কেন অল্প খেয়েও মোটা হচ্ছেন, কারণ জানালেন গবেষকেরা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আপনারই সহকর্মী আপনার সামনে বসে আজ পাহাড়প্রমাণ বিরিয়ানি খাচ্ছেন, তো অন্য দিন পিৎজ়া। তার পরেও তাঁর শরীরে এক বিন্দু মেদ জমছে না। আর আপনি মেপেঝুপে খেয়েও ওজন কমাতে কালঘাম ছোটাচ্ছেন। যতই কম খান বা মেপে খান, ক্যালোরি এক ফোঁটাও কমছে না। উল্টে চর্বির স্তর জমছে পেটে। ওজনও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এর কারণ কী? রোগা হওয়ার চেষ্টায় নিরন্তর লড়াই করে যাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের এই একটাই প্রশ্ন, কেন বাকিরা বেশি খেয়েও রোগা। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের বিজ্ঞানীরা। যুক্তি দিয়ে গবেষকেরা জানিয়েছে, রোগা বা মোটা হওয়ার জন্য কেবল খাবারের পরিমাণ দায়ী নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে হরমোনের খেলা ও কিছু জিনের কারসাজি।
শুরুতেই বলা যেতে পারে বিপাক হার বা মেটাবলিজ়মের বিষয়ে। হার্ভার্ডের গবেষকদের বক্তব্য, প্রত্যেকের ‘বেসাল মেটাবলিক রেট’ (বিএমআর) আলাদা। বিপাক হার যাঁর বেশি, তিনি অনেক খেয়েও হজম করে ফেলতে পারবেন। আর যাঁর কম, তিনি জল খেয়েও ফুলে যাবেন। বিএমআর বেশি হলে অনেক বেশি ক্যালোরি পোড়ে খুব কম সময়ে। এমনকি, বিশ্রামের সময়েও। তাই এমন মানুষজন খেয়েদেয়ে, শুয়ে-বসে কাটিয়েও মোটা হবেন না।
দ্বিতীয়ত পেশির ঘনত্ব। ক্যালোরি পোড়াতে পেশিরও বড় ভূমিকা আছে। পেশির ঘনত্ব বেশি হলে খুব তাড়াতাড়ি ক্যালোরি ক্ষয় হয়। শরীরে জমা মেদ পুড়িয়ে তা থেকে শক্তি আহরণ করে পেশি। সে জন্য পেশিবহুল ও বিপাকহার বেশি, এমন লোকজন পরিমাণে অনেক বেশি খেয়েও নির্মেদ চেহারা ধরে রাখতে পারেন। অবশ্য এর জন্য শরীরচর্চাও প্রয়োজন। নিয়মিত ব্যায়ামে পেশির ঘনত্ব ও শক্তি দুইই বাড়বে এবং অনেক বেশি ক্যালোরি পুড়বে।
শরীরে দুই ধরনের চর্বি থাকে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অনেক রোগা মানুষের শরীরে 'ব্রাউন ফ্যাট'-এর পরিমাণ বেশি থাকে। এই চর্বির স্তর শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে ক্যালোরি পুড়িয়ে তাপ উৎপন্ন করে। অন্য দিকে, স্থূলকায় ব্যক্তিদের শরীরে 'হোয়াইট ফ্যাট' বেশি থাকে, যা ক্যালোরি জমিয়ে রাখে।
হরমোনের গোলমালও এর জন্য দায়ী। রক্তে যদি ইনসুলিন হরমোনের পরিমাণে হেরফের হতে থাকে তা হলে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি হয়। ওই অবস্থায় ক্যালোরি কম পোড়ে, চর্বি জমা হতে থাকে।
দায়ী জিনও
রোগা বা মোটা হওয়ার জন্য জিনও দায়ী। শরীরে এমন কিছু জিন থাকে, যা স্থূলত্বের জন্য দায়ী। কোন জিনিসটি আপনি খেতে বেশি ভালবাসেন ও বার বার খেতে চান, সেটি খাওয়ার জন্যই আপনাকে বাধ্য করবে সেই জিন। চাইলেও সেই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন না। এমসি৪আর, লেপটিন, বিএসএন, এনটিআরকে২ নামক কয়েকটি জিন স্থূলত্বের জন্য দায়ী। এই জিনগুলি থাকলে মোটা হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।
‘এফটিও’ নামক আরও একটি জিন আছে, যা খুঁজে পেয়েছেন স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা। দেখা গিয়েছে, এই জিনটি শরীরে থাকলে সেই ব্যক্তির স্থূল হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি থাকে। জিনটি উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আসক্তিও বৃদ্ধি করে।
এমসি৪আর জিনটি আবার মস্তিষ্ক থেকে সঙ্কেত আদানপ্রদানে বাধা দেয়। পেট যে ভরে গিয়েছে, এই সঙ্কেতটি মস্তিষ্ক থেকে অনেক দেরিতে আসে। ফলে মানুষজন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। খিদে না পেলেও বারে বারে খেতে ইচ্ছে করে। ফলে ওজনও বাড়তে থাকে।
তবে কেবল জিন বা হরমোনের দোষ দিলে চলবে না। জিন যতই মোটা হওয়ার দিকে ঠেলে দিক না কেন, যদি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে সংযম মেনে চলা যায়, তা হলে ওজন কমিয়ে ফেলা কোনও ব্যাপারই নয়।