স্বাদের সঙ্গে আপস না করেই রোজের রান্নায় বদল আসুক। ছবি: এআই।
কী রান্না করবেন আর কী করবেন না? চার দিকে গ্যাস নিয়ে টানাপড়েনের মাঝে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। গ্যাসের সাশ্রয় করতে এখন একটু বুদ্ধি করে না চললেই নয়। বাজার থেকে যে মাছ, মাংস, শাকসব্জি আনা হয়, সেই সব নিয়ে রোজ কী বানাবেন, সেই ভাবনা অনেকের কাছেই বেশ বিরক্তির। তার উপর এখন আবার কী ভাবে গ্যাসের খরচ কম করবেন, সেই ভাবনাও মাথায় রাখতে হবে।
এমনিতে বাঙালি বেশ গুছিয়ে খেতেই পছন্দ করে। প্রথম পাতে তেতো তার পর ডাল, সব্জি, মাছ, মাংস আর সবশেষে মিষ্টিমুখ। তবে এখন এত পদ রান্না না করে, দু’একটি পদেই ভোজটা সেরে ফেলা যেতে পারে। তাই বলে স্বাদহীন, সেদ্ধ রান্না খেতে হবে, তার কোনও মানে নেই। তবে ঘরের সাপ্তাহিক মেনু থেকে এখন কিছু পদ আপাতত সরিয়ে রাখাই ভাল। সেই বুঝে বাজারের তালিকাতেও করে ফেলুন কিছু কাটছাঁট।
রবিবারে অনেক বাড়িতেই পাঁঠার মাংস রাঁধা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষিয়ে পাঁঠার মাংস রান্না করলে তার স্বাদই হয় আলাদা। তবে এখন স্বাদের সঙ্গে একটু আপস করে মুরগির লাল লাল ঝোল দিয়েই রবিবারের স্পেশ্যাল ভোজটা সারতে পারেন। মুরগির মাংস রাঁধতে এমনিতেই কম সময় লাগে। তার উপর যদি আধ ঘণ্টা আগে দই, সর্ষের তেল, হলুদ আর নুন দিয়ে মাখিয়ে রাখতে পারেন, তা হলে তো কুকার ছাড়াই ৩০ মিনিটে হয়ে যাবে রান্না।
নিরামিষের দিনে অনেক বাড়িতেই ধোঁকার ডালনা হয়। আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা ডাল বেটে, সেই ডালকে মশলা দিয়ে কষিয়ে, আকার দিয়ে, ডুবো তেলে ভেজে শেষমেষ রগরগে ঝোলে ডুবিয়ে দিতে হয়। এ রান্না যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই রাঁধতে গিয়ে গ্যাসের খরচও অনেক বেশি হয়ে যায়। তার বদলে নিরামিষের দিনে বানিয়ে ফেলুন পনিরের রসা। পনিরের রসার স্বাদ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে যদি নামানোর ঠিক আগে ঝোলে মিশিয়ে দিতে পারেন ফেটানো দই, ঘি, গরমমশলা আর কসুরি মেথি।
অনুষ্ঠানবাড়ি থেকে শুরু করে প্রতি দিনের ভোজে শুক্তো কিন্তু থাকবেই বাঙালির রোজের মেনুতে। করলা, কাঁচকলা, বেগুন, কুমড়ো, রাঙা আলু, সজনে ডাঁটার মতো রকমারি সব্জি আলাদা আলাদা করে ভেজে রাঁধুনিবাটা, আদাবাটা আর দুধ দিয়ে তৈরি শুক্তো রান্না করতে অনেকটাই সময় লাগে, গ্যাস খরচও বেশি হয়। তবে মরসুম বদলের এই সময় পাতে তো তেতো খাবার রাখতেই হবে। সে ক্ষেত্রে করলা ভাজা বা নিম-বেগুন বানিয়ে ফেলতে পারেন। স্বাস্থ্যও চাঙ্গা থাকবে, আর গ্যাসের খরচও কমবে।
মোচা রাঁধতে অনেকটাই সময় লাগে। প্রথমে ভাপানো, তার পর কষিয়ে অল্প আঁচে রান্না করা। ডালের বড়া ছাড়া আবার নিরামিষ মোচা খেতে ভাল লাগে না, তাই ডালের বড়া বানানোর কথা ভুললেও চলবে না। গ্যাস বাঁচাতে মোচার বদলে পালংশাকের ঘন্ট রেঁধে ফেলুন। সময়ও বাঁচবে আর ফাইবার-আয়রনও যাবে শরীরে।
ডাল না হলে বাঙালির খাওয়া হয় না। আর কিছু না থাকলেও ডাল, ভাত আর আলুসেদ্ধ দিয়েই তৃপ্তি করে খাওয়া হয়ে যায় অনেকের। তাই হেঁশেলে আর কিছু থাকুক না থাকুক, ডাল থাকবেই। তবে এখন নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল নয় বরং মুগ, মুসুর ডাল দিয়েই রকমারি পদ বানিয়ে ফেলতে পারেন। লাউ দিয়ে মুগ ডাল, মুসুর ডালের ভর্তা, মুসুর ডালের চচ্চড়ি, মুগমোহন ডাল— সপ্তাহের সাত দিনে মুগ, মুসুর দিয়েই বানিয়ে ফেলুন এক এক রকম ডালের পদ।
চিংড়ি মাছ রান্না করতে এমনিতে কম সময় লাগে। তবে চিংড়ি দিয়ে যখনই ভাপার মতো পদ রান্না করতে যাবেন, তখনই সময়টা অনেকটা বেশি লেগে যায়। এ ক’দিন না হয় ভাপার বদলে চিংড়ির ঝাল কিংবা বাটিচচ্চড়ি দিয়েই দুপুরের ভোজ সেরে ফেলতে পারেন।
এখন বাজার থেকে বাঁধাকপি না আনাই ভাল। এই সব্জি রান্না করতে বড্ড বেশি সময় লেগে যায়। বাঁধাকপির ঘন্টর বদলে লাউ শুক্তো, পেঁপের ডালনার মতো পদগুলি বানিয়ে ফেলতে পারেন।
বিউলির ডালের সঙ্গে আলুপোস্ত— এই জুটি পেলে অনেকেই মাছ-মাংসের পদও বাতিলের খাতায় রেখে দিতে পছন্দ করেন। তবে আলুপোস্ত, ঝিঙেপোস্ত, বেগুনপোস্ত বানাতে অনেকটাই সময় লাগে, বদলে পোস্তবাটা দিয়েই সেরে ফেলতে পারেন দুপুরের ভোজ। কাঁচা তেল, কাঁচালঙ্কা আর সামান্য নুন, ব্যাস। এমন পোস্তবাটা গরম ভাতের সঙ্গে থাকলে আর কিছুই লাগবে না।
পটলের ভিতর কখনও মাছের পুর, কখনও আবার ছানার পুর— পটলের দোলমা এমনই এক পদ, যার নাম শুনলেই জিভে জল আসে। তবে এ ক্ষেত্রে পটল আলাদা করে ভেজে, পুর বানিয়ে, তা পটলে ভরে, মশলাদার ঝোলে মেশালে তবে রান্না শেষ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা গ্যাস খরচ হয় এই রান্নাতেও। বদলে পটলের ডালনা বা চাল পটল বানিয়ে ফেলতে পারেন।
খাওয়াদাওয়ার শেষে একটু মিষ্টিমুখ তো করতেই হবে। তবে চালের পায়েস নয় বরং সিমাইয়ের পায়েস দিয়েই না হয় শেষটা হোক। সিমাই করতে দুধকে খুব বেশি ঘন করার প্রয়োজন হয় না। স্বাদ বৃদ্ধি করতে ঘিয়ে ভেজে রকমারি ড্রাইফ্রুটস দিয়ে দিন। এমন স্বাদ চেখে দেখলে কিন্তু চালের পায়েসের কথা আর মনে না-ও পড়তে পারে।