লখনউয়ে ভস্মীভূত কোচিং সেন্টার। ছবি: পিটিআই।
ফোন বেজে উঠতেই স্ক্রিনের উপর ভেসে ওঠে পুত্রের নাম এবং নম্বর। তড়িঘড়ি ধরতেই ফোনের ও পার থেকে আর্তনাদ, ‘‘বাবা, আমাকে বাঁচাও!’’ তার পরেই হুড়োহুড়ি, চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ। কিন্তু আর পুত্রের কোনও শব্দ শুনতে পেলেন না লখনউয়ের প্রভজ্যোৎ সিংহ। ছুটে যান অলিগঞ্জের সেই অগ্নিগর্ভ বিল্ডিংয়ে। সেখানকার উপরের তলায় অ্যানিমেশন সেন্টারের শিক্ষকতা করেন প্রভজ্যোতের পুত্র সুখমণি সিংহ। শুধু প্রভজ্যোত একা নন, আরও অনেক উদ্বিগ্ন মুখ ওই বিল্ডিংয়ের বাইরে, পরে হাসপাতালের বাইরে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। সকলেই নিজেদের পরিচিতদের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ চোখের সামনে দেখলেন তাঁর নিকট আত্মীয় বা সন্তানের দেহ স্টেচারে করে বার করছেন উদ্ধারকারীরা।
লখনউয়ের কিং জর্জ মেডিক্যাল কলেজের মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকে। সকলকেই অগ্নিকাণ্ডে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। কেউ কাঁদছেন, কেউ উদাসীন মুখে ঘুরছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রিয়জনের শেষ ফোনের কথা বলছেন। দুপুর ২টো নাগাদ পুত্রের ফোন পান প্রভজ্যোৎ। সেই ফোনে পুত্রে আর্তি, ‘‘বাবা, আমাকে বাঁচাও। আমাদের বার হওয়ার রাস্তা নেই।’’ ওই অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়ছে জয়নীল চক্রবর্তী নামে এক যুবকের। তিনি ওই কোচিং সেন্টারে কাজ করতেন। তাঁর আত্মীয় বিশ্বনাথ সরকার জানান, দুপুরে জয়নীল তাঁর কাকিমাকে ফোন করেছিলেন। ফোনে একই আর্তি, ‘‘আমাকে বাঁচাও। আমি আটকে আছি।’’
দুপুর ২টো ৩৫ মিনিট নাগাদ ২৬ বছর বয়সি চিকিৎসক রবীন্দ্র কুমার তাঁর বন্ধু আশুতোষ সাক্সেনার থেকে একটা ফোন পান। সেই ফোনের কথা উল্লেখ করে রবীন্দ্র বলেন, ‘‘আমি ঘটনাস্থল থেকে ২ কিলোমিটার দূরে ছিলাম। দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি চারপাশে আতঙ্ক। আশুতোষের ফোনের ও পার থেকে শুধু চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পাই।’’
যে বিল্ডিংয়ে আগুন ধরে সেটি তিন তলার। নীচের তলায় পোষ্য জীবজন্তুর দোকান ছিল। উপরে ছিল কোচিং সেন্টার। জানা গিয়েছে, সেখানে অ্যানিমেশন সেন্টার ছিল। বহু কিশোর-কিশোরী সেখানে অ্যানিমেশন শিখতে যেত। সোমবার দুপুরে যখন আগুন লাগে, তখন ওই বিল্ডিংয়ে অনেক পড়ুয়াই ছিল। অগ্নিকাণ্ডে শুধু পড়ুয়া বা ওই কোচিংয়ের কর্মীদের মৃত্যু হয়নি, ঝলসে গিয়েছে অনেক জীবজন্তুও।
আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় পড়ুয়াদের মধ্যে। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে বিল্ডিংয়ের জালনা ভেঙে নীচে ঝাঁপ দেয়। কেউ কেউ পিছনের দিক দিয়ে বার হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু অনেকেই ধোঁয়া এবং আগুনের তীব্রতার কারণে পথ হারিয়ে আটকা প়ড়ে যায়। তাদের উদ্ধার করতে বেশ বেগ পেতে হয় উদ্ধারকারী দলকে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া দৃশ্যে দেখা যায়, দমকলকর্মীরা ইটের দেওয়াল ভেঙে তার ভিতর দিয়ে জলের পাইপ ঢুকিয়ে আগুন নেবানোর চেষ্টা করছেন। আবার অন্য দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, দমকলকর্মীরা গর্তের মধ্যে দিয়ে স্টেচারে করে মৃতদেহ বার করে আনছেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করেছেন উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক। প্রায় প্রথম থেকেই ঘটনাস্থলে ছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘ভিতরে প্রবেশের কোনও পথ ছিল না। ভিতরে ঢোকার জন্য দেওয়াল ভাঙতে হয় উদ্ধারকারী দলকে।’’