লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ছবি: পিটিআই।
ভারত থেকে মাওবাদী আতঙ্ক দূর হয়েছে। সোমবার লোকসভায় এমনই বললেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। একই সঙ্গে তিনি জানান, মাওবাদীদের শেষ ঘাঁটি ছত্তীসগঢ়ের বস্তার ‘উন্নয়নের পথে’ হাঁটছে। বস্তারের উদাহরণ টেনে শাহ জানান, লাল সন্ত্রাস সরে গিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘ভারতে মাওবাদ এখন বিলুপ্তির পথে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্পন্ন হলে দেশবাসীকে জানানো হবে। তবে আমি বলতে পারি যে আমরা নকশাল-মুক্ত হয়ে গিয়েছি।’’
২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারত মাওবাদী-মুক্ত হবে, এমনই ঘোষণা করেছিলেন শাহ। মঙ্গলবার বেঁধে দেওয়া সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে। তার আগে লোকসভায় সোমবার এই সংক্রান্ত আলোচনা ছিল। সেই আলোচনায় শাহের বক্তৃতার বড় অংশ জুড়ে ছিল বস্তারের কথা। কী ভাবে নরেন্দ্র মোদী সরকার বস্তারে উন্নয়ন করেছে, তা ব্যাখ্যা দেন শাহ। শুধু বস্তার নয়, দেশের প্রায় সব মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ হয়ে ‘বিকাশের’ পথে হাঁটছে, জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বস্তারের প্রতিটি গ্রামে একটি করে স্কুল তৈরি করার জন্য অভিযান শুরু হয়েছিল। পরে সেখানে ধাপে ধাপে রেশন দোকান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, রাস্তা তৈরি হয়েছে।’’
শাহ মনে করেন, বস্তারের উপর ‘লাল সন্ত্রাস’ থাকায় এলাকায় উন্নয়ন হয়নি। সেখানকার মানুষ পিছিয়ে পড়েছিলেন। ‘লাল সন্ত্রাসের’ কারণে সেখানে উন্নয়ন পৌঁছোতে পারেনি। এখন সেই ছায়া কেটে গিয়েছে। শাহের হুঙ্কার, ‘‘যাঁরা অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে’’— এই নীতিতে বিশ্বাসী মোদী সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বুঝিয়ে দেন, সহিংসতার জায়গা নেই। শাহের কথায়, ‘‘যাঁরা অস্ত্র তুলে নেবেন, তাঁদের কাউকে রেয়াত করা হবে না।’’
দেশকে মাওবাদী-মুক্ত করার পরিকল্পনা কী ভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা লোকসভায় বর্ণনা করেন শাহ। তিনি জানান, ২০১৯ সালের ২০ অগস্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকে স্থির হয়, কী ভাবে মাওবাদী-বিরোধী অভিযান চালানো হবে। পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালের ২৪ অগস্ট মাওবাদী নির্মূল করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তার পরে গত দু’বছর ধরে কেন্দ্রীয় বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের যৌথ অভিযানে একে একে দেশের প্রায় ১২ রাজ্যে অভিযান চলে।
শাহ জানান, গত দু’বছরে ৪,৮৩৮ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে ২,২১৮ জনকে। আর অভিযানে নিহত হয়েছেন ৭০৫ জন মাওবাদী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘আজ যাঁরা বলছেন, সশস্ত্র অভিযান না-করে আলোচনার মাধ্যমে মাওবাদীদের বোঝানো যেত, তাঁদের জন্য এই পরিসংখ্যান দিলাম।’’ তার পরেই শাহ বলেন, ‘‘আজ বলতে কোনও সংশয় নেই যে আমরা নকশালমুক্ত হয়ে গিয়েছি।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শীর্ষ মাওবাদী নেতাদের মধ্যে প্রায় সকলেই হয় আত্মসমর্পণ করেছেন, নয়তো নিহত হয়েছেন।
ভারতে মাওবাদীদের বিস্তারের জন্য কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনকালকে দায়ী করেছেন শাহ। একই সঙ্গে তিনি মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীদের উন্নয়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। শাহের কথায়, ‘‘গত ৭৫ বছরের মধ্যে ৬০ বছর ভারতে শাসন করেছে কংগ্রেস। তবে কেন আদিবাসীরা উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকলেন? প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ বলেছিলেন, দেশের মধ্যে কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে সন্ত্রাসবাদের চেয়ে নকশালবাদ অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও কংগ্রেস জমানায় কিছুই করা হয়নি।’’
ভারতে মাওবাদী সমস্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন শাহ। বক্তৃতায় তিনি ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালের কথা উল্লেখ করেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রাথমিক সতর্কতাগুলিকে কার্যকর ভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। সেই কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনটি বিস্তার লাভ করেছে।’’ শাহের অভিযোগ, নকশালবাদের মূল মন্ত্র কখনওই উন্নয়ন ছিল না। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জেতার জন্য সময় ইন্দিরা গান্ধী সেই মতাদর্শকে সমর্থন করেছিলেন। বামপন্থী মতাদর্শের জন্যই নকশালবাদের বিস্তার হয়। শাহ বলেন, ‘‘নকশালবাদের সূচনা হয় পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে।’’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘এতগুলো বছরে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় আইনের শাসন ছিল না। তারা সংসদীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। সেই কারণে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্রের মধ্য বাস করেছে। হাজার হাজার তরুণ, তরুণী প্রাণ হারিয়েছেন।’’
নিরাপত্তাবাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে মাওবাদীরা তাঁদের অস্ত্রভান্ডার পূর্ণ করতেন, লোকসভায় বলেন শাহ। তাঁর কথায়, ‘‘মাওবাদীদের ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রায় ৯২ শতাংশই পুলিশের থেকে লুট করা।’’ শাহ আক্রমণ শানিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকেও। তাঁর দাবি, মাওবাদী নেতা হিডমার সমর্থনে ওঠা স্লোগানের মঞ্চে ছিলেন রাহুল। তাঁর ভারত জোড় যাত্রায় যোগ দিয়েছিল কয়েকটি মাওবাদী সংগঠনও।