ফ্যাটি লিভার থেকে শুরু করে লিভারের জটিলতর রোগ সারাবে ‘স্যাটেলাইট লিভার’। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
লিভারের অসুখ নিয়ে চিন্তার দিন বুঝি শেষ হতে চলল। এখন ফ্যাটি লিভারই হোক বা সিরোসিস— আর প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হবে না। লিভারের রোগে দিনের পর দিন ভুগে মৃত্যুর মুখেও পড়তে হবে না। কারণ, শরীরের ভিতরেই নতুন করে লিভার তৈরি করে ফেলার উপায় পেয়ে গিয়েছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-র গবেষকেরা।
শরীরের ভিতরে নতুন করে লিভার কি তৈরি করা যায়? এত দিন তা অসম্ভব বলেই জানা ছিল। কিন্তু এখন তা সম্ভব করার চেষ্টা করছেন এমআইটির গবেষকেরা। এই অসাধ্য সাধন করতে পারে ‘স্যাটেলাইট লিভার’। এমআইটির গবেষকদের নতুন আবিষ্কার। ইঁদুরের উপর এর পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। ক্ষয়ে যাওয়া বা বিকল হতে চলা লিভারকে আবারও চাঙ্গা করে তোলাই হবে স্যাটেলাইট লিভারের কাজ।
সুচ ফুটিয়ে যকৃতের ছোট ছোট কোষ বিশেষ উপায়ে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। তার পর সেই কোষগুলি রক্ত থেকে পুষ্টিরস সংগ্রহ করবে। ধীরে ধীরে তারা জমাট বাঁধবে এবং যকৃতের ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলিকে সরিয়ে সেই জায়গা নেবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সঠিক ভাবে সম্পন্ন হলে, লিভারের যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে যাবে। ফলে এক দিকে লিভারের ক্ষতস্থান মেরামত হবে, অন্য দিকে প্রতিস্থাপনের আর প্রয়োজনও পড়বে না।
‘স্যাটেলাইট লিভার’ নামে যে কোষগুলিকে শরীরে ঢোকানো হবে, সেগুলি আসলে হেপাটোসাইট কোষ। হেপাটোসাইট হল লিভারের প্রধান কার্যকরী কোষ। এর কাজ অনেক। লিভারের প্রায় ৮০ শতাংশই এই কোষ দিয়ে তৈরি। এরা বিপাকপ্রক্রিয়া সামলায়, দূষিত পদার্থ দূর করে, প্রোটিন সংশ্লেষ করে, পিত্ত তৈরি করে, আবার গ্লাইকোজেন ও লিপিড সঞ্চয়ের মতো কাজও করে। এদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে। হেপাটোসাইট কোষ নষ্ট হলে তা নতুন করে তৈরি হতে পারে। তাই এই কোষগুলিকে যদি বাইরে থেকে শরীরে ঢোকানো যায়, তা হলে এরা নতুন করে লিভারের ক্ষতস্থান মেরামত করতে পারবে।
ফ্যাটি লিভার বা সিরোসিসের মতো অসুখ হলে বা লিভারে ক্যানসার কোষ গজিয়ে উঠলে, সবচেয়ে আগে এই হেপাটোসাইট কোষগুলিরই ক্ষতি হতে থাকে। ক্ষতির পরিমাণ যদি বেশি হয়, তা হলে লিভার ক্ষয়ে যেতে থাকে। তখনই প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। লিভার প্রতিস্থাপন খুব সহজ প্রক্রিয়া নয়। দু’ ভাবে এটি করা হয়। প্রথমত, জীবিত দাতার শরীর থেকে লিভারের একটা অংশকে বার করে এনে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। সে ক্ষেত্রে পরিবারের কোনও সদস্য যেমন স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে বা কাছের কোনও আত্মীয়ের থেকেই লিভারের কিছুটা অংশ নিয়ে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়টি হল, কোনও সদ্যোমৃত ব্যক্তির লিভার নিয়ে তা প্রতিস্থাপন করা। লিভারের ক্ষয়ক্ষতি যদি অনেকটা হয়, বিশেষ করে ক্যানসারের ক্ষেত্রে, তখন সম্পূর্ণ লিভারই প্রতিস্থাপন করার দরকার পড়ে। তবে সেখানেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। দাতা খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ, তা ছাড়া প্রতিস্থাপনের পরবর্তী নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকে। তাই এ সবের বাইরে গিয়ে শরীরেই নতুন করে লিভারের কোষ তৈরি করার চেষ্টাই করছেন গবেষকেরা।
গবেষণার লক্ষ্য কী?
কাটাছেঁড়া ছাড়াই কেবল সুচ ফুটিয়ে লিভারের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দাতার শরীর থেকে নেওয়া লিভার সাধারণত এক জনকেই দেওয়া যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে একটি সুস্থ লিভারের কোষ দিয়ে কয়েকশো রোগীর শরীরে 'স্যাটেলাইট লিভার' তৈরি করা সম্ভব হবে। এই লিভার পিত্তরস তৈরি করবে, টক্সিনও দূর করবে। সিরোসিস রোগীদের যদি এমন লিভারের কোষ ইনজেক্ট করা যায়, তা হলে দীর্ঘ সময় লিভারের কার্যকারিতা ঠিক থাকবে। অস্ত্রোপচারের ধকল নিতে পারবেন না যাঁরা, তাঁদের ক্ষেত্রেও জীবনদায়ী হতে পারে এই প্রক্রিয়া। গবেষকদের দাবি, 'স্যাটেলাইট লিভার' ঠিকমতো কাজ করলে আগামী দিনে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যেতে পারে।