পাত্র ঠিক হল, তারিখও ঠিক হল। আর সাজ? সে ভাবনাচিন্তা ‘বিয়ের বয়স’ হওয়ার আগে থেকেই স্থির হয়ে রয়েছে। কেবল সময়ে সময়ে পাল্টে যেতে থাকে। কখনও টলিউড-বলিউডের নায়িকা অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন, কখনও বা সমাজমাধ্যমের নববধূ। তারই সঙ্গে সকল কনের মাঝে একটু আলাদা সাজার শখও থাকে। আইবুড়োভাত, গায়েহলুদ, বিয়ে, বৌভাত— বিয়ে মানেই অনুষ্ঠানের ভিড়। কোন দিন কী সাজবেন, সে পরিকল্পনা শুরু করে ফেলুন। আনন্দবাজার ডট কম-এর জন্য বিশেষ তিন দিনের সাজে সাজলেন অভিনেত্রী দর্শনা বণিক।
আইবুড়োভাত থেকে বিয়ে ও বৌভাত, সব অনুষ্ঠানেই অন্য রকম ভাবে সাজতে চান নতুন যুগের কনেরা। যেখানে সাবেকি ছোঁয়াও থাকবে, আবার নতুন নতুন সাজসজ্জার ছাপও থাকবে। বিয়ে মানেই সোনার গয়না ও শাড়ি। কিন্তু সে সাজেই নতুনত্ব আনার চেষ্টা করতে পারেন। সোনার বদলে যদি রুপোয় সাজেন কনে? রুপোর উপর সোনার জল করা গয়না এক দিকে যেমন সাশ্রয়ী, তেমনই সম্পদ হিসাবেও রেখে দেওয়া যায়। তায় আবার কেতাদুরস্তও বটে।
আইবুড়ো ভাতের জন্য হালকা সাজে সাজলেন দর্শনা। তবে হালকা হলেও চাকচিক্যের খামতি নেই। দীর্ঘ ৪-৫ দিনের অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে এমন ভাবে সাজতে পারেন আপনিও। দর্শনার পরনে চওড়া পাড়ের অফ হোয়াইট তাঁতের শাড়ি। তাতে বালুচরির মোটিফ বোনা। সঙ্গে আসন প্যাটার্নের ক্রস-স্টিচের ঘটিহাতা ব্লাউজ়, যাতে থাকুক সাদা লেসের কাজ। এমন এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে লাল ও চন্দন রংকে প্রাধান্য দিতে পারেন। মাথার বেণীখোঁপা নস্টালজিয়ার গল্প বলুক।
সোনার জল করা গয়নার সঙ্গে মুক্তোর ছোঁয়া নতুনত্ব আনতে পারে কনের সাজে। দর্শনার সাজ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। আইবুড়ো কনের কানে আমকল্কা ফুলকান। মাথায় তারমুক্তো দিয়ে গাঁথা কানটানা। গলায় আমকল্কা চেন লহরি, ভিক্টোরিয়ান পার্ল চোকার। হাতে গোলাপবালা, আমকল্কা আংটি এবং গিনি আংটি। শাড়িতে লতাপাতা ব্রোচ। নবরত্ন খোঁপার কাঁটা।
আমকল্কা চেন লহরি, ভিক্টোরিয়ান পার্ল চোকারের বদলে গলায় পরা যেতে পারে আমকল্কা তারমুক্তো লহরি, গোলাপ তারমুক্তো গাঁথাই চোকার। সাবেক সাজেই গ্ল্যামার আনার চেষ্টা করতে পারেন গয়না নিয়ে।
মা কিংবা ঠাকুরমা-দিদিমা তাঁদের বিয়েতে কেমন গয়না পরে সেজেছেন, তা জানতে আগ্রহী নতুন প্রজন্মের কনেরা। এখন শিকড়ে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাকৃতিক মোটিফের রুপোর গয়নায় সাজা যেতে পারে নিজের বিয়েতে। প্রজাপতি মোটিফ, গোলাপফুল নকশা, লতাপাতার নকশা, টিয়াপাখি, পদ্ম, আরও অজস্র মোটিফ ছড়িয়ে রয়েছে গয়নার জগতে।
বিয়ের সাজে শাড়ি পরায় নতুনত্ব আনা যেতে পারে। লাল জামেবর বেনারসির সঙ্গে এমব্রয়ডারি করা ব্লাউজ়। দর্শনা যেমন আটপৌরের বদলে শাড়ির আঁচল প্লিট করে কাঁধে ফেলেছেন, আপনিও সে ভাবে সাজতে পারেন। ইচ্ছে হলে পুরো আঁচল খুলেও রাখতে পারেন। শাড়িতে নানা ধরনের ব্রোচও পরতে পারেন। তা যেমন মিলিটারি কেতার চেনযুক্ত হতে পারে, আবার কোটওয়াচের মতো পকেটেও রাখা যেতে পারে।
কেবল বিয়ে নয়, পরবর্তী কালে অন্যান্য অনুষ্ঠানেও পরা যাবে এই শাড়ি ও ব্লাউজ়। এমনকি, ভেলও একই ভাবে পরে ব্যবহার করতে পারেন। দর্শনা যেমন মাথায় বর্ডার দেওয়া ভেল পরেছেন, সেটি পরে ব্যবহারের যোগ্য। সালোয়ার, আনারকলি, পালাজ়ো— সব কিছুর সঙ্গেই সেই ভেল পরবর্তীতে পরা যায়।
দর্শনার মাথায় হাতনকশার হাফ টোপা টিকলি। খোঁপায় গোলাপ-নকশা কাঁটা। কানে তিন-ফুল কানবালা। গলায় প্রজাপতি ঝালর চোকার এবং গোলাপ লহরী হার। হাতে ঝুনোচুড়ি, গোলাপবালা, লতাপাতা রত্নচূড়। কোমরে বন্ধনী। পায়ে ঠোকাই হাতনকশা করা মুক্তো বসানো লহরী ঘুঙুর।
রুপোর গয়নার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রুপোরই গাছকৌটো থাকুক হাতে। শাড়ির মতোই গয়নাকেও নানা ভাবে ব্যবহার করা যায়। মাথার টিকলি যেমন পরবর্তী কালে গলার পেন্ডেন্ট করে পরা যায়, পায়ের ঘুঙুরও খোঁপায় স্থান পেতে পারে। মাথায় যদি বাগান-খোঁপা করেন, তার আভরণটি পরে গলায় চোকার করেও পরতে পারেন।
পুরনো দিনের নকশার গয়নায় সেজেছেন দর্শনা। বিয়ের সাজে তাই সাবেক ও নতুন সাজের ছোঁয়া একই সঙ্গে ধরা পড়েছে। বিয়ের দিনে রুপোর সাজ একাধারে ছকভাঙা এবং অভিজাত হয়ে উঠতে পারে।
বৌভাতের সাজে সম্পূর্ণ ছকভাঙা সাজে সেজেছেন দর্শনা। কনে মানেই যেখানে উজ্জ্বল রং, সেখানে হাতে বোনা কালো বেনারসি পরেছেন অভিনেত্রী। শাড়ি জুড়ে ফ্লুরোসেন্ট সবুজের মিনাকারির কাজ। ব্লাউজ়ের বদলে কালো ফুল-হাতা বডিস্যুট পরানো হয়েছে তাঁকে। যাতে দেহের আকার সুন্দর দেখায়। দর্শনা এখানে লাল ছোট্ট টিপ পরেছেন। আপনি চাইলে কালো বা মেরুন টিপ দিয়েও সাজ সম্পূর্ণ করতে পারেন।
আপনিও এমনই নজরকাড়া সাজে সাজতে পারেন নিজের বিয়েতে। রং দিয়েই বাকি কনেদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে উঠতে পারেন। পানপাতা লহরী হার পরানো হয়েছে দর্শনাকে। কানে পানপাতা দুল, যাতে পার্ল ড্রপ বসানো রয়েছে। হাতে গোলাপ-আংটি।
অমৃতপাক বালা, গোলাপচূড়-সহ সব হস্তাভরণ দর্শনার এক হাতেই পরানো হয়েছে। খালি থেকেছে অন্য হাত। গলার হারের থেকে যাতে নজর না সরে, সে জন্য কানে একেবারে ছোট একটি দুল পরানো হয়েছে। আঙুলে রয়েছে আংটি। এক হাতের সাজে আপনিও সাজতে পারেন। তা হলে অলঙ্কার নজর কাড়বে বেশি।
শীত ও বসন্তে বিয়ে মানেই সাজগোজের সঙ্গে আপসের প্রয়োজন নেই। ভারী শাড়ি-গয়নায় সেজে উঠতে পারেন কনে। গ্রীষ্মের মতো কষ্ট হওয়ার ভয় নেই। তাই প্রতিটি সাজে চুল বেঁধে রাখার প্রয়োজন নেই। দর্শনার মতোই চুল সম্পূর্ণ খোলা রেখে দিতে পারেন রিসেপশনে।
কালো শাড়ি ও ব্লাউজ়ের সঙ্গে মেকআপেও ছক ভাঙার চেষ্টা করতে পারেন। উজ্জ্বল রঙে চোখ না এঁকে স্মোকি আই করাতে পারেন। কালো দিয়েই রঙিন হয়ে উঠতে পারেন নিজের রিসেপশনে। এমন সাজেই নববধূর ব্যক্তিত্ব দ্যুতিময় হয়ে উঠতে পারে। সাজে ‘রাঙা’ হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না আর।
ভাবনা ও পরিকল্পনা: সুচন্দ্রা ঘটক, প্রয়োগ: সুচন্দ্রা ঘটক, তিস্তা রায় বর্মণ, ছবি: সোমনাথ রায়, রূপটান: অভিজিৎ পাল, কেশসজ্জা: অভিজিৎ পাল, গয়না: গহনে, পোশাক: পরমা, কালারোসো, অভিষেক নাইয়া, সাজশিল্পী: অনুপম চট্টোপাধ্যায়, স্থান সৌজন্য: গহনে