West Bengal Assembly Election 2026

নির্বাচনের আগে রাজ্যের পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য ‘উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন মমতার! মুর্মু-বিতর্কে পদ্মের ‘সুবিধা’ ঠেকাতে নির্বাচনী অঙ্ক?

পাঁচটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘মুন্ডা’, ‘কোরা’ এবং ‘ডোম’ জনগোষ্ঠীর মানুষ মূলত পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বাস করেন। ‘সদগোপ’, ‘কুম্ভকারেরা’ অবশ্য রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ১৫:৪১
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।

রাজ্যের পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য সাংস্কৃতিক এবং উন্নয়ন বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী জানান মুন্ডা, কোরা, ডোম, কুম্ভকার এবং সদগোপ জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত পাঁচটি পৃথক বোর্ড গঠন করতে চাইছে তাঁর সরকার।

Advertisement

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ওই বোর্ডগুলি ওই জনগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব ভাষা এবং ঐতিহ্যকে যেমন রক্ষা করবে, তেমনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের উন্নতির বিষয়টিও দেখবে। মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানিয়েছেন যে, রাজ্যের তৃণমূল সরকার ২০১৩ সাল থেকেই আর্থ-সামাজিক দিক থেকে সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীগুলির সামগ্রিক উন্নয়নে বোর্ড গঠন করেছে। মমতা যে পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য বোর্ড গঠনের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে ‘মুন্ডা’ এবং ‘কোরা’ জনগোষ্ঠীর মানুষ তফসিলি জনজাতিভুক্ত (এসটি)। ‘কুম্ভকার’ এবং ‘সদগোপ’ অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ভুক্ত (ওবিসি)। আর ‘ডোম’ জনগোষ্ঠীর মানুষ তফসিলি জাতিভুক্ত।

এই পাঁচটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুন্ডা, কোরা এবং ডোম জনগোষ্ঠীর মানুষ মূলত রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি (বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরের একাংশ)-তে বাস করেন। সদগোপ, কুম্ভকারেরা অবশ্য রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, উন্নয়ন বোর্ড গঠনের নেপথ্যে জনগোষ্ঠীগুলির উন্নয়নের পাশাপাশি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের অঙ্কও কাজ করেছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ‘অসম্মান’ করার অভিযোগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে এই অঙ্ক জটিল হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বিজেপি তুলনায় বেশি শক্তিশালী। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলে কার্যত একাধিপত্য দেখিয়েছিল বিজেপি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে অবশ্য তৃণমূল কিছুটা জমি পুনরুদ্ধার করেছিল। ঝাড়গ্রামের চারটি আসনেই ফুটেছিল জোড়াফুল। তিন বছর পরে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বাঁকুড়া, ঝাড়়গ্রাম, মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্র বিজেপির কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় রাজ্যের শাসকদল। ২০১৯ সালে পর ২০২৪ সালেও পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি জয়ী হয়। কিন্তু ভোট শতাংশ বাড়িয়েছিল তৃণমূল।

এই পরিস্থিতিতে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলকে ‘নিষ্কণ্টক’ রাখতে চায় তৃণমূল। সেই অঙ্ক মাথায় রেখেই পাঁচটি জনগোষ্ঠীর জন্য মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়ন বোর্ড গঠনের কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করছেন কেউ কেউ। তা ছাড়া, রাষ্ট্রপতির ‘অসম্মান’-বিতর্কও অস্বস্তিতে ফেলেছে রাজ্যের শাসকদলকে। রাষ্ট্রপতির ‘আদিবাসী পরিচয়’ সামনে রেখে তৃণমূলকে কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছে বিজেপি। রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্কের জেরে তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোট আবার বিজেপির দিকে সরে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। প্রকাশ্যে এমন সম্ভাবনাকে আমল না-দিলেও পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক মাটি আরও পোক্ত করতে চাইছে তৃণমূল। তা ছাড়া, এই জনগোষ্ঠীগুলির উপস্থিতি উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও লক্ষণীয়। ভোটের অঙ্কে উত্তরবঙ্গের মাটিও এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের জন্য খুব উর্বর নয়। সেখানেও পদ্মের অগ্রগতি রুখতে চায় রাজ্যের শাসকদল। তাই উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠনের কথা বলা হলেও বিধানসভা ভোটের আগে এই উন্নয়ন বোর্ড রাজনীতির ছোঁয়াচ এড়াতে পারছে না।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী কনফারেন্স’-এ যোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন মুর্মু। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির বিধাননগরে যেখানে তাঁর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেই স্থান পরিবর্তন করা হয়। ‘নিরাপত্তার কারণে’ বাগডোগরার কাছে গোঁসাইপুরে রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। এই স্থান পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি স্বয়ং। তিনি পরে বিধাননগরে পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে রাজ্য প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। কেন মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভার কোনও সদস্য বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে যাননি, সেই প্রশ্নও তোলেন রাষ্ট্রপতি মুর্মু। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। তৃণমূলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ভাবে রাষ্ট্রপতিকে ‘অসম্মান’ করার অভিযোগ তোলে বিজেপি। সরব হন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। আসরে নামেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও। সেই সমস্ত আক্রমণের জবাব দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূলের নেতা-নেত্রীরা।

ঘটনাচক্রে, ‘অসম্মান’-বিতর্কের রেশ কাটতে না-কাটতেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদেরা। আদিবাসী সমাজের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার কী কী কাজ করেছে, তার খতিয়ান রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু বৃহস্পতিবার তৃণমূল সাংসদদের আবেদন খারিজ করে দেয় রাষ্ট্রপতি ভবন। জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি আপাতত এই বৈঠকের জন্য সময় দিতে পারছেন না। সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ফের রাষ্ট্রপতির ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ চেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল।

Advertisement
আরও পড়ুন