Assam Assembly Election

অসমে জয়ের হ্যাটট্রিক করল বিজেপি, বিপুল ব্যবধানে জয়ী মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত, কংগ্রেসের গৌরব নিজেই হারলেন

অসমে বিজেপি একাই ৮২টি আসনে জিততে চলছে। শতাংশের হিসাবে ৩৮ ভাগেরও বেশি ভোট পেয়েছে তারা। কংগ্রেস একক ভাবে সাড়ে ২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯টিতে জিততে চলেছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ২০:০৬
হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

হিমন্ত বিশ্বশর্মা। —ফাইল চিত্র।

আসন বাড়িয়ে টানা তৃতীয় বা অসমে বিধানসভা ভোটে জয়ী হল বিজেপি। ১২৬ আসনের অসম বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৭৬টি আসন। জয় এবং এগিয়ে থাকার প্রবণতা বলছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র ঝুলিতে অন্তত ৮২টি আসতে চলেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জিততে চলেছে ২২টিতে। প্রাক্তন সাংসদ বদরুদ্দিন আজমলের দল এআইইউডিএফ দু’টি আসন পেতে চলেছে।

Advertisement

গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা জালুকবাড়ি কেন্দ্রে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। অন্য দিকে, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা লোকসভায় কংগ্রেসের সহকারী দলনেতা গৌরব গগৈ যোরহাট আসনে পরস্ত হয়েছেন। এ বার তাঁকেই অঘোষিত ভাবে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে কংগ্রেস তুলে ধরেছিল। বিজেপি একাই ৮২টি আসনে জিততে চলছে। শতাংশের হিসাবে ৩৮ ভাগেরও বেশি ভোট পেয়েছে তারা। কংগ্রেস একক ভাবে সাড়ে ২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৯টিতে জিততে চলেছে।

এ বারের বিধানসভা ভোটে পুরনো সহযোগী অসম গণ পরিষদ (অগপ), ‘বড়োল্যান্ড পিপল্‌স ফ্রন্ট’ (বিপিএফ)-এর পাশাপাশি নিম্ন অসমের রাভা-হাজং স্বশাসিত পরিষদের ক্ষমতাসীন দল রাভা-হাজং যৌথ মঞ্চের সঙ্গে জোট গড়েছিল বিজেপি। অন্য দিকে, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘অসম সম্মিলিত মোর্চা’য় ছিল সিএএ বিরোধী আন্দোলনের নেতা অখিল গগৈয়ের নেতৃত্বাধীন রাইজর দল, প্রাক্তন আসু (অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) নেতাদের দল ‘অসম জাতীয় পরিষদ’ (এজেপি), জনজাতি সংগঠন ‘অল পার্টি হিল লিডার্‌স কনফারেন্স’ এবং সিপিএম, সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর মতো বামপন্থী দল। তৃণমূল আলাদা ভাবে ২৩টি আসনে লড়েছে এ বার। এ ছাড়া ছিল বাংলাভাষী সংখ্যালঘুদের মধ্যে প্রভাবশালী নেতা বদরুদ্দিন আজমলের দল ‘অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট’ (এআইইউডিএফ)।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জোট বেঁধেছিল বদরুদ্দিনের দল এআইইউডিএফ-এর সঙ্গে। লক্ষ্য ছিল, বরাক উপত্যকা এবং নিম্ন অসমে সংখ্যালঘু ভোট বিভাজন এড়ানো। কিন্তু অনেকের মতে, এর ফলে উজান অসমে মেরুকরণের রাজনীতি করতে সুবিধা হয়ে গিয়েছিল বিজেপির। অসম গণ পরিষদের সঙ্গে জোট বাঁধায় ঐতিহ্যগত ভাবে ‘কংগ্রেস বিরোধী’ হিসেবে পরিচিত অহমিয়া ভোটের বড় অংশ পদ্মের ঝুলিতে এসেছিল। পাশাপাশি, কংগ্রেসের ‘চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্ক’ হিসাবে পরিচিত ‘আলি-কুলি-বাঙালি’ সমীকরণেও ভাঙন ধরেছিল। নিম্ন অসমে বাংলাভাষী মুসলিম ভোটের বড় অংশ কংগ্রেস-এআইইউডিএফ জোট পেলেও বরাক উপত্যকায় বাঙালি ভোট গিয়েছিল বিজেপিতে। সেই সঙ্গে ‘কুলি’ হিসাবে পরিচিত চা-শ্রমিক ভোটও।

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছিল, সেই ক্ষত মেরামত করতে পারেনি রাহুল গান্ধী-মল্লিকার্জুন খড়্গের দল। বরং অসমে চা চাষের ইতিহাসে প্রথম বার শ্রমিকদের হাতে জমির পাট্টা তুলে দিয়ে বাজিমাতে অনেকটাই সফল বিজেপি। শ্রমিক কলোনির ভিতরে হয়েছে পাকা হয়েছে রাস্তা, হয়েছে পাকা বাড়ি। ভোটের আগে চা-শ্রমিকদের মজুরিও ৩০ টাকা বাড়িয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তের সরকার। যা বার বার এসেছিল ভোটের প্রচারে। ২০২১ সালের ভোটে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নেতৃত্বে লড়ে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেছিল বিজেপি। কিন্তু ভোটে জেতার পরে সর্বানন্দের উপর ভরসা রাখতে না পেরে কংগ্রেস-ত্যাগী হিমন্তের হাতে দিসপুরের কুর্সি সঁপে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা।

গত পাঁচ বছরে দু’টি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন হিমন্ত। প্রথমত, কংগ্রেস ভাঙিয়ে তাঁর প্রাক্তন সতীর্থদের বিজেপিতে আনা। দ্বিতীয়ত, বুলডোজার চালিয়ে সরকারি জমি থেকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের অবৈধ দখলদারি’ উচ্ছেদ। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ভূপেন বরা, প্রদ্যুৎ বরদলৈয়ের মতো নেতাদের সরাসরি টিকিট দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, কংগ্রেসত্যাগী কয়েক জন সংখ্যালঘু বিধায়ক এবং নেতাকে সহযোগী অগপ-র টিকিট পাওয়ার বন্দোবস্তও করে দিয়েছেন। ভোটের ফল বলছে, তাঁদের অধিকাংশই জিতেছেন।

অন্য দিকে, প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের পুত্র গৌরবকে ভোটের আগে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি করে এ বারের ভোটে তাঁকেই কার্যত মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছিল কংগ্রেস। সেই সঙ্গে প্রচার এবং প্রার্থী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রিয়ঙ্কা বঢরা। তরুণের মন্ত্রিসভাতেই একসময় হিমন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। কেন্দ্রে ক্ষমতার পালাবদলের পরে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে দেড় দশকের কংগ্রেস শাসনে ইতি টেনে প্রথম বার মুখ্যমন্ত্রিত্ব কব্জা করেছিল বিজেপি। পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালে অসমের বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জোট ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কংগ্রেসের জোট পেয়েছিল সাড়ে ৪৩ শতাংশ। এনডিএ সে বার পেয়েছিল ৭৫টি আসন। কংগ্রেসের জোট ৫০টি। এ বার কংগ্রেস জোটের আসন কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।

গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এবং কংগ্রেসের জোটের মধ্যে ভোটের ব্যবধান বেড়ে ৬ শতাংশ পেরিয়ে যায়। ৪৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে এনডিএ-র অসমীয়া সংস্করণ ‘নর্থ-ইস্ট ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ জয়ী হয় ১১টিতে। অন্য দিকে, অসমিয়া ছাত্র সংগঠন আসুর প্রাক্তন নেতা লুরিণজ্যোতি গগৈয়ের অসম জাতীয় পরিষদ (এজেপি)-কে সঙ্গী করে কংগ্রেসের ঝুলিতে এসেছিল প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট। গৌরব-সহ ‘হাত’ প্রতীকের তিন প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। এ বারের ভোটে কংগ্রেসের গৌরবের সঙ্গী ‘অন্য দুই গগৈ’, রাইজর দলের প্রধান অখিল গগৈ শিবসাগরে জয়ী হয়েছেন। অন্য দিকে, এজেপি প্রধান লুরিনজ্যোতি গগৈ পরাস্ত হয়েছে খোয়াং আসনে।

Advertisement
আরও পড়ুন