সবুজে মোড়া ত্রিপুরার ‘খ্রিস্টান পাড়া’ গ্রাম। নিজস্ব চিত্র ।
ত্রিপুরার অমরপুর মহকুমার এক দুর্গম ও জনজাতি অধ্যুষিত গ্রাম ‘খ্রিস্টান পাড়া’ অন্য সব গ্রামের চেয়ে যেন একেবারেই আলাদা। গাছগাছালি, টিলা ও পাহাড়ের অবশেষে ঘেরা এই গ্রামটির প্রায় কোথাওই কোনও নোংরা-আবর্জনা নেই। দারিদ্রের ছোঁয়া আছে, আধুনিকতার চিহ্ন নেই, কিন্তু দেখলে মনে হয়, পুরো গ্রামটি যেন পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো হয়ে থাকে, প্রতিদিন। ঘর থেকে উঠোন কিংবা আশপাশ, চারিদিকে পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া। রাজ্য সরকার এই গ্রামকে শীঘ্রই সম্পূর্ণ ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন জেলাপ্রশাসনের আধিকারিকেরা।
অমরপুর ব্লকের বিডিও উৎপল দাস জানান, রাজ্যের উত্তর ত্রিপুরা জেলার জম্পুই হিলের ভাংমুন গ্রামটিই এত দিন এই রাজ্যের একমাত্র পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তবে, এবার খ্রিস্টান পাড়া গ্রামটিও একই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। বিডিও জানালেন, ২০২২ সালে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নিজের ব্লকের এই গ্রামটিকে স্বচ্ছ গ্রাম করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। ওই গ্রামের বাসিন্দাদেরও নিজেদের গ্রামকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করে তোলার ব্যাপারে আন্তরিক সদিচ্ছা ছিল।
খ্রিস্টান পাড়ার অধিবাসীদের সবাই রিয়াং সম্প্রদায়ের ও খ্রিস্টান। মাত্র ১১টি পরিবারের বাস। সকলেই কৃষিজীবী। তাঁরা মাশরুম চাষ যেমন করছেন, তেমনই ধান চাষও করেন। বিডিও জানান, অমরপুর এবং করবুক মহকুমার মাঝখানে ভোমরাছড়া এডিসি ভিলেজের অন্তর্গত খ্রিস্টান পাড়ার পরিধি মাত্র ১ বর্গ কিলোমিটার। কিছু দিন আগেও সেখানে কোনও পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না। সরকারি উদ্যোগে বর্তমানে সবার ঘরে ঘরে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতেরও ব্যবস্থা হয়েছে। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে কাজটি হয়েছে স্থানীয়দের সহযোগিতায়। বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে গ্রামে।
স্থানীয়রা জানান, এখন অনেকেই এই গ্রামের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা উপভোগ করতে সেখানে বেড়াতে যাচ্ছেন। বিডিও মনে করেন, এই গ্রামটিকে ঘিরে পর্যটনের ভাল সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ, ভ্রমণবিলাসী মানুষ সবার আগে কদর করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিছন্নতার। তা ছাড়া, রাজ্যের দুই বিশেষ পর্যটনস্থল ছবিমুড়া এবং ডম্বুর লেকের মাঝামাঝি এলাকায় রয়েছে এই গ্রামটি। ইতিমধ্যেই ওই গ্রামটি দেখতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। এখানে আসা পর্যটকদের কাছে আরও একটি বড় পাওনা হলো, জৈব ফসল কেনা। এখানকার অধিবাসীরা শুধুমাত্র জৈব ফসলেরই চাষ করেন।
বিডিও জানান, গ্রামটিকে ঢেলে সাজাতে বিভিন্ন উদ্যোগ চলেছে। অতি সম্প্রতি ওই গ্রামে পর্যটকদের জন্য একটি হোমস্টে এবং মেডিটেশন সেন্টার তৈরি করার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পঞ্চায়েত দফতরের অধিকর্তা এবং গোমতী জেলার জেলাশাসক ইতিমধ্যেই ওই এলাকাটি ঘুরে গিয়েছেন। জেলাশাসক রিংকু লাথের গ্রামের অধিবাসীদের সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার প্রশংসা করে বলেছেন, গোটা রাজ্য ও দেশের উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার যাত্রাপথে এই গ্রাম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও প্রেরণা। তিনি রাজ্যের সব প্রান্তের মানুষকে এই গ্রামে ঘুরে যেতেআহ্বান জানিয়েছেন।