যৌনতা নিয়ে অকপট আলোচনার স্থান আজও নেই আধুনিক সমাজে। যৌন আলোচনা নিয়ে ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়ের’ অন্ত নেই। জনসমক্ষে যৌনতা এবং যৌনজীবন নিয়ে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন না এমন মানুষ হাতেগোনা। সমাজের ছকভাঙা সেই কতিপয় মানুষের মধ্যে একজন সীমা আনন্দ।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রকাশ্যে যৌনতা নিয়ে কথা বলতে তাঁর গলা কাঁপে না। পডকাস্ট থেকে ইউটিউব, যৌনতা ও সম্পর্ক নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা কিংবা পরামর্শ— সবেতেই স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করেন নিজের মত। যৌনতা নিয়ে হাজারো মিথ ভেঙেছেন তিনি। যৌনতার পাঠ পড়াতে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে খোলামেলা আলোচনায় বসেন লেখিকা ও যৌনশিক্ষা প্রদানকারী সীমা।
নিজের জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত নিয়েও সোজাসাপটা আলোচনা করতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। ফেসবুক, ইউটিউবে সীমার একাধিক ভিডিয়ো নিয়ে তাই নাক সিঁটকোন অনেকেই। ৬৩ বছরের সীমা যৌনতাকে মেলে ধরেছেন, তাও আবার অকপট ও সহজ ভাষায়। তাঁর ভিডিয়োগুলির কপালে সেঁটে গিয়েছে যৌনগন্ধী, রগরগে তকমাও।
কাঁধ পর্যন্ত ঢেউখেলানো কাঁচা-পাকায় মেশানো রেশমের মতো চুল। বেশির ভাগ সময়েই কপালে সাদা টিপ পরতে দেখা যায় তাঁকে। ঠোঁটে গাঢ় রঙের লিপস্টিক। এটিই তাঁর নিজস্বতা। নজরকাড়া শাড়ি পরে ভিডিয়োয় ধরা দেন বিভিন্ন লুকে। তাঁর বাচনভঙ্গি, সম্মোহনী কণ্ঠস্বর দিয়ে আটকে রাখেন দর্শককে। তাঁকে নিয়ে যাঁরা সমালোচনা করেন তাঁরাও সীমার ভিডিয়ো উপেক্ষা করতে পারেন না বলে মত সীমার অনুরাগীদের।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এসে সীমা এমন একটি বোমা ফাটিয়েছেন যা নিয়ে ইন্টারনেট উত্তাল। সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলিতে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সীমার একটি বক্তব্য। শারীরিক সম্পর্ক, সম্পর্ক, জীবন এবং মানুষের চাহিদার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতে এসে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি।
সীমা সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জানান একটি ১৫ বছর বয়সি কিশোর তাঁকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। ৬৩ বছরের সীমা যে কতটা আকর্ষণীয়া, তা বলতেও কোনও রাখঢাক করেনি সেই কিশোর। এমনকি অত্যন্ত কদর্য ভাষায় সেই কিশোর তাঁর থেকে চার গুণ বড় সীমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানান লেখিকা।
১৫ বছর বয়সি কিশোরের কথা উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে অনেক দর্শকের প্রতিক্রিয়ার সুর পাল্টে যায়। সমালোচকদের যুক্তি ছিল যে এই ধরনের আলোচনায় কোনও নাবালককে টেনে আনা অনুচিত। কারণ এখানে কৌতূহল বা সামাজিক পর্যবেক্ষণকে ছাপিয়ে দায়িত্ব, সীমানা এবং নাবালক সুরক্ষার প্রশ্ন চলে আসছে।
বহু নেটাগরিক মনে করছেন, এই ধরনের আলোচনা সমাজমাধ্যমের বিনোদন নয়, বরং উদ্বেগের কারণ। নাবালকদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলি এত হালকা ভাবে আলোচনা করা উচিত হয়নি বলে মত বেশ কিছু দর্শকের।
যদিও যৌনতাকে বয়সের গণ্ডিতে বেঁধে রাখতে নারাজ সীমা। যৌনতায় নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রসঙ্গও সীমা বার বার তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেন। কী ভাবে যৌনতা উপভোগ করা যায়, সে বিষয়ে নানা সময় খোলাখুলি নিজের মত প্রকাশ করেছেন তিনি।
লন্ডনপ্রবাসী। সমাজমাধ্যমে যৌনতা নিয়ে নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি পৌরাণিক কাহিনিবিদ এবং পেশাদার লেখিকা। ‘দ্য আর্টস অফ সিডাকশন’ নামের একটি বইও প্রকাশ হয়েছে সীমার। মহাভারত, রামায়ণ, তান্ত্রিক দর্শন, কামসূত্র এবং ভগবদ্গীতার উপরও নানা বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করে থাকেন তিনি।
তবে তাঁর বিশেষত্ব হল নর-নারীর সম্পর্ক ও যৌনতার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা। তিনি এমন এক জন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ যিনি শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এবং মানুষের চাহিদার (যা নিয়ে মানুষ প্রায়শই আলোচনা করতে লজ্জা বোধ করে) মতো বিষয়গুলি প্রকাশ্যে তুলে এনে অচলায়তন ভাঙার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
লেখিকার মতে, কামসূত্র এবং তান্ত্রিক দর্শনকে অশ্লীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার দরকার নেই, বরং চেতনা এবং শক্তি হিসাবে বোঝা উচিত। স্পষ্টবাদী হওয়ার কারণে তাঁকে লক্ষ্য করে প্রায়শই ধেয়ে আসে কটাক্ষের তির। ‘কামের দেবী’, ‘যৌনতার প্রতীক’ বলে দেগে দেওয়াও হয় বার বার।
যৌন আকাঙ্ক্ষা যে ভুল নয়, বরং আত্মপ্রেম এবং মহাজাগতিক শক্তির আর একটি রূপ, তা কুণ্ঠাহীন ভাবে প্রচার করেছেন সীমা। তাঁর মতে, ভারতীয় সংস্কৃতি যৌনতাকে কখনও অপবিত্র বা ভুল বলে মনে করেনি। এটিকে জীবনের একটি স্বাভাবিক এবং পবিত্র অংশ বলে মনে করেন সীমা নিজেও।
সীমার নিজের বৈবাহিক জীবনও খোলা বইয়ের মতো। তাঁর স্বামী অবসরপ্রাপ্ত এবং তিন সন্তান রয়েছে সীমার। গল্প বলার সময় নিজের বিবাহিত জীবন এবং বৈবাহিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।
সব ছবি: সংগৃহীত।