Women Reservation Bill

আগ বাড়িয়ে মুখ পোড়ানো কেন, প্রশ্ন এনডিএ-তেই

শুক্রবার লোকসভায় মোদী সরকারের ১৩১-তম সংবিধান সংশোধনী বিল খারিজ হয়ে যাওয়ার পরে দেশের রাজনৈতিক শিবির, বিশেষ করে মোদী সরকারের অন্দরমহলে এখন একগুচ্ছ প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বিরোধী শিবির থেকে রব উঠেছে, এ হল মোদী সরকারের শেষের শুরু।

প্রেমাংশু চৌধুরী
শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৩৬
সংসদের বিশেষ অধিবেশনে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা। শুক্রবার।

সংসদের বিশেষ অধিবেশনে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা। শুক্রবার। ছবি: পিটিআই।

নিজের নাক কেটে নিজেরই যাত্রাভঙ্গ।

নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের মতো ‘ধুরন্ধর’ রাজনীতিক হার নিশ্চিত বুঝেও কেন হারের রাস্তা বেছে নিলেন? এর ফলে মোদী সরকারের যে মুখ পুড়ল, তার দায় এখন কে নেবেন?পশ্চিমবঙ্গ-তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের মুখে আচমকা মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে আসার হঠাৎ কী এমন প্রয়োজন পড়েছিল? মোদী-শাহ কি এই হার মেনে নেবেন? শুধুই কংগ্রেসকে মহিলা সংরক্ষণে বাধা দেওয়ার জন্য দোষারোপ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করবেন? তাতে কি কোনও রাজনৈতিক লাভ হবে? না কি অন্য কৌশল নেবেন তাঁরা?

শুক্রবার লোকসভায় মোদী সরকারের ১৩১-তম সংবিধান সংশোধনী বিল খারিজ হয়ে যাওয়ার পরে দেশের রাজনৈতিক শিবির, বিশেষ করে মোদী সরকারের অন্দরমহলে এখন একগুচ্ছ প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বিরোধী শিবির থেকে রব উঠেছে, এ হল মোদী সরকারের শেষের শুরু। সাধ করে মোদী সরকার কেন হাত পোড়াতে গেল, সেই প্রশ্নের উত্তর বিজেপি বা এনডিএ-র শরিক দলের নেতারা দিতে পারছেন না। এনডিএ-র অন্যতম শরিক দলের এক শীর্ষনেতার মন্তব্য, ‘‘এ বিষয়ে গোটা রণকৌশলই আমাদের কাছে অস্পষ্ট।’’

মোদী সরকারের জমানায় এই প্রথম কোনও সরকারি বিল লোকসভায় ভোটাভুটিতে খারিজ হয়ে গেল। লোকসভায় শেষ বার কোনও সরকারি বিল খারিজ হয়েছিল ১৯৯০ সালে। রাজীব গান্ধী সরকারের পঞ্চায়েতের ক্ষমতায়নে সংবিধান সংশোধনী বিল সে বার ভোটাভুটিতে খারিজ হয়ে যায়। ২০০২ সালে বাজপেয়ী সরকারের সন্ত্রাস দমন বা ‘পোটা’ বিল রাজ্যসভায় ভোটাভুটিতে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। সংসদের যৌথ অধিবেশন ডেকে সেই বিল পাশ করাতে হয়। তার২৪ বছর পরে এই প্রথম কোনও সরকারি বিল সংসদে ভোটাভুটি খারিজ হয়ে গেল। সেটাও মোদী সরকারের জমানায়। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরীওয়ালের মতে, ‘‘মোদীজির অহঙ্কারের হার হয়েছে। মোদী সরকারের শেষের শুরু হয়ে গিয়েছে।’’

মোদী সরকার সংবিধান সংশোধন করে লোকসভার আসন বাড়িয়ে, জনগণনার অপেক্ষা না করেই লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করতে চাইছিল। যাতে তার ভিত্তিতে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মহিলা সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু সংবিধান সংশোধন করতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ এনডিএ-র কাছে নেই। বিরোধীদের সাহায্য ছাড়া তা সম্ভব নয় বুঝেও মোদী সরকার ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করেনি।

কেন? বিজেপি-র একাংশ নেতার মতে, মোদী-শাহ ধরে নিয়েছিলেন, মহিলা সংরক্ষণের বিরোধিতা করলে রাজনৈতিক ভাবে সমস্যা হবে ভেবে বিরোধীরা এই বিলে সমর্থন করবেন। অথবা মুখে বিরোধিতা করলেও বিরোধীদের একাংশ ভোটাভুটির সময় বিরত থেকে বিল পাশে সাহায্য করবেন। বিরোধীরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে উঠতে পারবেন না। তাঁদের ধারণা ছিল, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ব্যস্ত থাকায় তৃণমূল, ডিএমকে ব্যস্ত থাকায় তাঁদের সাংসদরা লোকসভায় হাজির হবেন না। এর কোনওটাই হয়নি। উল্টে মোদী সরকারকে ভোটাভুটিতে হারিয়ে বিরোধী শিবির চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বিজেপির এক নেতার আফশোস, ‘‘ইন্ডিয়া জোটকে অক্সিজেনজুগিয়ে দিলাম।’’

এনডিএ শরিকদের মতে, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ তাঁদের বলেছিলেন, এ ক্ষেত্রে জিতলেও লাভ, হারলেও লাভ। এমনিতেই ২০২৩-এ মহিলা সংরক্ষণ আইন পাশ করিয়ে নরেন্দ্র মোদী কৃতিত্ব নিয়েছেন। কিন্তু সেই আইনে ২০৩৪-এর লোকসভা নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হত। এখন মোদী সরকার ২০২৯ থেকেই মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার বিল এনেছিল। মোদী-শাহের মত ছিল, বিল পাশ হলে মহিলা সংরক্ষণ ২০২৯ থেকেই কার্যকর করার পুরো কৃতিত্ব মিলবে। হারলে কংগ্রেস তথা বিরোধীদের দোষারোপ করা যাবে।

এনডিএ-র শরিক দলের এক নেতার মতে, ‘‘যো জিতা ওহি সিকন্দর। বিল পাশ হলে মোদী সরকার২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন থেকেই মহিলা সংরক্ষণ হলে কার্যকর হবে বলে ঢাক পেটানো যেত। বিল খারিজের পরে তার জন্য বিরোধীদের দুষে কতটা লাভ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই ধরনের নেতিবাচক প্রচার বিরোধী শিবির থেকে করা সহজ। সরকারের পক্ষে বিরোধীদের দোষ দিয়ে কাঁদুনি গেয়ে ফায়দাতোলা কঠিন।’’

মোদী সরকার পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর ভোটের ঠিক আগে কেন সংসদের অধিবেশন ডেকেছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী শিবিরের মতে, মোদী সরকার মহিলা সংরক্ষণের ঢাক পিটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহিলা ভোটব্যাঙ্কে ধাক্কা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে লাভ হল না। এখন বঙ্গে গিয়ে তৃণমূলকে দোষারোপ করে উল্টো পথে ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হবে। তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে আসন পুনর্বিন্যাসের ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে রাস্তায় নেমেছিলেন। তামিলনাড়ুর বিজেপির এক নেতার মন্তব্য, ‘‘এর ফলে ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে যাবতীয় ক্ষোভবিক্ষোভ পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। এই আসন পুনর্বিন্যাস, দক্ষিণ ভারতকে বঞ্চনাই রাজ্যের ভোটের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। তামিলনাড়ুর ভোটের জন্য এই পদক্ষেপ নিজের পায়ে কুড়ুলমারা হয়ে গেল।’’

মোদী সরকার ২০২৩-এর মহিলা সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী এনে সেই আইন ২০২৯ থেকে কার্যকর করতে চাইছিল। কিন্তু সেই আইনের সরকারি বিজ্ঞপ্তিই এত দিন জারি হয়নি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সেই সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। শুক্রবার সংবিধান সংশোধনী বিল খারিজ হলেও মহিলা সংরক্ষণ আইনে কোনও সমস্যা হচ্ছে না। ফলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মহিলা সংরক্ষণ হতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রচার ধোপে টিকবে কি না, তা নিয়ে বিজেপি শিবিরে প্রশ্ন উঠেছে।

এরই মধ্যে মোদী সরকার শনিবার আচমকা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছে। প্রথমে বেলা একটায় বৈঠক ছিল। সংসদে বিল খারিজ হতেই মন্ত্রিসভার বৈঠকের সময় এগিয়ে বেলা সাড়ে ১১টা করা হয়েছে। মোদী সরকার কি নতুন কোনও কৌশল নেবে? বিজেপি নেতারা এরও কোনও সদুত্তর দিতে পারছে না।

আরও পড়ুন