গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বাংলাদেশের জামদানি শাড়ির গল্প এর আগে আপনাদের বলেছি। এ বার বলব পশ্চিমবঙ্গে এই শিল্পের বেড়ে ওঠা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। ইতিহাস বাদ দিয়ে তো কোনও গল্পেরই ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ সম্ভব নয়! তাই আসুন, ছোট্ট করে ঝালিয়ে নিই জামদানির ইতিহাস। এর আগে বিশদ লিখেছি, তাই পুনরাবৃত্তি এড়াতে এ বারে সংক্ষিপ্ত আলাপ। জামদানি হল নকশার নাম, এই বুনন পদ্ধতির নাম, যার আদি নিবাস ঢাকা। ইতিহাস বলে, হাওয়ার মতো ফুরফুরে আর জলের মতো স্বচ্ছ এই শাড়ির জন্ম মোগল আমলে। জামদানি খাঁটি হ্যান্ডলুম এবং এর বুননে তাঁতের টানাপড়েনে সত্যিই মুনশিয়ানা লাগে। তাঁতে বসেই পড়েনে অর্থাৎ আড়ের দিকের বুনোটে তৃতীয় একটি সুতোয় হাতে নকশা তুলতে হয়, আগে থেকে আঁকার কোনও ব্যাপারই নেই। বেশিটাই ফ্লোরাল এবং জ্যামিতিক মোটিফ। দক্ষতা এবং সময়, দুই-ই জরুরি হাতেবোনা এই আশ্চর্য বুনন পদ্ধতিতে।
দেশভাগ পরবর্তী সময়ে বহু ছিন্নমূল হিন্দু গুণী তাঁতিদের এই বাংলায় ঠিকানা বদল এবং তাঁদের বুনন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা বহাল ছিল। আমাদের তাঁতে জামদানি নকশার বুননে গড়ে ওঠে পশ্চিমবাংলার জামদানি। নদীয়া, শান্তিপুর, ফুলিয়া, ধাত্রীগ্রাম হয়ে ওঠে এই বুননের বিশিষ্ট কেন্দ্র। টাঙ্গাইল আর জামদানি বুননের মসৃণ মিলনে জন্ম নেয় আমাদের জামদানি, ‘টাঙ্গাইল জামদানি’। সিল্কও আস্তে আস্তে তার জায়গা করে নেয় এই বুননে। পূর্ব বর্ধমানের সমুদ্রগড়, কাটোয়া বাদ যায়নি জামদানি বুননে। শুধু শাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই এই বুনন। দোপাট্টা, ড্রেস মেটিরিয়াল বোনা হচ্ছে সব ধরনের ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে। তবে এখন পাওয়ার লুমের দৌরাত্ম্যে হ্যান্ডলুম জামদানি একটু বেছে নিতে হয় বইকি।
এই ইতিহাসে যাঁর নাম না বললেই নয়, তিনি কালনার জ্যোতিষ দেবনাথ। ২০২৬ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত এই শিল্পীর মসলিন জামদানি পশ্চিমবাংলাকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সাম্রাজ্যে জায়গা করে দিয়েছে। হ্যান্ডলুমের সঙ্গে জড়িত যাঁরা, বা যাঁরা আমাদের দেশীয় কাপড়, বুনন পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে জ্যোতিষবাবু বহু বছর ধরে ঘরোয়া এক নাম। জ্ঞানী, গুণী, অমায়িক এক মানুষ।
এখন অনেকেই এই বাংলার জামদানি নিয়ে কাজ করছেন। আলাপ হল কলকাতার মেয়ে তৃণা মজুমদারের সঙ্গে। বরাবরই হ্যান্ডলুম-প্রেমী। ঈশা ফাউন্ডেশনের সেভ দ্য উইভস প্রকল্পে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন। তা ছাড়াও বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করে শুরু করেছেন নিজস্ব ব্র্যান্ড, ‘ওয়ান্ডার উইভস’। শান্তিপুর, কালনা, ফুলিয়ার গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে , গ্রামের মেয়েদের হাতের কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। জামদানি শাড়ি, দোপাট্টা, মেটিরিয়ালের আজ তাঁর ভাল কালেকশন। রইল তারই কিছু ছবি।
(পোশাক: ওয়ান্ডার উইভস, তৃণা মজুমদার।)