Suti Handloom Gamchha Saree

ক্যানভাসের শিল্প থেকে রং ছড়াল গামছায়, জন্ম নিল নতুন পোশাক! বাংলার তাঁতের বিশ্বজয়ের কাহিনি

মোনালি গামছার রংচঙে চেক, স্ট্রাইপ ঘিরে শুরু করেন ডিজ়াইন করা। চষে ফেললেন ফুলিয়া, শান্তিপুর, ধনেখালি, মুর্শিদাবাদ, বীরভুম এবং অন্যান্য জেলার গ্রাম।

Advertisement
শর্মিলা বসুঠাকুর
শর্মিলা বসুঠাকুর
শেষ আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ ০৮:৫৯
The story of gamchha as a global fashion statement through the boutique Suti

গামছা যখন দিগ্বিজয়ে। — নিজস্ব চিত্র।

সম্প্রতি একটা নাটক দেখলাম, ‘যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল’। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা, সৌরভ পালোধি নির্দেশিত এই নাটকে চার বন্ধুর বেড়ে ওঠার প্রেক্ষিতে বন্ধুত্বের গল্প, পরিবর্তিত পরিস্থিতির গল্প, বদলে যাওয়ার গল্প। গল্পের নোঙর এদের ছেলেবেলা, শৈশব, কৈশোরে প্রোথিত। আজকের কলাম লিখতে গিয়ে এই নাটকের কথা মনে পড়ল। আমরা কেউই আমাদের ছেলেবেলা, আমাদের শৈশব ছেড়ে সহজে বেরিয়ে আসতে পারি না। আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা গড়ে ওঠা বয়েসের ভালোলাগা, বিশ্বাস, মনন, বোধ বড়বেলার জীবনে রেখাপাত করে। ছেলেবেলায় যা বুঝতেও পারিনি, বড়বেলার কাজে আয়না হয়ে তা সামনে দাঁড়ায়। এই প্রতিবিম্বিত ‘বড় আমি’ অতীতের ‘ছোট আমি’র গল্প বলে।

Advertisement

— নিজস্ব চিত্র

দিল্লির বাসিন্দা, ডিজ়াইনার মোনালি রায়ের যাত্রাপথের গল্প তেমনই। তাঁর বড় হওয়া কলকাতা শহরে। পড়াশোনা লেডি ব্রেবর্ন কলেজে। আর পাঁচটা বাচ্চার মতই ‘সহজ পাঠ’, ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর গল্প তার ছেলেবেলার অ্যালবাম জুড়ে। পেশা হিসেবে আর্টকেই বেছে নেন। মোনালি এবং তাঁর স্বামী রাজেশ, দু’জনেই ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট। প্রথমে কলকাতায়, পরে পাকাপাকি ভাবে দিল্লিতে শিল্পের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন দু’জনে। ক্যানভাসে রং-তুলির জাল বোনা ছাড়াও শিল্পভিত্তিক নানা ধরনের কাজ তাঁরা করে থাকেন।

— নিজস্ব চিত্র

ছেলেবেলার ভাল লাগা ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী কিংবা ‘সহজ পাঠ’ ও নন্দলাল বসুর আঁকা ঘিরে বইয়ের কাজের কথা প্রসঙ্গে মোনালি বলেন, ‘‘যত দূরে যাই, এই সব আঁকড়ে বাঁচতে চাই।’’ এদের দেখি, আর আমার বিশ্বাস দৃঢ় হয়, শিল্পকে ঘেরাটোপে বাঁধা যায় না। সে আলাপী, উদার, দখিনা বাতাসের মতো ফুরফুরে, বয়ে যাওয়া জলস্রোতের মতো সচল। তাই তো মোনালি করোনাকালে দিল্লি থেকে কলকাতায় এসে, ঘরবন্দি থাকাকালীন ছোটবেলার ভালবাসা ঝালিয়ে নেন। “গামছা আমার বরাবরই খুব প্রিয়।’’ গামছার রংচঙে চেক, স্ট্রাইপ ঘিরে শুরু করেন ডিজ়াইন করা। চষে ফেললেন ফুলিয়া, শান্তিপুর, ধনেখালি, মুর্শিদাবাদ, বীরভুম এবং অন্যান্য জেলার গ্রাম। নানা তাঁতির সঙ্গে চেনাজানা হয়, টেক্সটাইলের সঙ্গে বোঝাপড়া হয়। যোগাযোগ হয় দস্তকারি হাটের প্রতিষ্ঠাতা জয়া জেটলির সঙ্গে। তাঁদের আর্থিক অনুদানে, উৎসাহে, উদ্যোগে বড় করে ভাবতে শিখলেন মোনালি। দিল্লি ক্রাফ্‌ট কাউন্সিলের সহায়তাও অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।

শুরু হয় হ্যান্ডলুমে গামছার আদলে শাড়ি বোনা। ট্র্যাডিশনাল আর্টের কন্টেম্পোরারি উপস্থাপনা। জন্ম হয় ব্র্যান্ড ‘সুতি’র। মোনালি এবং রাজেশ তাঁদের ক্যানভাসে যে সব রঙ চড়াতেন, যে সব মোটিফ স্থান পেত তাঁদের আর্ট স্পেসে, তাই জায়গা করে নিল তাঁতের টানাপড়েনে। ক্যানভাস থেকে বয়ন শিল্পে অনায়াস গতির সঞ্চারে ‘সুতি’ সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। বন্ধুত্ব হল ফুলকারির সঙ্গে, হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টের সঙ্গে, পারস্পরিক সংলাপে গড়ে উঠল নতুন বুনন। জাপানের ডিজ়াইনার রিন জ্যাজো এই গামছা আদলের শাড়ি দিয়ে বানিয়ে ফেললেন তাঁর অভিনব কালেকশন, ‘ফোক প্যান্টস’। দিল্লির নাভা ফাউন্ডেশন ফ্যাশন র‍্যাম্পে ডিজ়াইনার রচনা ইমামের সঙ্গে কাজ করাও এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। সনাতনী শিল্পের হাত ধরে আধুনিকতার উপস্থাপনায় দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল ‘সুতি’র বিজয়বার্তা।

Advertisement
আরও পড়ুন