রান্নার গ্যাসের অপেক্ষায়। উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে শুক্রবার। ছবি: পিটিআই।
কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন (এলএনজি) কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ফলে ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানও ধাক্কা খেতে চলেছে। কারণ, ভারতের গ্যাস আমদানির শতকরা ৪৭ ভাগ কাতারের এই উৎপাদন কেন্দ্র থেকেই আসে। মোদী সরকারের পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা আজ এ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে মেনে নিয়েছেন, “এর ফলে আমাদেরও ধাক্কা লাগবে।”
এমনিতেই এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের আমদানি ‘চিন্তার কারণ’। গৃহস্থের জন্য রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার জোগানে এখনও সমস্যা নেই। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এলপিজি আমদানির বিকল্প উৎস সন্ধানে পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের কর্তাদের রাতের ঘুম ছুটে গিয়েছে। কারণ, পশ্চিম এশিয়া বাদে রাশিয়ার মতো বিকল্প দেশ থেকে অশোধিত তেল আমদানি করা গেলেও গ্যাসের ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়াই প্রধান ভরসা।
পেট্রল-ডিজ়েল বা অশোধিত তেলের অভাব না থাকলেও অশোধিত তেলের দাম মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছে। ভারতে আমদানি করা অশোধিত তেলের দাম বৃহস্পতিবার ব্যারেল প্রতি ১৫৬ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। ভারতের আমদানি করা অশোধিত তেলের দাম ২০২৬-এ ১৫৮ শতাংশ বেড়েছে। পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের শীর্ষ কর্তারা মনে করছেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ থামলেও তেল-গ্যাসের দাম ও জোগান নিয়ে মাথাব্যথা থেকে যাবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা, তেল শোধন সংস্থাগুলি অশোধিত তেলের দাম বাড়লেও এখনও পেট্রল, ডিজ়েলের দাম বাড়াতে পারেনি। সূত্রের খবর, মোদী সরকার এখনই পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানোর পক্ষে নয়। কারণ তিনটি। এক, সামনেই পাঁচটি বিধানসভা নির্বাচন। দুই, তেল সংস্থাগুলি অতীতে মুনাফা করেছে বলে এই বোঝা নিতে পারবে বলে সরকারের মত। তিন, এখন জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যবৃদ্ধি ও আর্থিক বৃদ্ধিতে ধাক্কা লাগবে। পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়াতে না পারায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি প্রিমিয়াম পেট্রল ও শিল্পের প্রয়োজনের ডিজ়েলের দাম বাড়িয়েছে। পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মার বক্তব্য, মোট পেট্রল বিক্রির মাত্র ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম পেট্রল। পেট্রল-ডিজ়েলের দাম এখনও বাড়েনি।
এলপিজি, অশোধিত তেল নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেই এ বার প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি নতুন চিন্তা হয়ে উঠেছে। ইরানের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র সাউথ পার্স-এ ইজ়রায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব দিতে ইরান পাল্টা কাতারের গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফানে হামলা চালায়। কাতার ইতিমধ্যেই রাস লাফানের এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। এ দিকে কাতার থেকে ভারতের বছরে ৮৫ লক্ষ টন এলএনজি কেনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। দেশের প্রয়োজনের অর্ধেক এলএনজি-ই ভারতকে আমদানি করতে হয় এবং তার বেশির ভাগ আসে কাতার থেকে। কাতার মূলত রাস লাফান শিল্পনগরী থেকেই ভারতকে গ্যাস পাঠায়। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, কাতার ও পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশ থেকে এনএলজি নিয়ে জাহাজ এত দিন হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকছিল। এখন কাতার রাস লাফানে গ্যাস উৎপাদনই বন্ধ করে দিলে সমস্যা বাড়বে। আগেই বিভিন্ন শিল্পে এলএনজি জোগান কাটছাঁটকরতে হয়েছে।
ভোটের কারণে পেট্রল-ডিজেলের দাম এখনই না বাড়লেও বিমানের জ্বালানির খরচ এপ্রিলের গোড়া থেকেই বাড়তে পারে বলে সরকারি সূত্রের খবর। মার্চের গোড়ায় এক প্রস্ত তেলের দাম বেড়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের জ্বালানির দাম ইতিমধ্যেই ৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
সূত্রের খবর, সরকারের নিজস্ব সমীক্ষা অনুযায়ী পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চলতে থাকলে, অশোধিত তেলের দাম লাগামছাড়া হবে এবং ভারতের আমদানির খরচ ৩০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যেতে পারে। ভোটের মরসুম চলে গেলেই পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়াতে হতে পারে। অন্য দিকে ভারত থেকে পণ্য আমদানিও ধাক্কা যাবে। দুই মিলিয়ে মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বে।