ঘরে ঘরে ল্যাপটপ স্পাইনের সমস্যা, রোগটি কী? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বাসে-ট্রেনে-ঘরোয়া আড্ডায়-অফিসে সর্বত্রই ঘাড় গুঁজে মোবাইলের কি-প্যাডে টাইপ নয়তো নেট হাতড়ানো। এটিই এখন জীবনচর্চায় পরিণত হয়েছে। আর তার হাত ধরেই নতুন অসুখ হানা দিচ্ছে ঘরে ঘরে। চিকিৎসাবিজ্ঞান যার নাম দিয়েছে ‘টেক্সটিং থাম্ব’ এবং ‘ল্যাপটপ স্পাইন’। অর্থাৎ, দীর্ঘ ক্ষণ ডিজিটাল ডিভাইসে টাইপ করে হাতের আঙুল ও কব্জি অবশ হয়ে যাওয়া এবং পিঠ ঝুঁকিয়ে ঘাড় নীচু করে মোবাইল দেখার কারণে ক্রমশ মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়া। এই দুই অসুখ জীবনধারার সঙ্গে এমন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, যে বছর কুড়ির তরুণ বা তরুণীও ভুগছেন বাতজনিত ব্যথায় অথবা মেরুদণ্ডের পঙ্গুত্বে।
টেক্সটিং থাম্ব কী?
পাবমেড জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, মোবাইল ব্যবহারের সময় এবং কী ভাবে তা ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে— এই দু’টি জিনিস মূলত ব্যথার কারণ। টেক্সটিং থাম্ব হল বুড়ো আঙুলের সমস্যা। যা ধীরে ধীরে কব্জির যন্ত্রণারও কারণ হয়ে উঠছে। হাতে একটানা মোবাইল বা ট্যাব ধরে রাখা এবং ক্রমাগত টাইপ করে যাওয়ার কারণে পেশির অসাড়তা বাড়ে। দীর্ঘ দিন এই অভ্যাসে অস্থিসন্ধিতে চাপ সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে ব্যথা শুরু হয়।
হাতের কব্জির কাছে একটি সরু নালির মতো অংশ আছে যাকে ‘কারপাল টানেল’ বলা হয়। অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো। এর মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছে ‘মিডিয়ান স্নায়ু’। এই স্নায়ুই হাতের বুড়ো আঙুল, তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে। যদি কোনও কারণে ওই নালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা স্নায়ুর উপরে চাপ পড়ে, তখন হাতের কব্জিতে যন্ত্রণা শুরু হয়। ‘টেক্সটিং থাম্ব’ এমন এক গুরুতর সমস্যা যা করপাল টানেল সিনড্রোমের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই রোগে কব্জির স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও হাতে মারাত্মক ব্যথা শুরু হয়। মুঠো করে কিছু ধরা, হাত নাড়ানো এমনকি পেন-পেন্সিল ধরতেও সমস্যা হয়।
ল্যাপটপ স্পাইনে ভুগছেন কমবয়সিরাই
ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘ ক্ষণ কুঁজো হয়ে বা ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকার ফলে ঘাড়, কাঁধ এবং মেরুদণ্ডে যে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা হয় তাকেই বলে ‘ল্যাপটপ স্পাইন’। এই অসুখে মেরুদণ্ড চিরতরে বেঁকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘাড়-গলার হাড় ও স্নায়ুর উপর এমন চাপ পড়বে যে পঙ্গুত্বও আসতে পারে। মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার, সারা ক্ষণ ঘাড় নিচু করে স্ক্রিনের দিকে চোখ, এ সব কিছুই ল্যাপটপ স্পাইনের কারণ হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, মাথা নিচু করে মোবাইল ঘাঁটার সময়ে ঘাড় মোটামুটি ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি ঝোঁকে। এতে ঘাড়ের উপর চাপ বাড়ে। সোজা অবস্থায় মেরুদণ্ডকে কোনও বাড়তি ওজন বহন করতে হয় না। কিন্তু যখনই ঘাড় ও গলা ঝুঁকে যায় ততই ঘাড় ও গলাকে অতিরিক্ত ভার বহন করতে হয়। দীর্ঘ দিন এমন ভার বইতে বইতে এক সময় চিরতরে কুঁজো হয়ে যাওয়া বা শিরদাঁড়ার সমস্যা দেখা দেওয়াও অসম্ভব নয়।
এই সব অসুখ সারাতে গেলে একটাই উপায়। যে কোনও ভাবেই মোবাইল ফোনের ব্যবহারে রাশ টানতে হবে। ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে কাজের সময়ে মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন। বিরতি নিয়ে কাজ করতে হবে যাতে মেরুদণ্ডে চাপ না পড়ে।