Pahalgam Terror Attack

‘জায়গাটা খুবই সুন্দর, কিন্তু ভয়টাও আসল’

মন্দার সূত্রপাত গত বছর ২২ এপ্রিল। বৈসরন উপত্যকায় জঙ্গি হামলায় নিহত হন ২৬ জন। ব্যাপক হারে হোটেল বুকিং বাতিল হয়, দর্শনীয় স্থানগুলিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি তখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল, তবে শরতের পর্যটন মরসুমে আস্তে আস্তে বাড়ছিল পর্যটকদের সংখ্যা।

সাবির ইবন ইউসুফ
শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০১
বৈসরন উপত্যকা।

বৈসরন উপত্যকা। — ফাইল চিত্র।

শ্বেতশুভ্র হিমালয়ের মাঝে ঘন সবুজ পাইনে ঘেরা দিগন্ত-বিস্তৃত তৃণভূমি। এরই টানে সারা বছর ভিড় জমাতেন লক্ষ লক্ষ পর্যটক। কিন্তু সেই বৈসরন উপত্যকায় এখন এক অস্বস্তিকর নীরবতা। কয়েক বছর আগেও যে পরিমাণ পর্যটকদের ভিড় হত এখানে, এ বছর তা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে। গত বছর এপ্রিলে বৈসরনে জঙ্গি হামলা এবং নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লার সামনে বিস্ফোরণ— এই জোড়া বিভীষিকা পর্যটকদের এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ফলে তাঁরা ভ্রমণের উৎসাহ হারাচ্ছেন, এমনই মনে করছেন পহেলগামের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। যে সামান্য সংখ্যক পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে, তাঁরাও সকাল সকাল দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে সন্ধের মধ্যেই ফিরে যাচ্ছেন শ্রীনগরে। এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী, ঘোড়া চালকদের দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

এই মন্দার সূত্রপাত গত বছর ২২ এপ্রিল। বৈসরন উপত্যকায় জঙ্গি হামলায় নিহত হন ২৬ জন। ব্যাপক হারে হোটেল বুকিং বাতিল হয়, দর্শনীয় স্থানগুলিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি তখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল, তবে শরতের পর্যটন মরসুমে আস্তে আস্তে বাড়ছিল পর্যটকদের সংখ্যা। কিন্তু কয়েক মাস পরে আবার জোর ধাক্কা! ১০ নভেম্বর দিল্লির লাল কেল্লার সামনে গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনায় কাশ্মীরের যোগসূত্র প্রকাশ্যে আসতেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়ে যায়। বন্ধ করে দেওয়া হয় শীতকালীন বুকিং। ব্যস আর কী! পহেলগামের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গাড়ি গিজগিজ করত। এখন সেই ট্যাক্সিগুলি শুধুই ধুলোয় ঢাকা। টাট্টু ঘোড়া চালক, স্থানীয় গাইডদের রুজিরুটি পর্যটকদের উপরে নির্ভরশীল। তাঁরা এখন শুধু খালি বেঞ্চে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

পহেলগামের স্থানীয় এক হোটেল মালিক, বছর বাহান্নর মহম্মদ ইয়াসিন বলেন, “ভেবেছিলাম গত বছর বৈসরনে হামলার পর সবচেয়ে খারাপ সময় কেটে গেছে। কিন্তু লাল কেল্লার ঘটনার পরে শীতকালের বুকিং বাতিল হয়ে যায়। এখন মনে হচ্ছে সব কিছু আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, ‘‘পর্যটকেরা সকালের দিকেই ঘুরতে আসছেন, বেশির ভাগই দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের বাসিন্দা। তাঁরা লিডার নদী, বেতাব উপত্যকা ঘুরে, ছবি তুলে সূর্য ডোবার আগেই ফিরে যাচ্ছেন। কেউ পহেলগামে রাত্রিবাস করছেন না।” প্রশাসন জায়গায় জায়গায় চেক পয়েন্ট, সিসি ক্যামেরা, টহলদারির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও সন্ত্রাসবাদী হামলার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থেকেই যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গত শনিবার লখনউ থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে পহেলগামে পৌঁছন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অমিত শর্মা। তাঁর কথায়, “৬ মাস আগে ৩ রাতের জন্য বুকিং করেছিলাম। কিন্তু লাল কেল্লায় বিস্ফোরণের ঘটনার পরে সেই বুকিং বাতিল করতে হয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘জায়গাটা খুবই সুন্দর, কিন্তু ভয়টাও আসল। শ্রীনগর থেকে গাড়ি চালিয়ে আসা সম্ভব, তাই শুধুমাত্র দিনের বেলা বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সন্তানদের পাহাড় দেখার আনন্দ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সন্ধে ৬টার মধ্যে ফিরে যাওয়াই নিরাপদ।’’ আরও এক পর্যটক, চণ্ডীগড়ের রাজেশ কুমার বন্ধুদের সঙ্গে লিডার নদীর ছবি তুলতে তুলতে বললেন, ‘‘আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের পর্যটক, অল্প অল্প করে পয়সা জমিয়েছি বেড়ানোর জন্য। আমরা তাও আসছি, বিদেশি পর্যটকেরা তো একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছেন।”

পহেলগাম ঘোড়া সমিতির মালিক ইরফান লোন বললেন, ‘‘কেউই অন্ধকারে এখানে থাকতে চাইছেন না। সকালে এসে সন্ধের মধ্যেই ফিরে যাচ্ছেন। এই পর্যটকেরা শুধু এক কাপ কাওয়া খাচ্ছেন, আর কিছু ছবি তুলেই সময় কাটাচ্ছেন। রাতে থাকার হোটেল বা খাবারের খরচ, জিনিসপত্র কেনা বা এ দিক ও দিক যাওয়া— সব কিছুই বন্ধ। তা হলে আর আমাদের রোজগার হবে কী করে!”

আরও পড়ুন