(বাঁ দিকে) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ভারতের পণ্যের উপরে শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করে দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে একটি ‘বাণিজ্যচুক্তি’র কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এই পোস্ট বেশ কিছু প্রশ্নও তুলে দিয়েছে, যেগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রথম ধোঁয়াশা ‘বাণিজ্যচুক্তি’ ঘিরে। সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ফোনে কথা হয় ট্রাম্পের। তার পরেই সমাজমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁরা উভয়েই একটি ‘বাণিজ্যচুক্তি’তে সম্মত হয়েছেন। এই বাণিজ্যচুক্তি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে দাবি করেন তিনি। এখানেই প্রশ্ন, তিনি কি দু’দেশের মধ্যে বৃহত্তর বাণিজ্যচুক্তি (মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বা এফটিএ)-র কথা বোঝাতে চাইলেন? না কি এটি শুধুই শুল্ক কমানো সংক্রান্ত একটি বাণিজ্যিক চুক্তি? ট্রাম্পের পোস্টে এর কোনও ব্যাখ্যা নেই। প্রধানমন্ত্রীও ট্রাম্পকে ধন্যবাদজ্ঞাপনের সময়ে পোস্টে এ বিষয়ে কোনও আলোকপাত করেননি। ফলে এটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে।
বাণিজ্যচুক্তির ধোঁয়াশা!
মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে গত এক বছর ধরে আলোচনা চলছে ভারত এবং আমেরিকার। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মোদীর ওয়াশিংটন সফরের পর থেকে দু’দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। শুল্ক ঘিরে জটিলতার মাঝে তা থমকেও ছিল। পরে আবার তা শুরু হয়। এখনও পর্যন্ত বেশ কয়েক দফায় দু’দেশের মধ্যে তা নিয়ে বৈঠক হয়েছে। এরই মধ্যে আচমকা ট্রাম্প চুক্তির কথা ঘোষণা করায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহেই ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির রূপরেখা প্রকাশিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তেমন কিছুই হয়নি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, শুল্ক কমানোর পরিবর্তে ভারত কিছু মার্কিন পণ্য আরও বেশি করে কিনবে। ভারতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার যে শুল্ক সংক্রান্ত এবং অন্য (বাণিজ্যিক) প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলিও কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনতে উদ্যোগী হবে দিল্লি। কোন কোন ক্ষেত্রে শুল্ক বা অন্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা ভারত শূন্যে নামিয়ে আনবে, তা ট্রাম্পের পোস্টে স্পষ্ট নয়। যেমনটা স্পষ্ট নয় মোদীর পোস্টেও। এর আগে জানা গিয়েছিল, দুগ্ধ এবং কিছু কৃষিজ ক্ষেত্রে আমেরিকার দাবি নিয়ে আপত্তি রয়েছে ভারতের। এখন সেগুলি নিয়ে ভারতের কী অবস্থান, সেই উত্তরও অজানা।
শুল্ক ছাড়ে মিলবে কি সুবিধা?
‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, ভারতের উপরে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ‘জরিমানা’ বাবদ ভারতের উপরে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো ছিল। সেটির কী হবে, তা প্রাথমিক ভাবে ট্রাম্পের পোস্টে স্পষ্ট ছিল না। পরে হোয়াইট হাউস সূত্রে রয়টার্স জানায়, জরিমানা বাবদ ওই শুল্কটিও প্রত্যাহার করছে আমেরিকা। ফলে এখন আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর ১৮ শতাংশ শুল্ক ধার্য হবে।
ভারতের উপর নতুন মার্কিন শুল্কের হার প্রতিবেশী দেশগুলি এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় কম। কিন্তু তাতে কি আদৌ সুবিধা হবে ভারতের? কারণ, ভারতের সকল প্রতিবেশী দেশ এবং এশিয়ায় কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আমেরিকা পণ্য রফতানিতে বিশেষ ‘ছাড়’ পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, উন্নত দেশগুলি উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলির কিছু পণ্য আমদানির উপর শুল্কে ছাড় দেয়। এটিকে বলা হয় ‘জেনারালাইজ় সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স’ (জিএসপি)। আমেরিকার বাজারে ভারতের প্রতিবেশী এবং এশিয়ার কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই ‘জিএসপি’-র আওতায় এমনিতেই প্রায় পাঁচ শতাংশ ছাড় পায়। অতীতে ভারতও এই ছাড় পেত। কিন্তু ২০১৯ সালের জুনে ট্রাম্প সরকারের প্রথম মেয়াদে ভারতের উপর থেকে এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ?
ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দিতে রাজি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এর পরিবর্তে আমেরিকা থেকে আরও বেশি করে তেল কিনবে ভারত। পরবর্তী সময়ে ভেনেজ়ুয়েলা থেকেও তেল কিনতে রাজি হয়েছে ভারত। কিন্তু ট্রাম্পের এমন দাবির পরেও প্রধানমন্ত্রী মোদীর পোস্টে এর কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত বিদেশ মন্ত্রকের কোনও প্রতিক্রিয়াও আসেনি। অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন যখন ভারতের উপর জরিমানা বাবদ শুল্ক চাপিয়েছিল, দিল্লি তার জবাব দিয়েছিল। আমেরিকার ওই শুল্ককে অন্যায্য এবং অযৌক্তিক বলে ব্যাখ্যা করেছিল দিল্লি। সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল, যেখান থেকে বেশি সুবিধা মিলবে, নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও সেখান থেকেই তেল কিনবে ভারত। কিন্তু ট্রাম্পের দাবির পরে প্রশ্ন উঠছে, তা হলে কি রাশিয়া থেকে তেল কেনা পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করে দিচ্ছে ভারত? এই প্রশ্নের উত্তরও এখনও অধরাই রয়েছে।