রাহুল গান্ধী। — ফাইল চিত্র।
একটা সংখ্যা। ‘১৬’। রাহুল গান্ধী কাগজে ‘১৬’ লিখে লোকসভায় দেখালেন। তার পরে বললেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আচমকা ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ কার্যকর করার নামে কেন আসন পুনর্বিন্যাস করতে চাইছেন, সেই প্রশ্ন লুকিয়ে রয়েছে এই ‘১৬’ সংখ্যাটির মধ্যে।
কী এই ১৬-র রহস্য— ভাঙেননি রাহুল। তাঁর অভিযোগ, ‘জাদুকর ধরা পড়ে গিয়েছেন’। ‘আতঙ্কিত’ মোদী এখন ‘দেশের নির্বাচনী মানচিত্র’ বদলে দিতে চাইছেন। সেই কারণেই তিনি বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল সংবিধানে লোকসভার আসনসংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মহিলাদের সংরক্ষণের কথা বলছেন। কারণ তাঁকে মহিলাদের উদ্দেশে সদর্থক বার্তা দিতেই হত। কিন্তু ১৬ এপ্রিলের ‘১৬’ সংখ্যার মধ্যেই আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে।
১৬ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও ব্যাখ্যা না দিয়ে রাহুল লোকসভায় বলেছেন, কেউ বিষয়টি বুঝতে পারলে তাঁকে যেন মেসেজ করেন। পরে কংগ্রেসে রাহুলের আস্থাভাজন নেতারা দাবি করেছেন, আমেরিকার যৌন অপরাধী ধনকুবের জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত ১৬টি ফাইল উধাও হয়ে গিয়েছে। সেই ফাইলে ভারত সম্পর্কে অনেক তথ্য ছিল। এই ফাইল কাজে লাগিয়ে আমেরিকা মোদী সরকারের উপরে চাপ তৈরি করছে। তার থেকে নজর ঘোরাতে মোদী এখন মহিলাদের সংরক্ষণ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। রাহুল সে দিকেই ইঙ্গিত করছেন। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার সঞ্জয় রাউত বলেন, ‘‘রাহুল গান্ধী লোকসভায় ১৬ সংখ্যার ধাঁধা রেখে গিয়েছিলেন। আমেরিকার বিচার দফতরের ওয়েবসাইট থেকে ১৬টি এপস্টিন ফাইল উধাও হয়ে গিয়েছে। ওই ফাইলেই অনিল অম্বানীর সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ, মোদীর আমেরিকা সফরের তথ্য ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই এপস্টিন ফাইল ও আদানির বিরুদ্ধে আমেরিকায় মামলা কাজে লাগিয়ে মোদীকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতেচাপ দিচ্ছেন।’’
এর আগে বাজেট অধিবেশনে রাহুল এই অভিযোগ তুলেছিলেন। আজও তিনি সেই দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ভারতের সঙ্গে আমেরিকার আচমকা বাণিজ্য চুক্তি হয়ে গেল! তাঁর অভিযোগ, ‘‘সবাই জাদুকরের সঙ্গে শিল্পপতির সম্পর্কের কথা জানেন। একটা বিরাট শক্তি রয়েছে, যারা প্রকাশ্যে আসে না। কিন্তু তারা জাদুকরের পুরো ইতিহাস জানে, তাঁর রাজনীতিতে আসা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত। সেই শক্তি এখন সেই সব তথ্য কাজে লাগাচ্ছে। সংসদের গত অধিবেশন ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছে। কারণ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার কথা নয়, প্রধানমন্ত্রী তা সই করে ফেলেছেন। আপস না করলে তিনি এই কাজ করতেন না।’’ রাহুল বলেন, ‘‘বালাকোট, সিঁদুর, নোট বাতিলের জাদুকর ধরা পড়ে গিয়েছেন।’’
শাসক শিবির ‘জাদুকর’ শব্দ নিয়ে আপত্তি তুলেছে। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা রাহুলকে বার বার বাধা দিয়েছেন। মন্ত্রীদের জাদুকর বলা ‘অসংসদীয়’ বলে সেই শব্দ সংসদের নথি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। রাহুল পরে ফের এক্স হ্যান্ডলে একই অভিযোগ তুলেছেন। তবে জাদুকরের প্রসঙ্গে আসতে গিয়ে তিনি তাঁর ছোটবেলায় জাদু দেখার গল্প বলায় গোটা শাসক শিবির কটাক্ষ করেছে। অমিত শাহ বলেছেন, সংসদে বক্তৃতা করার কৌশল রাহুল শিখতে পারেন তাঁর বোন প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরার থেকে। রাজনাথ সিংহ, কিরেন রিজিজুসংসদে নালিশ করেছেন, মানুষের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। দেশের মানুষ থেকে সেনাবাহিনীকে অপমান করছেন। রাহুল পাল্টা বলেছেন, বিজেপি বা মোদী সরকার দেশের মানুষ নয়। সেনাবাহিনীও নয়। তারা ভীরুর মতো সেনাবাহিনীর পিছনে লুকোয়। আসন পুনর্বিন্যাস করতে চেয়ে তারা মহিলাদের সংরক্ষণের পিছনে লুকোতে চাইছে। কেন্দ্রের বিলের সঙ্গে মহিলাদের সংরক্ষণের কোনও সম্পর্ক নেই। সেটা পুরোপুরি আসন পুনর্বিন্যাস বিল। আসন পুনর্বিন্যাস করে, নিজেদের ইচ্ছেমতো লোকসভা কেন্দ্রের সীমানা নির্ধারণ করে ভোটে জিততে চাইছে মোদী সরকার। অসমে তারা একই কাজ করেছে। এ বার গোটা দেশেও করছে।
লোকসভায় শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি ভোটাভুটিতে হেরে যাওয়ায় গোটা শাসক শিবির রাহুলের দল কংগ্রেস তথা বিরোধী শিবিরের বিরুদ্ধে মহিলাদের সংরক্ষণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। রাহুল লোকসভা থেকে বেরিয়েও বলেছেন, এই বিলের সঙ্গে মহিলাদের সংরক্ষণের কোনও সম্পর্ক ছিল না। মোদী সরকার নিজেদের ইচ্ছেমতো আসন পুনর্বিন্যাস না করে যদি মহিলাদের সংরক্ষণ দিতে চায়, সে ক্ষেত্রে গোটা বিরোধী শিবির পাশে রয়েছে। বস্তুত, মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের আইনটি সব বিরোধীর সমর্থনে ২০২৩ সালেই সংসদে পাশ হয়ে গিয়েছিল।