হোটেল মার্তিনেজ় প্রথম বার তাদের দরজা খোলে ১৯২৯ সালে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সিনেপ্রেমীদের আশ্রয় দিয়ে চলেছে মার্তিনেজ়। তবে আশ্রয়ের বিনিময়ে অবশ্য খরচ করতে হচ্ছে বিপুল কাঞ্চনমূল্য। কত শত সিনেপ্রেমী, শিল্পী, মডেল ও ধনকুবের যে মার্তিনেজ়ের অতিথি, তার ইয়ত্তা নেই। সম্প্রতি বলিউড তারকা আলিয়া ভট্টও তাঁদের অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন ফরাসি শহর কান-এ। ঘর এবং হোটেলের অন্দরসজ্জার ঝলক প্রকাশ পেয়েছে আলিয়ার সমাজমাধ্যম জুড়ে।
কান চলচ্চিত্র উৎসব মানেই কেবল সিনেমা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিলাসিতা, তারকাখচিত পার্টি আর বিশ্বের সবচেয়ে অভিজাত হোটেলগুলির ঝলকও। আর সেই তালিকায় বহু বছর ধরেই জায়গা দখল করে রয়েছে হোটেল মার্তিনেজ়। কান শহরের সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক হোটেল যেন ধীরে ধীরে উৎসবেরই এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পাঁচতারা এই হোটেলটি তার আর্ট ডেকো নকশা, কান উপসাগরের তীরে অবস্থান এবং খ্যাতনামী অতিথিদের আস্তানা হিসেবে বিশ্ব জুড়ে পরিচিত। প্রতি বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবের সময়ে তারকাদের জন্য ঘর প্রস্তুত করা থাকে এখানে। তা সে আলিয়াই হোন বা ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন, দীপিকা পাড়ুকোন কিংবা বেলা হাদিদ অথবা আন্তর্জাতিক শিল্পী ব্র্যাড পিট, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, লিয়োনার্দো ডি’ক্যাপ্রিয়ো।
হোটেলের ঘরগুলির সঙ্গে মিলবে নানা আকারের বারান্দা, ভূমধ্যসাগরের দৃশ্য, মার্বেলের স্নানঘর এবং অত্যন্ত বিলাসবহুল সাজসজ্জা। অনেক কক্ষে আবার ব্যক্তিগত ছাদও রয়েছে। সবচেয়ে মহার্ঘ স্যুইটগুলির মধ্যে নিজস্ব জ়াকুজ়ি এবং মস্ত বসার ঘরও রয়েছে।
হোটেলের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলির মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি পেন্টহাউস স্যুইট, যেখান থেকে সরাসরি সমুদ্র দেখা যায়। বিশালাকার এক ছাদও রয়েছে তাতে। তাতে নানা প্রান্তে নানা নকশার সোফা ও টেবিল সাজানো। মস্ত বাথরুমে আবার বাথটাব, ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত টানা আয়না, বসার জায়গাও রাখা আছে। পেন্টহাউসের পরিসর প্রায় ১৩,৪৫৫ বর্গফুট। ইয়োরোপের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ পেন্টহাউস নাকি এটিই। অনেক আন্তর্জাতিক তারকাই এই স্যুইট বুক করেন বলেও জানা গিয়েছে।
হোটেলের অন্দরসজ্জা দেখে বোঝা যায়, প্রত্যেকটি কোণ, প্রতিটি ছোট অংশে শৈল্পিক ছাপ রয়েছে। যেমন, বারান্দাগুলির রট-আয়রনের রেলিংও কারুকার্যে ভরা, হালকা নীল ও সোনালি রঙের তুলি বোলানো। রঙের ক্ষেত্রে চোখের আরামের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। আলিয়ার ঘর দেখে বোঝা যায়, সেখানে আইভরি ও সোনালি রঙের প্রাধান্য রয়েছে দেওয়ালে। তবে পর্দা, চেয়ার, সোফায় নীলের ছোঁয়া। হোটেলের লাউঞ্জ, লবি, করিডর এবং সিঁড়িতেও নীল রঙের আধিক্য বেশি। উৎসবের লাল গালিচায় পা রাখার আগে হোটেলের নীল গালিচায় হাঁটার মহড়াও দিয়েছেন আলিয়া।
কোনও কোনও ঘরের ছাদের অর্ধেক অংশ আবার কাচ দিয়ে ঢাকা। শুয়ে-বসে আকাশের তারা দেখার জন্য উপযুক্ত বন্দোবস্তও রয়েছে। সেগুলির বারান্দায় সুন্দর বসার জায়গা বানানো হয়েছে। গাছগাছালিতে ভরে রয়েছে সেই বারান্দাগুলি। ঘরগুলিও সাজানো হয়েছে সুন্দর গাছ ও ফুল দিয়ে।
হোটেল মার্তিনেজ়ের প্রত্যেকটি ঘর, বারান্দা, লাউঞ্জ, এমনকি স্নানঘরেও সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল সোফার বাহার। নানা রঙের, নানা আকৃতির, নানা মাপের আরামদায়ক সোফা রাখা হয়েছে গোটা হোটেল জুড়ে। সঙ্গে অবশ্যই মানানসই আকারের কুশন ও কুশনের কভার। তারই সঙ্গে মজাদার সমস্ত টেবিল রেখেও পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে অন্দরসজ্জার ক্ষেত্রে।
ঘরগুলির সঙ্গে রং মিলিয়ে পাতা হয়েছে কার্পেট। কোনওটায় জ্যামিতিক নকশা, কোনওটায় ফুলেল ছাপ, কখনও সমুদ্রের ঢেউ আঁকা, কখনও বা একেবারে বাহুল্যবর্জিত নকশা বিছিয়ে রয়েছে কার্পেটগুলিতে। ঘরের নাম, দেওয়ালের রং, পর্দার রং, সব কিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা হয়েছে।
সফরে থাকাকালীন শারীরচর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন না তারকারা। তার প্রমাণ হোটেলের মস্ত জিম। কাচ দিয়ে ঘেরা জিমে ট্রেডমিল, সাইকেল, ভারোত্তোলনের নানাবিধ যন্ত্র রাখা রয়েছে। পাশাপাশি, ত্বক ও কেশচর্চার জন্য সালোঁ ও স্পায়ের বন্দোবস্ত রয়েছে সেখানে। ফ্যাশনের দেশ ফ্রান্স, কেতা ও সিনেপ্রেমীদের শহর কান-এর এত বড় হোটেলে যে এমন ব্যবস্থা থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।
তবে কেবল ফ্যাশন, সিনেমা, সাজগোজ নয়, ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কান শহরে ঘুরতে গেলেও হোটেল মার্তিনেজ় উপযুক্ত। তার প্রমাণ রয়েছে ‘রিল্যাক্স রুম’-এর বাহুল্যে। সুইমিং পুল ও সমুদ্রের ধারে সানবেডের সারি দেখে সে কথা স্বীকার করতেই হয়। অতিথিদের পছন্দের স্ন্যাক্স ও ককটেলও পরিবেশন করা হয় সানবেডের কাছে। ফলে কেবল পর্দার সামনে নয়, প্রচারের আলো বা ভিড় থেকে দূরে থাকার জন্যও অনেকে বেছে নেন মার্তিনেজ়কে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই প্রাসাদোপম হোটেলের ঘরের ভাড়া শুরুই হচ্ছে ২ লক্ষ টাকা থেকে। সবচেয়ে বিলাসবহুল ঘরের ভাড়া প্রায় ৬ লক্ষ টাকাএক রাতের জন্য। কোনও ঘর থেকে শহর দৃশ্যমান, কোনওটি থেকে আবার সাগর। কান চলচ্চিত্র উৎসবের সময়ে নাকি এই হোটেলের ভাড়া আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। যা এমনিতে ৬ লক্ষ, তা-ই হয়ে উঠতে পারে ৯ লক্ষ।
কান উৎসবের সময় হোটেলের বাইরের রাস্তা প্রায় ছোটখাটো প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। অনুরাগী, আলোকচিত্রী, পাপারাৎজ়ি এবং সংবাদমাধ্যমের ভিড় লেগেই থাকে। অনেক সময়ে তারকারা বারান্দা থেকে হাত নাড়লেও তা শিরোনাম দখল করে।
হোটেলের রেস্তরাঁ এবং নিজস্ব সমুদ্রসৈকতও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভূমধ্যসাগরীয় খাবার, উচ্চমানের পরিষেবা আতিথেয়তার জন্য এটি পরিচিত। শুধু থাকার জায়গা নয়, অনেকের কাছে এই হোটেলে থাকাটা চলচ্চিত্র উৎসবেরই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
সমাজমাধ্যমেও এখন এই হোটেল নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে। কেউ তারকাদের ঘর খুঁজছেন, কেউ আবার বারান্দা থেকে দেখা সমুদ্রের ছবি পোস্ট করছেন। সিনেমার বাইরেও কান চলচ্চিত্র উৎসব যে এক বিশাল বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রদর্শনী, তার প্রমাণ মার্তিনেজ়।