—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
সর্বভারতীয় ডাক্তারি পরীক্ষা নিট বা সিবিএসই বোর্ডের পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের ক্ষোভ এখনও ফিকে হয়নি। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (এবং কিছু ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ে) স্নাতকে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা বা কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (সিইউইটি) ঘিরে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হল। হাজার হাজার পরীক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকেরা দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
কম্পিউটার চালিত পরীক্ষা ব্যবস্থায় যান্ত্রিক গোলযোগে শনিবার অনেকেই সিইউইটি পরীক্ষা শেষ করতে পারেননি বলে সংগঠক ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) তরফেও আক্ষেপ করা হয়েছে। এক্স হ্যান্ডলে এনটিএ পরে জানায়, বায়োমেট্রিক নথিভুক্তির পরেও প্রথমার্ধ্বে যান্ত্রিক বিভ্রাটে যাঁরা পরীক্ষা শেষ করতে পারেননি, সেই পরীক্ষার্থীদের পরে ফের সুযোগ দেওয়া হবে।
এ দিন দু’টি পর্যায়ে সিইউইটি-র পরীক্ষা ছিল। প্রথম পর্যায়ে বেলা ন'টা থেকে দুপুর বারোটা পরীক্ষার সময় নির্দিষ্ট হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিকেল তিনটে থেকে সন্ধ্যা ছ'টা পর্যন্ত পরীক্ষা ছিল। সল্টলেকে সেক্টর ফাইভের টিসিএস গীতবিতানে পরীক্ষা কেন্দ্রটি ছিল। কলকাতা এবং তার আশপাশের জেলা থেকে বহু পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে আসেন। সকাল ন’টার পরীক্ষার জন্য পরীক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময় সকাল ৮টায় পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকে যান। কিন্তু অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু হতে পারেনি। যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে পরীক্ষা শুরু হতে দেরি হয় বলে জানা যায়। যে-সব অভিভাবকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁরা জানান, বাইরে ঘোষণা করা হয় যে সার্ভার ডাউনের জন্য পরীক্ষা শুরু হতে দেরি হচ্ছে। বারাসত থেকে আসা এক অভিভাবক অসীম মিত্র বলেন, "পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত শুরু হবে কি হবে না কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। অজস্র অভিভাবক রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত শুনতে পাই পরীক্ষা বেলা ১১টা নাগাদ শুরু হয়েছে।"
দ্বিতীয় পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল তিনটে থেকে। টিসিএস গীতবিতানের সামনে দ্বিতীয়ার্ধের পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। দ্বিতীয়ার্ধের পরীক্ষার্থীদের গেট খোলার কথা ছিল দুপুর আড়াইটেয়। কিন্তু দেখা যায় সেই গেট বন্ধ। ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে ব্যাপক ভিড় জমে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের পরীক্ষা কখন শুরু হবে, আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঘোষণা হয়, এই পরীক্ষা শুরু হবে বিকেল চারটেয়। যাঁরা দ্বিতীয়ার্ধের তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা দেবেন তাঁদের পরীক্ষা শেষ হবে সন্ধ্যা সাতটায়।
সন্ধ্যা সাতটায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে বাড়ি ফেরা নিয়েও সমস্যায় পড়েন পরীক্ষার্থীরা। দিঘা থেকে আসা এক অভিভাবক রবীন্দ্র সাহু বলছিলেন, “ফেরার কোনও উপায় নেই! কলকাতায় কাছাকাছি কোথাও ঘর ভাড়া নিয়ে রাতটা পার করতে হবে।”
পরীক্ষার এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। কেন্দ্রকে কটাক্ষ করে এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, “চারটে পরীক্ষা। এক কোটি পরীক্ষার্থী। একটা পরীক্ষাও স্বচ্ছতার সঙ্গে, সুষ্ঠু ভাবে করা গেল না। ওঁরা ‘বিশ্ব নেতা’ হওয়ার দাবি জানান, কিন্তু দেশে একটা পরীক্ষাও ঠিক করে নিতে পারেন না। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটাই ধ্বংস করে দিয়েছেন মোদী। যে যে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছেন, তার দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে।” কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে রাহুলের খোঁচা, “মন্ত্রী প্রধান অবশ্যই তাঁর অযোগ্যতা, ঔদ্ধত্য এবং উদাসীনতার জন্য কলঙ্কিত ও সকলের সামনে চিহ্নিত হয়েছেন। তাঁর ভাবমূর্তি আর বাঁচানো সম্ভব নয়, তাঁর সমর্থক ও ঢাকঢোল পেটানো লোকেরাও তাঁকে পরিত্যাগ করছেন। তাঁরা এখন প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি রক্ষায় মনোনিবেশ করেছেন।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে রাহুলের মন্তব্য, “যিনি লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর দুর্ভোগে সম্পূর্ণ নীরব ও উদাসীন, তিনি নাকি পরিস্থিতি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন! এখনও মোদী সরকার শুধু লোকদেখানো কাজ আর জনসংযোগ করে যাচ্ছে। ২১ জুন নিট-ইউজি পরীক্ষার ব্যবস্থাপনার জন্য ভারতীয় সেনার ব্যবহার শুধুমাত্র তাঁদের সততা ও দক্ষতাকে পুঁজি করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র। এটা স্পষ্ট যে, এই মাসে নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রশ্নপত্র সরবরাহকারীদের তরফে নয়, বরং প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারী এবং অনুবাদকদের তরফে ঘটেছে। এনটিএ-র দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদার এবং বাইরে থেকে নিয়োগ করা (আউটসোর্সড) কর্মী বাহিনীকে ভাঙতেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু, মোদী সরকার তাঁদের বিনা বাধায় ছেড়ে দিচ্ছে, কারণ এটা গোপন হলেও সকলেই জানেন যে, তাঁদের বেশিরভাগই আরএসএস-ঘনিষ্ঠ। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী প্রধানের এই যুগলবন্দি সারা দেশের লক্ষ লক্ষ যুবকযুবতীর আশা-আকাঙ্ক্ষা ধ্বংস করে দিচ্ছে।”
দ্বিতীয়ার্ধের পরীক্ষা অবশ্য এ দিন নির্বিঘ্নেই হয়। টিসিএস-এর কিছু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এ দিন কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (সিইউইটি)-এ ব্যাপক বিপত্তি দেখা দিয়েছিল বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। তা নিয়ে বিবৃতিও জারি করেছে টিসিএস। তাদের তরফে বলা হয়েছে, “আজ সকালের শিফ্টে একটি সংক্ষিপ্ত প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সিইউইটি-ইউজি পরীক্ষা প্রায় দু’ঘণ্টা বিলম্বিত হয়েছে। আমাদের কারিগরি দল দ্রুত সমস্যাটি শনাক্ত করে সমাধান করেছে এবং এর পরে নির্বিঘ্নে ফের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত। আমরা সক্রিয় ভাবে পুরো ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছি। কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষাগুলি নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে আমরা এনটিএ-এর সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”