LPG Shortage in West Bengal

কোথায় কত সিলিন্ডার মজুত, জোগান কতটা? ঘুরে দেখা শুরু করল এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ, রাজ্য এসওপি জারির পরেই তৎপরতা

রাজ্য সরকার এলপিজি নিয়ে একটি এসওপি জারি করেছিল বৃহস্পতিবার। তার পর থেকেই প্রশাসন তৎপর। শহরের পাশাপাশি জেলায় জেলায় এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ নজরদারি শুরু করেছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ১৪:২৭
যোধপুর পার্কের গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের সদস্যেরা। শুক্রবার।

যোধপুর পার্কের গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের সদস্যেরা। শুক্রবার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্যে এলপিজি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বৃহস্পতিবারই আদর্শ কার্যপদ্ধতি (এসওপি) জারি করেছিল নবান্ন। খোলা হয়েছে কন্ট্রোলরুমও। তার পর শুক্রবার থেকেই তৎপরতা চোখে পড়ছে। শহরে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরগুলি ঘুরে দেখা শুরু করেছে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। কোথায় কত সিলিন্ডার মজুত করা রয়েছে, জোগান কতটা, গ্রাহকেরা কী ভাবে গ্যাস বুক করছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথাও কালোবাজারি চলছে কি না, তার খোঁজও নেওয়া হচ্ছে।

Advertisement

সকালে লর্ডস‌্ মোড়ে একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে হানা দেন এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের আধিকারিকেরা। গ্যাসের জোগান এবং মজুত নিয়ে খোঁজখবর নেন। রেজিস্টার খতিয়ে দেখেন। শহরের পাশাপাশি জেলাতেও একই ছবি। মধ্যমগ্রামের বাদুতে একটি গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে হানা দিয়েছিল পুলিশ। বারাসত পুলিশ জেলার এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ সেখানকার আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে। অভিযোগ, ওই গুদামে প্রচুর সিলিন্ডার মজুত করা রয়েছে। কিন্তু এলাকার মানুষ গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাসের জোগানে প্রাথমিক ভাবে কিছু গরমিল ধরা পড়েছে। তবে পুলিশ ও এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ডিলারেরা জানিয়েছেন, গরমিল নেই। দিনের শেষে নিয়ম অনুযায়ী হিসাব মিলিয়েই গ্যাস রাখেন তাঁরা।

জলপাইগুড়ির একটি সরবরাহকারী সংস্থার দফতরে নোটিস টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ৯ মার্চের পরে যাঁরা গ্যাস বুক করেছেন, তাঁদের এখনই সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব নয়। পরবর্তী ধাপের জোগান এলে তাঁরা গ্যাস পাবেন। হুগলিতে গ্যাসের জোগান এবং সরবরাহ খতিয়ে দেখতে বিশেষ শাখার পুলিশ নিয়ে তদরকিতে নেমেছেন মহকুমাশাসক। চুঁচুড়া, ব্যান্ডেল, ডানলপের কয়েকটি গুদামে তাঁরা অভিযান চালিয়েছেন।

শহরে গ্যাস সরবরাহকারীদের বক্তব্য, আতঙ্কে মানুষ সিলিন্ডার বুক করছেন। কিন্তু জোগান আগের চেয়ে বাড়েনি। সেই কারণেই সমস্যা হচ্ছে। যোধপুর পার্ক এলাকার এক গ্যাস সরবরাহকারী শঙ্করপ্রসাদ নস্কর বলেন, ‘‘আগে আমাদের অফিসে সাধারণ ভাবে ৪০০-৫০০ বুকিং হত। এখন হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আগেও ৫২৫টি সিলিন্ডারের গাড়ি আসত। এখনও তা-ই আসে। বুকিং বেড়ে যাওয়ায় কুলোচ্ছে না। দিনে একটি করেই গাড়ি পাচ্ছি। লোকে আতঙ্কে বুকিং করছেন। গ্যাস না পেয়ে অনেকে দফতরে চলে আসছেন।’’

সিলিন্ডার বুকিংয়ের খোঁজ নিতে এসেছেন গ্রাহকেরা।

সিলিন্ডার বুকিংয়ের খোঁজ নিতে এসেছেন গ্রাহকেরা। —নিজস্ব চিত্র।

রুবি এলাকার বাসিন্দা অশোককুমার মাহাতো বলেন, ‘‘আমার এক মাস আট দিন হয়ে গিয়েছে। একটাই সিলিন্ডার। গ্যাস শেষ হয়ে এসেছে। যে কোনও দিন ফুরিয়ে যাবে। বুক করতে পারছি না।’’ আর এক বাসিন্দা জানান, ৮ তারিখ তিনি ফোন করে গ্যাস বুক করেছিলেন। কিন্তু ফোনে মেসেজ আসেনি। কাউন্টার থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, সার্ভার ডাউন। ওই গ্রাহকের কথায়, ‘‘আমার ঘরে অসুস্থ রোগী আছেন। ২৭ দিন পরেও বুক করতে পারছি না। কী ভাবে চালাব?’’ পোদ্দার নগর হাই স্কুল থেকে গ্যাসের খোঁজ নিতে দফতরে এসেছিলেন সুশান্ত কুমার বাগ। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের স্কুলের হস্টেলে ৫০ জন আবাসিক ছাত্র আছে। গ্যাস যা আছে, তাতে আর ক’টা দিন চলবে। তার পর আর চালাতে পারব না। আমরা বাণিজ্যিক গ্যাস ব্যবহার করি। মাসে পাঁচ-ছ’টা করে সিলিন্ডার লাগে। চলতি মাসে এখনও বুকিং করিনি। এখানে বলছে গ্যাসের জোগান নেই। বাধ্য হয়ে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করছি।’’

দিনে ৫২৫টি করে সিলিন্ডার আসছে যোধপুর পার্কের এই গ্যাস সরবরাহকারীদের কাছে।

দিনে ৫২৫টি করে সিলিন্ডার আসছে যোধপুর পার্কের এই গ্যাস সরবরাহকারীদের কাছে। —নিজস্ব চিত্র।

যোধপুর পার্কের দফতরে গ্যাস বুক করতে এসেছিলেন লেক গার্ডেন্সের সৌমেন হালদার। সার্ভার ডাউন বলে তাঁকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এক সরবরাহকারী রোহিত চন্দ্র বলেন, ‘‘আমরাও অসুবিধায় পড়েছি। গ্রাহকদের সমস্যা হচ্ছে। সার্ভার ডাউন রয়েছে। ৫২৫টি সিলিন্ডারের গাড়ি শেষ হয়ে যাচ্ছে।’’

গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার কাউন্টারে উদ্বিগ্ন গ্রাহকের ভিড়।

গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার কাউন্টারে উদ্বিগ্ন গ্রাহকের ভিড়। —নিজস্ব চিত্র।

শহরের হাসপাতালগুলিতে এখনও পর্যন্ত সঙ্কট নেই। এসএসকেএমস, মেডিক্যাল কলেজ, এনআরএস, আরজি কর হাসপাতালের রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা সংস্থার ম্যানেজার তরুণ দে জানিয়েছেন, সাধারণত এক-একটি হাসপাতালে মাসে ১৫ থেকে ২০ বার সিলিন্ডার নিতে হয়। পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত আছে।

তবে গ্যাস উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের জীবনে। সিলিন্ডার না থাকায় গভীর সমুদ্রের উদ্দেশে মাছ ধরার ট্রলার রওনা দিতে পারছে না। বিষ্ণুুপুরের একটি সরবরাহকারী সংস্থা সিলিন্ডারশূন্য হয়ে পড়েছে। বসিরহাটে মা ক্যান্টিন বন্ধ তিন দিন ধরে। স্কুলের মিড ডে মিল তৈরিতে কাঠের উনুন ব্যবহার করতে হচ্ছে। মন্দিরের ভোগের রান্নাতেও টান পড়েছে।

গ্যাসের কালোবাজারি রুখতে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। রাজ্য সরকারগুলিকে এ বিষয়ে তৎপর হতে অনুরোধ করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে এসওপি জারি করেছে, তাতে মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়। সিএনজি, ডিজ়েল, পেট্রল, কেরোসিন কোথায় কতটা মজুত রয়েছে, তা-ও দেখবে ওই কমিটি। ইন্ডিয়ান অয়েল, এইচপিসিএল, বিপিসিএলের মতো সংস্থাগুলিকে জরুরি পরিষেবা ক্ষেত্রে রান্নার গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করতে বলেছে রাজ্য। শহর এবং গ্রামের বাড়ি, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অঙ্গনওয়াড়ি, স্কুল, কলেজ, সরকারি হস্টেল, হোমে যাতে প্রয়োজন মতো এলপিজি মেলে, তা সংস্থাগুলিকে দেখতে বলা হয়েছে। যে গ্রাহকেরা একটি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন, সরবরাহের ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে এলপিজি সংস্থাগুলিকে। গ্রাহকদেরও বুঝে খরচ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসওপি অনুযায়ীই শুক্রবার সকাল থেকে শহর এবং জেলায় তৎপর প্রশাসন। কেন্দ্র জানিয়েছে, বুকিংয়ের আড়াই দিনের মধ্যে গ্যাস বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগ, বাস্তবে চিত্রটা ভিন্ন। তা নিয়ে শুক্রবার সকালে সংসদের বাইরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তৃণমূল সাংসদেরা।

Advertisement
আরও পড়ুন