গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
“তুমি যা পরো, তাই-ই মানায়” কিংবা “তোমাকে কি দারুণ মানিয়েছে এই পোশাকে”— এই ধরনের কথা দৈনন্দিন জীবনে অহরহ শোনা যায়। ‘মানিয়েছে’ শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে ফ্যাশন দুনিয়ার এক লব্জ, “ক্যারি করতে পারছেন তো”!
ফ্যাশন নিয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখতে বসে শব্দের খেলায় পেয়েছে আমাকে। মানে ফ্যাশন আবহে ব্যবহৃত নানা শব্দসন্ধানে শব্দ জব্দেরই নেশা ধরেছে। যে কোনও ভাষাতেই শব্দের নানা ধরনের অর্থ হতে পারে। ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, মানে ধাতু, প্রত্যয়ের নিরিখে অর্থ। আবার আভিধানিক অর্থ, ব্যবহারিক অর্থ। মজা হল, অনেক সময় দেখা যায়, কোনও একটা শব্দ বা শব্ধবন্ধ নিরন্তর ব্যবহারের ফলে, সামাজিক, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থেরও কিঞ্চিৎ পরিবর্তন ঘটে।
ফ্যাশনের শব্দকোষে বহু শব্দবন্ধ রয়েছে, যার বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে নির্দিষ্ট ব্যক্তির স্টাইল স্টেটমেন্ট। আমাদের রোজকার জীবনে, বন্ধুমহলের আড্ডায়, সিনেমা, নাটকের আলোচনায়, র্যাম্প শোয়ের ভিড়ে একটা লব্জ ঘুরে ফিরে কানে আসে, “ক্যারি করতে পারা”। “কি দারুণ ড্রেসটা পরেছ! তোমাকেই মানায়,” কথায় বক্তার বলার উদ্দেশ্য, “তোমার ক্যারি করার ক্ষমতা ফাটাফাটি’’। যদিও আভিধানিক অর্থ অনুযায়ী এক বিশেষ ধরনের পোশাককেও বোঝানো হয় এই লব্জের মাধ্যমে। ফ্যাশনের দুনিয়ায় এই লব্জের ব্যবহারিক অর্থ ধরতে গেলে বুঝতে হবে, কোনও একটা পোশাকে কে কত বেশি স্বচ্ছন্দ, সাবলীল, তাঁর চলন, বলন, স্টাইলিং, পোশাক নির্বাচন, উপস্থাপনা— সব কিছু দিয়ে তিনি কতটা তাঁর পরিহিত বসনের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারছেন। তাকেই আমরা সাধারণ মানুষের ভাষায় বলে থাকি “কি দারুণ মানিয়েছে!”
আপডেটেড থাকাটাও একজন ফ্যাশন সচেতন মানুষ হিসেবে দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। নিজস্ব চিত্র
এ তো গেল যিনি পোশাক পরেছেন, তাঁর দায়িত্বের দিক। কিন্তু গল্পের আরও একটা দিক আছে বইকি। পোশাকের ফ্যাব্রিক বা কাপড়, রং, কাট, স্টাইল, ফিট। শেষেরটি তো অতি জরুরি, সঠিক ভাবে বলতে গেলে সবগুলোই জরুরি। বলা ভাল, এরা যত একে অপরের সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকতে পারবে, সেই ব্যক্তির বহন-ক্ষমতা তত পাকাপোক্ত হবে, নিশ্চিত হবে তার জয়গান। কিন্তু এখানেই শেষকথা নয়। ফ্যাশনের বা সাজনীতির তো আবার ব্যাকরণ প্রকরণ আছে। কোন পোশাকে কী গয়না, গলায় ভারি গয়না তো কানে হালকা দুল বা উল্টোটা। সলিড কালার, কালার ব্লকিং, চেক-স্ট্রাইপে যুদ্ধ না সন্ধি, ক্যাজ়ুয়াল না ড্রেসি অথবা ফরমাল— এমন একুশে আইনের দেশ ফ্যাশন সাম্রাজ্য। তার পর তো আছে জুতো, ব্যাগের হাজারো ফিরিস্তি। এই ব্যাকরণেরও আবার নড়চড় হয়। সেই ব্যাপারে আপডেটেড থাকাটাও একজন ফ্যাশন সচেতন মানুষ হিসেবে দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ক্লাসের ফার্স্ট গার্লের মতো এই সব বিধিগত নিয়ম মেনে চললে আপনার সিলেবাস সহজ, ডিস্টিঙ্কশন গ্যারান্টিড। বহন-ক্ষমতার কেরামতি তখনই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি, যখন আপনি আপনার ভাল লাগা, পছন্দ এবং সাহস নিয়ে ঝাঁপ দেবেন কেতাদুরস্ত সাম্রাজ্যে। ব্যাকরণকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তা বিহিতও নয়। ব্যাকরণের অনুশাসন ধরে রাখে মূল বিষয়ের কাঠামকে। কিন্তু ক্রিয়েটিভ মনের বেহিসেবি, দামালপনায় আঁটোসাঁটো দড়াদড়ি তো দমবন্ধেরই শামিল। আমার যা ভাল লাগে, যেমন ভাল লাগে, তা পরব না? ‘চলো নিয়ম মতে’ না-ই বা হলাম। ‘নতুন যৌবনেরই দূত’ হতে বাধা কোথায়? হ্যাঁ, নান্দনিক বোধের সঙ্গে সমঝোতা নৈব নৈব চ। আর চাই একটু সাহস। নিয়মের রাজত্বে নিয়মের বেড়া ভাঙতে চাইলে সেটা তো লাগবেই। এ আর নতুন কথা কি!
এই প্রসঙ্গে মুম্বইয়ের বারো মার্কেটের শ্রীলা চট্টোপাধ্যায়ের কথা না বললেই নয়। বারো মার্কেটের কর্ণধার শ্রীলার ফ্যাশনবোধ তাঁর সাজপোশাক, সারা ভারত জুড়ে এগজ়িবিশন কিউরেশন, উপস্থাপনা— সব কিছুতেই ঝলমলিয়ে বিরাজমান। শ্রীলা জানান, “আমি ভালোবাসি হ্যান্ডলুম, জমজমাট রং আর ইলাবরেট গয়না। হ্যান্ডমেড হলে আরও ভাল। এক বার সাজপোশাক কমপ্লিট হয়ে গেলে কী পরেছি ভুলে যেতে চাই, জাস্ট এনজয় লিভিং ইন ইট।’’
ওঁর মতে “এভরিথিং ক্যান বি বোথ ক্যাজ়ুয়াল অ্যান্ড ড্রেসি। তা নির্ভর করবে আমি কেমন ভাবে পরছি, তার ওপর। গোয়ার ‘চিউ’ ব্র্যান্ড আমার খুব প্রিয়। এখানে যে পোশাকগুলো পরেছি, সবই ওদের। পোশাকের কাট একটু জটিল হলেও 'ফল' খুব সুন্দর। আমার পছন্দ। ইক্কত জ্যাকেট রিভার্সিবল। চেট্টিনাড় চেকের ড্রেস সহজ, সরল। আর সবগুলোই বাড়িতে কাচা যায়। আর কী চাই!”
এই যে পোশাকের কাটের জটিলতা, হাতে তৈরি গয়নার প্রকাশের বাড়াবাড়ি রকমের ব্যাকুলতা, রঙের রায়ট, সব কিছুকে সাদরে, অবলীলায় আলিঙ্গন করেছেন শ্রীলা। তাই আমাদের এত ভালোলাগা, মুগ্ধতা।
হ্যাঁ, মানছি, সামান্য ‘বহন’-ক্ষমতা দরকার।
(ছবি সৌজন্য: শ্রীলা চট্টোপাধ্যায়, বারো মার্কেট পপ আপ এগজ়িবিশন, পোশাক: চিউ, গোয়া, গয়না: রেড বাস ডিজ়াইনস, মুম্বই, মডেল: শ্রীলা চট্টোপাধ্যায়)