LPG Shortage in West Bengal

কালোবাজারি রুখতে রাজ্য জুড়ে পুলিশের অভিযান! বন্ধ হল আরও কিছু মা ক্যান্টিন, সংসদ চত্বরে বিক্ষোভ তৃণমূলের

দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, রান্নার গ্যাস বেআইনি ভাবে অটোয় ভরা হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের অভাবে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ২২:০১
এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। — ফাইল চিত্র।

রাজ্যে কোথায় কত গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছে, কতই বা রয়েছে ভান্ডারে, গ্রাহকেরা তবে কি অকারণেই উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, না কি কালোবাজারি চলছে— শুক্রবার কলকাতা এবং বিভিন্ন জেলার গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে ঘুরে ঘুরে এ সবই দেখল এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ (ইবি)। বৃহস্পতিবারই রাজ্যে এলপিজি নিয়ে উদ্বেগের পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য আদর্শ কার্যপদ্ধতি (এসওপি) জারি করেছিল নবান্ন। তার পরেই সক্রিয় হল প্রশাসন। অন্য দিকে, গ্রাহকদের বড় অংশের অভিযোগ, বুকিং করেও সময়মতো মিলছে না গ্যাস সিলিন্ডার। কলকাতার গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির বক্তব্য, আতঙ্কে মানুষ গ্যাস বুক করছেন। এ দিকে জোগান বাড়ছে না। সরকারি হাসপাতালগুলিতেও আগের মতো রোগীদের জন্য রান্না হচ্ছে। সেখানে গ্যাসের ঘাটতি নেই বলেই খবর। তবে বেশ কয়েকটি প্রাথমিক স্কুলে গ্যাসের বদলে কাঠের জ্বালানিতে মিডডে মিল রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন রাঁধুনিরা বলে খবর। রাজ্যের বেশ কয়েকটি এলাকায় বন্ধ করতে হয়েছে মা ক্যান্টিন। গ্যাসের জোগান না-থাকায় ট্রলার নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করতে পারেননি বহু মৎস্যজীবী। কাটছাঁট হয়েছে বিভিন্ন মন্দিরের ভোগের মেনুতেও। আর এই নিয়েই শুক্রবার সংসদ চত্বরে বিক্ষোভে দেখিয়েছেন তৃণমূলের মহিলা সাংসদেরা।

Advertisement

বৃহস্পতিবার এসওপি জারি করে রাজ্যে কন্ট্রোলরুম খোলার কথা জানিয়েছিল নবান্ন। সেখানে বসেই নজর রাখা হবে পরিস্থিতিতে, এলপিজির জোগান ও সরবরাহে। গ্রাহকদের সমস্যার কথাও শোনা হবে। তার পরেই শুক্রবার সক্রিয় হল এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। কলকাতা এবং জেলার বিভিন্ন গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে হানা দেন আধিকারিকেরা। খতিয়ে দেখেন পরিস্থিতি। তাঁরা কথা বলেন কর্মীদের সঙ্গে। যদিও সরবরাহকারী সংস্থাগুলির দাবি, গ্রাহকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে আগেভাগে বুকিং করছেন। যদিও গ্রাহকদের বড় অংশ সে কথা মানতে চাননি। তাঁরা জানিয়েছেন, বার বার দফতরে ফোন করেও তাঁরা গ্যাস পাননি। কারও আবার ফোনে বুকিং হলেও তা নিশ্চিত করে মেসেজ আসেনি। তাই বাধ্য হয়েই ছুটছেন দফতরে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, রান্নার গ্যাস বেআইনি ভাবে অটোয় ভরা হচ্ছে। যদিও এই নিয়ে প্রশাসন বা অটোচালকদের তরফে কিছু জানানো হয়নি।

মৎস্যজীবীদের একাংশের দাবি, ট্রলারে নিয়ে যাওয়ার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারে দীর্ঘ দিন থাকতে হয় তাঁদের। সেখানেই রান্নাবান্না করেন। কিন্তু গ্যাস না-মেলায় মাছ ধরতেই যেতে পারেননি। সুন্দরবন সামুদ্রিক মৎস্যজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক সতীনাথ পাত্রের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ক্ষতি হতে পারে। কারণ, মৎস্যজীবীরা আগের মতো এলপিজির বদলে জঙ্গলের কাঠ কেটে রান্নাবান্না করতে পারেন। রান্নার গ্যাসের অভাবে কয়েক জেলায় বন্ধ হয়েছে মা ক্যান্টিন। কয়েক জেলায় কাঠের আগুনে চলছে মিডডে মিলের রান্না। বিভিন্ন মন্দিরের ভোগেও হয়েছে কাটছাঁট। খড়্গপুর আইআইটির হস্টেলের রান্নাঘরেও তৈরি হয়েছে সমস্যা। তবে হাসপাতালের রান্নাঘরে এখনও টান পড়েনি।

এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ

বৃহস্পতিবার এসওপি জারি করেছিল রাজ্য সরকার। তার পরেই শুক্রবার শহরে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরগুলি ঘুরে দেখেছে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। কোথায় কত সিলিন্ডার মজুত করা রয়েছে, জোগান কতটা, গ্রাহকেরা কী ভাবে গ্যাস বুক করছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথাও কালোবাজারি চলছে কি না, তার খোঁজও নেওয়া হচ্ছে। সকালে লর্ডস‌ মোড়ে একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে হানা দেন এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের আধিকারিকেরা। গ্যাসের জোগান এবং মজুত নিয়ে খোঁজখবর নেন। রেজিস্টার খতিয়ে দেখেন। শহরের পাশাপাশি জেলাতেও একই ছবি। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাদুতে একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে হানা দিয়েছিল পুলিশ। বারাসত পুলিশ জেলার এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ সেখানকার আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে। অভিযোগ, ওই গুদামে প্রচুর সিলিন্ডার মজুত করা রয়েছে। কিন্তু এলাকার মানুষ গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাসের জোগানে প্রাথমিক ভাবে কিছু গরমিল ধরা পড়েছে। তবে পুলিশ ও এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ডিলারেরা জানিয়েছেন, গরমিল নেই। দিনের শেষে নিয়ম অনুযায়ী হিসাব মিলিয়েই গ্যাস রাখেন তাঁরা। হুগলিতে গ্যাসের জোগান এবং সরবরাহ খতিয়ে দেখতে বিশেষ শাখার পুলিশ নিয়ে তদারকি করেন মহকুমাশাসক। চুঁচুড়া সদরের মহকুমাশাসক অয়ন নাথ চুঁচুড়া, ব্যান্ডেল, ডানলপের কয়েকটি গ্যাস অফিস ও গোডাউনে অভিযান চালান। তিনি সাবধান করে দেন ডিস্ট্রিবিউটারদের। তাঁর কথায়, ‘‘এখনও পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। বুকিং করার এক সপ্তার মধ্যেই ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে।’’

হাসপাতালের পরিস্থিতি

কলকাতার হাসপাতালগুলিতে এখনও পর্যন্ত রান্নার গ্যাসের সঙ্কট নেই। ফলে রোগীদের খাবার দিতে সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি বলেই জানিয়েছে রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলি। এসএসকেএমস, মেডিক্যাল কলেজ, এনআরএস, আরজি কর হাসপাতালের রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা সংস্থার ম্যানেজার তরুণ দে জানিয়েছেন, সাধারণত এক-একটি হাসপাতালে মাসে ১৫ থেকে ২০ বার সিলিন্ডার নিতে হয়। পর্যাপ্ত গ্যাস সেখানে মজুত রয়েছে। আরজি কর হাসপাতালের কিচেন সুপারভাইজ়ার আশিস ঘোষ বলেন, ‘‘শুক্রবার ১৮টি গ‍্যাস সিলিন্ডার (ডোমেস্টিক) পেয়েছেন। সামনের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এটাই চলে যাবে।’’ প্রতি বেলায় গড়ে ১২০০-১২৫০ রোগীর রান্না হয়। দৈনিক তিনটি বাণিজ‍্যিক সিলিন্ডার লাগে। গত কয়েক দিন বাড়িতে যে সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, তা দিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু রান্না বন্ধ হয়নি বলে জানান আশিস। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। বাইপাসের ধারের একটি হাসপাতালের এমডি সজল দত্ত জানান, সীমিত গ‍্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালে রোগীদের যাতে নিয়মিত খাবার দেওয়া যায়, সেজন‍্য মেনুতে বদল করা হয়েছে। যে হেতু মাছ, মাংস রান্নায় বেশি গ‍্যাস খরচ হয়, তাই সব্জি এবং ডিমের পদ রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। ইনডাস্ট্রিয়াল ইনডাকশনের বিকল্প ব‍্যবস্থা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কালোবাজারি না অভাব?

কলকাতা-সহ রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় দেখা যাচ্ছে গ্যাসের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন। অনেক গ্রাহকই অভিযোগ করেছেন, বুকিং করেও গ্যাস পাচ্ছেন না তাঁরা। কলকাতার গ্যাস সরবরাহকারীদের বক্তব্য, আতঙ্কে মানুষ সিলিন্ডার বুক করছেন। কিন্তু জোগান আগের চেয়ে বাড়েনি। সেই কারণেই সমস্যা হচ্ছে। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে শুক্রবার সকালে একটা রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস সংস্থার গুদাম খালি হয়ে গিয়েছে। গুদামে গিয়েও সিলিন্ডার পাননি বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ মানুষেরা। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর পর তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সিলিন্ডার শেষ। সংশ্লিষ্ট গ্যাস সংস্থার কর্মী বঙ্কিম লোহার বলেন, ‘‘গ্রাহকদের গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করতে বহু আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা জমা করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে বারংবার ইমেল পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তার পরেও গোডাউনে গ্যাস সরবরাহ করেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থা। তার জেরেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’’ অন্য দিকে, নদিয়ায় গোপনে দ্বিগুণ দামে রান্নার গ্যাস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। জলপাইগুড়ির একটি সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে নোটিস টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ৯ মার্চের পরে যাঁরা গ্যাস বুক করেছেন, তাঁদের এখনই সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব নয়। পরবর্তী জোগান এলে তাঁরা গ্যাস পাবেন। তবে কালোবাজারির অভিযোগ মানছে না প্রশাসন। চুঁচুড়া সদরের মহকুমাশাসক অয়ন বলেন, ‘‘কোনও রকম কালোবাজারির অভিযোগ এখনও পাইনি। পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কমার্শিয়াল গ্যাস সরবরাহ অস্বাভাবিক রয়েছে। শুধুমাত্র জরুরি কাজে ব্যবহারের জন্যই তা দেওয়া হচ্ছে।’’

বন্ধ ট্রলার

রান্নার গ্যাসের অভাবে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা। ফলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের বেশির ভাগ ট্রলারেই রান্নার জন্য বাণিজ্যিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেই জোগান কমে গিয়েছে। চড়া দাম দিলেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে দিন পনেরো থাকতে হয়। রতন দাস নামের এক মৎস্যজীবী জানান, মঙ্গলবার তাঁদের ট্রলার নিয়ে বেরোনোর কথা ছিল। কিন্তু সিলিন্ডার না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। আগে এই সমস্ত ট্রলারে জ্বালানি কাঠে রান্না হত। গ্যাস না থাকায় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভে ফের হাত পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

মা ক্যান্টিন

বসিরহাট পুর এলাকায় পুরাতন বাজারে মা ক্যান্টিন গ্যাসের অভাবে তিন দিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে। প্রতি দিন ৩০০-র বেশি মানুষ সেখান থেকে খাবার সংগ্রহ করেন। ঘাটালের মা ক্যান্টিনে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ জন মানুষ ৫ টাকায় ডিম ভাত খান। ঘাটাল হাসপাতালে বহু রোগীর পরিবারও এই খাবার খান। এলপিজির অভাবে রান্না বন্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঘাটাল পুরসভার চেয়ারম্যান তুহিনকান্তি বেরা। তিনি বলেন, ‘‘কৃত্রিম ভাবে রান্নার গ্যাসের সঙ্কট তৈরি করেছে কেন্দ্র। ৫ টাকার বিনিময়ে মা ক্যান্টিন যে খাবার দেওয়া হয়, সেখানে শনিবার থেকে কী ভাবে খাবার তৈরি হবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাতজোড় করে সেই সব মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, তবুও চেষ্টা করব বিকল্প জ্বালানিতে রান্না চালিয়ে যাওয়ার।’’ বাঁশবেড়িয়া পুরসভায় বন্ধ হয়েছে মা ক্যান্টিন। নোটিস ঝুলিয়ে জানানো হয়েছে, গ্যাসের অভাবে অনির্দিষ্ট কাল বন্ধ থাকছে রান্না। বাঁশবেড়িয়া পুরসভা পরিচালিত দু’টি মা ক্যান্টিনে প্রায় ৭০০ মানুষ রোজ খান। ক্যান্টিনের রান্নাঘরে কর্মরত দেবী নন্দন জানান, দু’-তিন দিন ধরে গ্যাসের সমস্যা চলছে। পুরসভার পক্ষ থেকে ছোট সিলিন্ডার দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে শুক্রবার রান্না হয়েছে, তবে শনিবার কী হবে তা বলা মুশকিল।

মিডডে মিল

একাধিক সরকারি স্কুলে মিড ডে মিল তৈরির জন্য কাঠের জ্বালের সাহায্য নিতে হচ্ছে।

ভোগে কাটছাঁট

গ্যাসের অভাবে হুগলির শ্রীরামপুরের রাধাবল্লভ মন্দিরে ভোগের ‘মেনু’তে কাটছাঁট করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন, ভোগের সঙ্গে আগের মতো ভাজাভুজি পাওয়া যাবে না। কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে রোজ যে অন্ন ভোগ দেওয়া হয়, তার পরিমাণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। এমনিতে প্রতি দিন পাঁচ কেজি চাল এবং দেড় কেজি ডাল দিয়ে ভোগ রান্না করা হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় নানা রকম সব্জি। এখন সেই পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোচবিহারের সদর মহকুমাশাসক গোবিন্দ নন্দী জানান, ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে যাতে মন্দিরে ভোগ রান্নার জন্য গ্যাস পাওয়া যায়। সে জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।

অটোয় রান্নার গ্যাস

রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে প্রকাশ্যে অবৈধ ভাবে অটোতে গ্যাস ভরার অভিযোগ উঠেছে জয়নগরে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে পাইপের মাধ্যমে অটোতে গ্যাস ভরা হচ্ছে। এলাকায় প্রকাশ্যেই এই কাজ চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের একাংশের। তাঁরা জানিয়েছেন, বেআইনি ভাবে এই গ্যাস ভরার ব্যবসার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা দাবি করছেন, যে নিয়মিত প্রশাসনকে টাকা দিয়েই এই কারবার চালানো হচ্ছে। যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় অটোচালকদের একাংশ জানান, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহে সমস্যার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই ভাবে গ্যাস ভরছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি বলেই মত তাঁদের।

তৃণমূলের বিক্ষোভ

এলপিজি নিয়ে উদ্বেগের পরিস্থিতিতে শুক্রবার সংসদের বাইরে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূলের মহিলা সাংসদেরা। মহুয়া মৈত্র, মিতালী বাগ, জুন মালিয়া, দোলা সেন, শতাব্দী রায়, মালা রায়রা লোকসভার বাইরে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের দাবি, এলপিজি নিয়ে কেন্দ্র যা বলছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। দু’দিন আগেই কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছিল, গ্যাস সরবরাহের সময়ে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। বুকিংয়ের পরে আড়াই দিনের মধ্যেই রান্নার গ্যাস মিলবে। কিন্তু তৃণমূলের দাবি, আদৌ তা হচ্ছে না। বাস্তবে আট থেকে ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও গ্যাস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। মিতালী বলেন, ‘‘যে ভাবে হঠাৎ করে এলপিজি গ্যাস গায়েব হয়ে গেল, তাতে মানুষের হেঁশেলে নাভিশ্বাস উঠছে। মিড ডে মিল থেকে শুরু করে বাড়ির রান্না, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে আসছেন না। তাই আমরা সংসদের বাইরে প্রতিবাদ করছি। এর জন্য যত দূর যেতে হয় যাব। মানুষ তো না খেয়ে বাঁচতে পারবে না!’’ আড়াই দিনে গ্যাস সরবরাহের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মহুয়া। তিনি বলেন, ‘‘দেশে এলপিজির সঙ্কট চলছে। মানুষ আতঙ্কিত। গ্যাসের জন্য এখন লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সরকার বলছে, আড়াই দিনে সিলিন্ডার পাওয়া যাবে। কিন্তু আদতে তা হচ্ছে না। আমি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ করছি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখুন পরিস্থিতি কী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী গত পাঁচ দিন সংসদে আসেননি। তিনি কেরলে ভোটের প্রচার করে চলেছেন।’’

সংসদ চত্বরে তৃণমূলের মহিলা সাংসদদের বিক্ষোভ।

সংসদ চত্বরে তৃণমূলের মহিলা সাংসদদের বিক্ষোভ। —নিজস্ব চিত্র।

বিপাকে খড়্গপুর আইআইটি

খড়্গপুর আইআইটিতে রান্নার গ্যাসের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আবাসিক পড়ুয়াদের খাবারের বন্দোবস্ত করতে এখন কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণাকে চিঠি দিয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। খড়্গপুর আইআইটির ২০টি ‘রেসিডেন্সিয়াল হল’-এ প্রায় ১৫ হাজার পড়ুয়া রয়েছেন। তাঁদের তিন বেলার খাবার তৈরি হয় ক্যান্টিনে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, রান্নার কাজে প্রতি দিন গড়ে ১০৪টি গ্যাস সিলিন্ডারের প্রয়োজন হয়। সেই সিলিন্ডারের জোগানে টান পড়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে কাঠের উনুনে রান্না শুরু হয়েছে। খড়্গপুর আইআইটি ক্যাম্পাসের ‘আজাদ হল’-এর ম্যানেজার অভিজিৎ রায় জানান, ভাজাভুজি করা এখন সম্ভব হচ্ছে না। দুপুর এবং রাতের খাবার ছাড়া পড়ুয়ারা যাতে টিফিনও নিয়মিত পান, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে তার পরেও ‘মেনু’ পরিবর্তন করতে হচ্ছে মাঝেমধ্যেই।

মোদী সরকারের বার্তা

দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। নয়াদিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা বলেন, ‘‘সমস্ত পেট্রল পাম্পে পর্যাপ্ত পরিমাণে পেট্রল এবং ডিজ়েল পাওয়া যাচ্ছে। আর এলপিজি সম্পর্কে বলতে চাই, এটি উদ্বেগের বিষয় ঠিকই। তবুও আমাদের ২৫ হাজার এলপিজি পরিবেশকের মধ্যে সকলের কাছে জোগান রয়েছে।’’ তার পরেই দেশবাসীর উদ্দেশে সুজাতার বার্তা, ‘‘কেউ দয়া করে গুজবে কান দেবেন না। আতঙ্কিত হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে যাবেন না।’’

Advertisement
আরও পড়ুন