্ট টু ব্যাক) পরিষ্কার করতে হবে, যাতে মলদ্বারের জীবাণু যোনি বা মূত্রনালিতে না যায়।
পুরুষদের করণীয়
তবে এই আলোচনা শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে ভুল হবে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও যৌনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোলজিস্ট বিভাস কুণ্ডু জানাচ্ছেন, “পুরুষদের মধ্যে এখনও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা কম। অনেকেই সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না বা লজ্জার কারণে চিকিৎসকের কাছে যান না।” গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ব্যক্তিগত অঙ্গের আশপাশ একটানা চাপা অবস্থায় থাকলে তা থেকে হতে পারে ফাঙ্গাল ইনফেকশন ও চুলকানির সমস্যা। অপরিচ্ছন্ন পোশাক ও অন্তর্বাসও সমস্যার কারণ হতে পারে। অন্যের পোশাক বা তোয়ালে ব্যবহার এড়িয়ে যেতে হবে।
যৌন সম্পর্কে পরিচ্ছন্নতা
যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিচ্ছন্নতা জরুরি। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, যৌন মিলনের আগে ও পরে হাত ভাল করে সাবান দিয়ে ধোয়া এবং ব্যক্তিগত অঙ্গ পরিষ্কার রাখা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কন্ডোমের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি যৌনবাহিত সংক্রমণের (এসটিআই) ঝুঁকি কমায় এবং অপরিকল্পিত গর্ভধারণ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। মিলনের পরে মূত্রত্যাগ করলে বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে মূত্রনালির সংক্রমণের ভয় কমে। নিজের ও সঙ্গীর যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাও করাতে হবে।
চিকিৎসকের কাছে কখন যাবেন
শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে লজ্জা পেয়ে এড়িয়ে যাবেন না। অস্বাভাবিক স্রাব, চুলকানি, দুর্গন্ধ, জ্বালা, প্রস্রাবে জ্বালা, যৌনমিলনে ব্যথা, বারবার সংক্রমণ বা ত্বকের পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। অনেকেই ইন্টারনেট দেখে ওষুধ ব্যবহারকরেন বা কিনে খান, যা সমস্যাবাড়িয়ে দেয়। যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘ দিনের সামাজিক সঙ্কোচের কারণে অনেকেই অস্বস্তি অনুভব করেন।ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও দেরিতে শুরু হয়। পরিবারে, স্কুলে এবং সমাজে এই বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও সংবেদনশীল আলোচনা বাড়লে ভুল ধারণা যেমন কমবে, তেমনই বাড়বে সচেতনতা।