নীল হাফশার্ট আর ধুতি পরিহিত বিভূতিভূষণকে যেন স্পর্শ করা যায় এই প্রদর্শনীতে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
“আপনি সত্যি বিভূতিভূষণকে দেখেছিলেন? সত্যি দেখেছিলেন?”
তারাপদ রায়ের লেখা ‘শতবার্ষিকীর ছায়াপদ্য’ নামের এক কবিতা শুরু হয়েছিল এ ভাবেই। বাংলা হাফশার্ট আর ধুতি পরা মানুষটির শতবর্ষ অতীত হয়েছে কবেই, কিন্তু আজও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় যে পাঠকের কাছে বিস্ময়, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে! বুধবার সন্ধ্যায় কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি (কেসিসি) আয়োজিত ‘পথের দেবতা: গড অফ দ্য লিটল রোড’ শীর্ষক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেই বিস্ময়কেই যেন পুনরাবিষ্কার করা গেল।
প্রদর্শনীর তখনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি, তবু কেসিসি-র প্রদর্শনীকক্ষের প্রবেশদ্বারে দাঁড়াতেই চোখের সামনে নীল রঙের হাফহাতা বাংলা শার্টটি যেন এক ঝলক দেখিয়েই দিল ‘পথের পাঁচালী-র পথিক আর ‘চাঁদের পাহাড়’-এর অভিযাত্রীকে। প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রদর্শনীর সূচনা করলেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অভিনেত্রী তথা পরিচালক অপর্ণা সেন, বিভূতিভূষণের পুত্রবধূ মিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদর্শনীর কিউরেটর এবং বিভূতিভূষণের পৌত্র তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেসিসি-র প্রেসিডেন্ট রিচা আগরওয়াল। খুলে গেল এক অনন্য জগতের দরজা, যেখানে বিভূতিভূষণের ব্যবহৃত পোশাক থেকে তৈজসপত্র, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, পারিবারিক আলোকচিত্রের পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে সমসময়কেও। প্রদর্শিত হয়েছে সমকালীন লেখক বন্ধুদের ছবি এবং পরিচিতিও।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, মিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায় ও রিচা আগরওয়াল। ছবি: কেসিসির সৌজন্যে।
উদ্বোধনী ভাষণে তৃণাঙ্কুর শোনালেন এক আশ্চর্য গল্প। তাঁর ঠাকুরমা অর্থাৎ বিভূতিভূষণের পত্নী এক বার বাড়ির জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলেন। তৈজস আর এটা-সেটা গোছাতে গিয়েই দিন কাবার। রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন বিভূতিভূষণ তাঁকে বলছেন, “ওগুলো রেখে কী করবে? আমার জিনিসগুলো নাও।” পরের দিন তিনি গুছিয়ে রাখতে শুরু করলেন প্রয়াত লেখকের পাণ্ডুলিপি, দিনলিপি, জার্নাল, চিঠিপত্র। সেই সম্ভারের একটা বড় অংশই আজ প্রকাশ্যে।
অপর্ণা সেন স্মরণে আনলেন চলচ্চিত্র জগতের এক অজানা কাহিনি। কোনও পরিচালক একবার নাকি ‘আরণ্যক’ চলচ্চিত্রায়িত করতে উদ্যোগী হন। তাঁর দাদা হাঁ হাঁ করে ওঠেন এই পরিকল্পনা শুনে। তিনি বলেন, “এ কাজ করলে বাঙালি মিছিল করবে পরিচালকের বিরুদ্ধে। খবরদার যেন এ ছবি না হয়।” পরিচালক অগ্রজের কথা শুনে ক্ষান্ত হন সেই কাহিনিহীন আখ্যানকে সেলুলয়েডে তুলে ধরার দুরূহ প্রয়াস থেকে।
প্রদর্শনীর একাংশ। —নিজস্ব চিত্র।
বিভূতি অর্থাৎ ভস্ম যাঁর ভূষণ, সেই বৈরাগ্যপ্রবণ মানুষটি ছিলেন সার্থকনামা। যশলোভ, অর্থলোভ, সাহিত্য জগতের নিরন্তর প্রতিযোগিতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি কোনও দিন। অসীম বৈরাগ্য নিয়ে পৃথিবীকে দেখেছেন ‘অপরাজিত’ লেখক। বলছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর বিভূতিভূষণ পাঠ শুরু। গোড়া থেকেই এক ম্যাজিকের সামনে পড়েছিলেন তিনি। সম্মোহনের ঘোরও বলা যায় তাকে। যে ঘোর আজও কাটেনি। কখনও উদাসীন, কখনও স্পিরিচুয়াল, কখনও বা প্রথাসিদ্ধ কাহিনিকে বর্জন করে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কে নিয়ে কলম ধরেছেন। অনুজ সাহিত্যিকের ভাষায় সে সবই যেন ‘আলপনা’। প্রসঙ্গক্রমে বিভূতিভূষণের বৈরাগ্যকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন শীর্ষেন্দুবাবু। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের একের পর এক মৃত্যুর ঢেউ যেন অপূর্ব রায় তথা অপুর জীবনে পর্যায়ক্রমিক মুক্তি এনে দিয়েছিল। সর্বজয়ার মৃত্যুমুহূর্তে অপু তাই মুক্তির স্বাদ অনুভব করে প্রথমে। তার পরেই ভেঙে পড়ে কান্নায়। এ এক অপূর্ব নিঠুর-প্রেমিকের গল্প। বিভূতিভূষণও তাঁর লিখনে কথাও নিরাসক্ত, কোথাও বা মানবজমিনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বেদনাকে এঁকেছেন পরম মমতায়।
পিতামহের গল্প শোনাচ্ছেন পৌত্র তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়। —নিজস্ব চিত্র।
নিরাসক্ত, কোথাও বা মানবজমিনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বেদনাকে এঁকেছেন পরম মমতায়।
বিভূতিভূষণকে নিয়ে এই প্রদর্শনী চলবে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। খোলা থাকবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা। প্রদর্শনীর সমান্তরালে কেসিসির এরিনা মঞ্চে আয়োজিত হবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা। থাকবে ‘বিভূতিভূষণ ও অলৌকিক’ শিরোনামে তাঁর গল্পপাঠের আসরও। থাকবেন রুশতী সেন থেকে অনির্বাণ ভট্টাচার্য, সন্দীপ রায় থেকে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।