Dhaniakhali Jacket

‘ব্যাকরণ মানি না’ বলে চেনা ধনেখালি শাড়ির ভোলবদল! জ্যাকেট থেকে ওয়েস্টকোটে সাবেক নকশা

নকশাপাড়। ডুরে কিংবা চেক। একরঙাও মন্দ নয়। বেশ খাপি, একটু কড়কড়ে মেজাজের। আজকের দুনিয়ায় সবাই যখন হালকা স্রোতে গা ভাসাতে চাইছে, ফুরফুরে মেজাজই যাদের পছন্দ, সেখানে দিদিমণি স্টাইলের ধনেখালি হালে পানি পাবে কী করে? কিন্তু যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইব কত আর বলে কান্নাকাটি করলে তো চলবে না! আমাদের সমৃদ্ধ সম্ভার রক্ষার দায়িত্ব তো আমাদেরই। দশঘরা ধনেখালির উত্তরণ ও বিস্তারের গল্প শোনালেন শর্মিলা বসুঠাকুর।

Advertisement
শর্মিলা বসুঠাকুর
শর্মিলা বসুঠাকুর
শেষ আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৬
ধনেখালি শাড়ির অচেনা অভিযান।

ধনেখালি শাড়ির অচেনা অভিযান। — নিজস্ব চিত্র।

আঁচলে ধানছড়ি বা ধানের শিষের একটা সরু লাইন। তাই দিয়েই টাঙ্গাইল আর ধনেখালি শাড়ির তফাত করতে শিখেছিলাম। সে আমার শাড়িবেলার কথা। যে সময়ে ডুরে বা চেক তাঁতের শাড়ি, রুবিয়া ভয়েলের ব্লাউজ়, খোঁপা কিংবা বিনুনি, টিপ, কাজল আর হালকা গয়নায় আটপৌরে বাঙালি সাজেও গ্ল্যামারের হাতছানি। আমার চিরকালই টাঙ্গাইলের চেয়ে ধনেখালি বেশি পছন্দ ছিল, এর খাপি টেক্সচারের জন্য। সাদার উপরে বেগনি ছোট চেক আর নকশা পাড়ের ধনেখালি শাড়িটি আজও আমার অন্যতম প্রিয় শাড়ি হিসেবে মনে পড়ে। মা কিনে দিয়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি।

Advertisement

হুগলি জেলার এক গ্রাম ধনিয়াখালি। সেই গ্রামের তাঁতি পাড়ায় টানাপড়েনের বুনটেই ধনেখালি শাড়ির জন্ম। আজকের দুনিয়ায় তার সেই রমরমা আর নেই, বলা ভাল, অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর বলে আক্ষেপ করার কিছু নেই! আগলে রাখার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। নিজেদের সম্ভ্রান্ত সম্ভারকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

সাদার উপরে লাল কালো চেক জ্যাকেটে।

সাদার উপরে লাল কালো চেক জ্যাকেটে। — নিজস্ব চিত্র।

আসলে ফ্যাশন তো কোনও একটা বিক্ষিপ্ত বিষয় নয়। সময়, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আরও নানা আঙ্গিক, উপাদান জড়িয়ে থাকে সাজনীতির সঙ্গে। ধনেখালির হারিয়ে যাওয়া মহিমাকে ফিরিয়ে আনার গল্প বলতে বসলে প্রথমেই বলতে হবে বিবি রাসেলের কথা। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন, দেশজ শাড়ি, বাঁ হাতে কবজি থেকে কনুইয়ের কিছুটা নীচ পর্যন্ত রং-বেরঙের চুড়ি, ডান হাতে বড় ডায়ালের ঘড়ি, নাকে ওভারসাইজ় নাকছাবি আর চোখে রিকশা আর্টের চশমা। সব মিলিয়ে সংক্ষেপে এটাই ডিজ়াইনার বিবি রাসেলের সিগনেচার স্টাইল। দেশজ ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে আছে আন্তর্জাতিক স্টাইলের উপস্থাপনা। আমার মতে, এই মিলমিশেই বিবির আসল মুন্সিয়ানা। বাংলাদেশের মেয়ে, ফ্যাশন ডিজ়াইনিং নিয়ে পড়াশোনা বিদেশের মাটিতে, অথচ নিজের সংস্কৃতির শিকড়ের প্রতি গভীর আস্থা ও সম্ভ্রমই তার আসল মূলধন। তাই গামছা নিয়ে তিনি যখন কাজ শুরু করেন, তাঁর ব্র্যান্ড ক্যারিশ্মা অচিরেই নজর কাড়ে। ফ্যাশনকে তিনি কোনও দিনই সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, উচ্চাসনে স্থান দিতে চান নি। ফ্যাশন সবার জন্য। তাঁর ডিজ়াইন, দাম সব কিছুই সেই ভাবনাকে মাথায় রেখে। এ হেন মানুষ শুধুই গামছা বা রিকশা আর্টে যে থেমে থাকবেন না, তা বলাই বাহুল্য। তাই ধনেখালি। কিন্তু দশঘরার এই ধনেখালির গল্পে ঢুকতে গেলে ফিরে যেতে হবে সত্তরের দশকে। সাহিত্যিক শঙ্করের গল্প নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘সীমাবদ্ধ’ মনে আছে? মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন বরুণ চন্দ, শর্মিলা ঠাকুর। আর বরুণ চন্দের স্ত্রীর ভূমিকায় শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় ও উপস্থিতিতে নজর কেড়েছিলেন পারমিতা। নিউ মার্কেটে শপিং, পার্ক স্ট্রিটের পার্লারে কেতাবি চুল বাঁধা, স্বামীর কর্পোরেট ইঁদুরদৌড়ের কিঞ্চিৎ খোঁজ খবর রাখা— এই সব নিয়ে আরামে আয়াসে দিন কাটানো আদুরে, আহ্লাদি স্ত্রী। অনবদ্য! সেই পারমিতাই দশঘরার পারমিতা বিশ্বাস। ধনেখালি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে দশঘরা গ্রাম। পারমিতার বাপ-ঠাকুরদার ভিটে। দুর্গা দালান, মন্দির, পুজোর প্রস্তুতির গল্প করতে গিয়ে পারমিতা বলেন, “পুজো মানেই আমার কাছে নতুন শাড়ির গন্ধ। আর পুজোর শাড়ি মানেই ধনেখালি। ছোটবেলা থেকে এটাই দেখে এসেছি। মা, ঠাকুরমাদেরও এই শাড়ি পরতে দেখেছি। আমিও তাই। পুজোতে উপহার পাওয়া, দেওয়া, সবই ধনেখালি নির্ভর। পরবর্তী কালে কলেজে পড়াতে গিয়েও সেই ধনেখালিই ভরসা।’’

কালো-সাদা চেক ওয়েস্ট কোটের সঙ্গে প্যান্ট।

কালো-সাদা চেক ওয়েস্ট কোটের সঙ্গে প্যান্ট। — নিজস্ব চিত্র।

পারামিতা আর বিবির দেখা হয় এসইডব্লিউএ (সেল্‌ফ এমপ্লয়েড উইমেন’স অ্যাসোসিয়েশন)-র প্রোগ্রামে, দু’জনের আলাপ আলোচনায় জন্ম নেয় দশঘরা ধনেখালি। ধনেখালি তাঁতশিল্পকে নব কলেবরে জাগিয়ে তোলা আর সেই সঙ্গে নারী উন্নয়নের সুযোগ ও জয়গান, এই দুই উদ্দেশ্য সাধনে দুই কৃতী নারীর হাত ধরে দশঘরা ধনেখালির মঞ্চ প্রবেশ। সঙ্গে অবশ্যই স্মরণীয় আর একটি নাম, ক্রাফটস কাউন্সিলের রুবি পালচৌধুরী।

মাছ বুনটের ওয়েস্ট কোট পরেছেন পারমিতা তসর শাড়ির সঙ্গে।

মাছ বুনটের ওয়েস্ট কোট পরেছেন পারমিতা তসর শাড়ির সঙ্গে। — নিজস্ব চিত্র।

সাদা লালে মাছের মোটিফ বোনা কাপড়কে বিবি বলেন, ‘‘বাঙালির ভাত মাছের কাপড়।” মায়ের প্রিয় ধনেখালি শাড়িকে কী ভাবে নতুন বিন্যাসে উপস্থাপিত করা যায়, সেই অভিপ্রায়েই এই শাড়ির ভোলবদল। সে বদল বুনটে নয়, জমির টেক্সচারে নয়, কাট অ্যান্ড স্টাইলে। হ্যাঁ, আগের ধনেখালি শাড়ির খাপি, একগুঁয়ে মেজাজকে কিছুটা নরম করেছেন বিবি, ব্যবহারের সুবিধের কথা মাথায় রেখে। সেই একই মাছের মোটিফ, দিদিমার শাড়ির আঙিনা ছেড়ে ভেসে বেড়াল আজকের প্রজন্মের আধুনিকার কাফতান, হুডি, ড্রেস এবং ওয়েস্ট কোট বা জ্যাকেটের নতুন পরিসরে। ‘এলেম নতুন দেশে’ বলে মাছ, ডুরে, চেকের দল আনন্দে মেতে উঠল। প্রাণ ফিরে পেল আমাদের ধনেখালি।

বিবি, পারমিতা, দু’জনেরই প্রিয় মাছ বুনটের ওয়েস্ট কোট পরেছেন পারমিতা তসর শাড়ির সঙ্গে। এই একই জ্যাকেট শাড়ি ছাড়াও ট্রাউজ়ার্স, লং ড্রেসের সঙ্গেও টিম আপ করা যেতে পারে।

কালো-সাদা চেক ওয়েস্ট কোটের সঙ্গে প্যান্ট, ড্রামাটিক নেকপিস।

সাদার উপরে লাল কালো চেক জ্যাকেটের সঙ্গে গ্রামের হাট থেকে কেনা চাদর দিয়ে বানানো লাল প্যান্ট।

তাই তো বলি, ফ্যাশনের যেমন ব্যাকরণ আছে, আবার তার ফাঁক দিয়ে কল্পনার পাখা মেলার সুযোগও আছে।

পছন্দ এবং মুন্সিয়ানা আপনার।

(মডেল: অনুশীলা ব্রহ্মচারী, ইন্দ্রাণী বন্দ্যপাধ্যায় এবং পারমিতা বিশ্বাস,ছবি: দেবর্ষি সরকার, সাজশিল্পী: শর্মিলা বসুঠাকুর, রূপটান: রাহুল নন্দী)

Advertisement
আরও পড়ুন