প্রত্যক্ষদর্শী মনিন্দ্র সিংহ আঙুল তুলেছেন পুলিশের দিকে। (ইনসেটে) যুবরাজ মেহতা। — ফাইল চিত্র।
যুবরাজ মেহতার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? এই প্রশ্নেই এখন তোলপাড় নয়ডা-সহ গোটা দেশ। অভিযোগ পাওয়ার পরেও কেন নয়ডার সেক্টর ১৫০-এ ওই গহ্বর বুজিয়ে ফেলা হয়নি, সেই নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সমালোচনার মুখে পড়েছে পুরপ্রশাসন। পরিবারের অভিযোগ, প্রায় ৭০ ফুট গভীর খাদ থেকে ২৭ বছরের ইঞ্জিনিয়ারকে তোলার ক্ষেত্রে কম সক্রিয়তা দেখিয়েছে পুলিশ এবং দমকল। প্রথমে সেই কথা বলেও পরে উল্টো সুর শোনা গিয়েছিল ঘটনার সাক্ষী ডেলিভারি এজেন্টের গলায়। এ বার সেই নিয়েই মুখ খুললেন সেই প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি আদতে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল পুলিশ।
গত শুক্রবার অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে খাদে পড়ে গিয়েছিল ২৭ বছরের ইঞ্জিনিয়ারের গাড়ি। জলে ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর। খাদের ধারে দাঁড়িয়ে পুত্রকে মরতে দেখেন অসহায় বাবা। পুলিশ,দমকলকর্মীদের পাশাপাশি সেখানে ছিলেন ২৬ বছরের এক ডেলিভারি এজেন্ট। মনিন্দ্র সিংহ ওই শীতের রাতে কোমড়ে দড়ি বেঁধে খাদে নেমেছিলেন যুবরাজকে উদ্ধারের জন্য। যদিও লাভ হয়নি। সেই ডেলিভারি এজেন্টের দাবি, পুলিশ আধিকারিকেরা তাঁকে ১০ দিন সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। এমনকি, তাঁকে বক্তব্য বদলাতেও বাধ্য করেছেন।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মনিন্দ্রের বক্তব্যের দু’টি ভিডিয়ো (আনন্দবাজার ডট কম তার সত্যতা যাচাই করেনি)। তার পরেই সংবাদমাধ্যমের একাংশের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শী মনিন্দ্র নিজের বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে উল্টো কথা বলেছেন। একটি ভিডিয়োতে তাঁকে পুলিশ এবং দমকলকর্মীর বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে দেখা গিয়েছে। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ঠান্ডার কারণে উদ্ধারকারী দল খাদে নামতে চায়নি। অন্য একটি ভিডিয়োতে মনিন্দ্রকে বলতে শোনা যায়, খবর পাওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় পুলিশ। অনেক চেষ্টা করেও যুবরাজকে বাঁচাতে পারেনি তারা।
প্রশ্ন ওঠে কেন এই কথা বললেন মনিন্দ্র। নয়ডার ওই ডেলিভারি এজেন্ট সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘‘আমাকে থানায় ডেকে পাঠানো হয়। ওরা আমাকে একটি স্ক্রিপ্ট দিয়ে সেই মতো কথা বলিয়ে অন্য একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করে।’’ থানার কাছে একটি পার্কে তাঁকে জোর করে সাড়ে ৪ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ মনিন্দ্রের। তিনি জানান, এই মামলায় কথা বলবে বলে পুলিশ তাঁকে থানায় ডেকে পাঠিয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘‘আমি যখন সেখানে যাই, তখন তিন থেকে চার জন পুলিশ কর্মী আমাকে পাশে পার্কে নিয়ে যান। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য বকাবকি করেন। পুলিশের পক্ষে বয়ান দিতে বলে আমাকে। বলতে বলে, যুবরাজ মেহতাকে বাঁচাতে জলে নেমে পুলিশ সব রকম চেষ্টা করেছিল পুলিশ।’’ মনিন্দ্রের দাবি, ভয়ে সে সময় তিনি পুলিশের কথা মেনে নেন। তিনি বলেন, ‘‘পরে সিদ্ধান্ত নিই, সত্যের সঙ্গে দাঁড়াব, কারণ আমিই এই ঘটনার একমাত্র সাক্ষী। আমার পরিবার, স্থানীয়েরাও আমাকে সমর্থন করেছেন।’’
এই পরিস্থিতিতে জানা গিয়েছে, নয়ডার সেক্টর ১৫০-এ রাস্তার ধারে গভীর জলাশয় নিয়ে তিন বছর আগে প্রশ্ন তুলেছিল রাজ্য সেচ দফতর। শুধু প্রশ্ন তোলাই নয়, নয়ডা অথরিটিকে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে রাস্তার ধারের ওই গভীর গর্তে জমা জল কী ভাবে সরানো যায়, তা নিয়ে চিঠিও দিয়েছিল। সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ২০২৩ সালে উত্তরপ্রদেশ সেচ দফতর নয়ডা প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে, জলাশয় থেকে অতিরিক্ত জল সেচ করে হিন্দন নদীতে ফেলা হোক। সেই কাজের জন্য টাকাও বরাদ্দ করা হয়েছিল বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে বলে পিটিআই জানিয়েছে। কিন্তু সেই প্রকল্প বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। তার পরেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যুবরাজের মৃত্যুর পরে সেই প্রশ্ন উঠেছে।