Catering then and now

হেঁটে হেঁটে ফিরছি, ধুর মশাই কী খাওয়ালেন!

কুচুটে কুটুম। জাঁদরেল সব খাইয়ে। বেবাড়ির বিস্মৃত মেনুকার্ডে একাকার নান্দনিকতা ও নিষ্ঠুরতা। বাঁধাকপির মির্জাপুরি, মাংসের হোসেনি কারির কথা শুনে আজকের খাদ‍্যবিদেরাও রিসার্চে নামেন।

ঋজু বসু
শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৫
‘হারমোনিয়াম’ ছবির দৃশ্য।

‘হারমোনিয়াম’ ছবির দৃশ্য।

সে কালের বিয়েবাড়ির নেমন্তন্নর ছবিটা আজও তপন সিংহের ‘হারমোনিয়াম’-এ খোদাই হয়ে আছে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় চ‍্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, ‘দইটা কোতাকার খেয়েই ব’লে দোব’! তার পর মাটির খুরিটা ধরে সেই অননুকরণীয় ভঙ্গিতে সশব্দ গা-ঢ় চুমুক... সামান‍্য পজ় আর আবিষ্কারের আনন্দে ইউরেকা বলার মতো, ‘মোল্লার চ্চক’ বলে ওঠা। সেই অভিনয়শৈলীর সঙ্গে সুনিপুণ তাল রেখে উল্টো দিকে সন্তোষ দত্তের নিচু তারের প্রতিক্রিয়া। হতাশা আর শ্লেষের মিশেলে স্বগতোক্তির ঢঙেই বলে ওঠেন, ‘ওই মোল্লার চকেই আমার স্ত্রীর ছ’গাছা চুড়ি চলে গেল।’

দৃশ্যটা বড়জোর মিনিট দুয়েকের! বিয়েবাড়ির গৃহকর্তা ঠান্ডা আপ‍্যায়নে ব‍্যাচ কে ব‍্যাচ অতিথি খাবার টেবিলে বসিয়ে যাচ্ছেন! অতিথি গাণ্ডেপিণ্ডে গিলতে গিলতে আমন্ত্রণকারীর সামনেই এত কিছু আয়োজনের ‘ইনহিউম‍্যান টাস্ক’ নিয়ে মুখর। সন্তোষ দত্ত বৈরাগ‍্যের সুরে প্রভিডেন্ট ফান্ড ভেঙে আর চড়া সুদে ধার করে বিয়ের আয়োজনের কথা বললে, ‘এ সবই অর্থহীন’ বলতে বলতে কালী বাঁড়ুজ্জে সেডিস্ট ভঙ্গিতে দফায় দফায় ছানার পোলাও, দই সাবাড় করে চলেন। তবে বাঙালি বিয়েবাড়ির পরিশীলিত ঠান্ডা যুদ্ধের এমন গপ্পো আছে, যার কাছে ‘হারমোনিয়াম’-এর এই দৃশ্যও তুচ্ছ।

বিশ শতকের গোড়ায় যজ্ঞিবাড়ির সহবতে আপ‍্যায়নকারীর উদ্দেশে চিকন দরাজ প্রশংসার অভাব ছিল না। কিন্তু তাতে মিশে মিছরির ছুরির ফলা। মার্বেল প‍্যালেসের হীরেন মল্লিকের কাছে শোনা গল্প, পাল্টি ঘর মল্লিক, সেন, বড়াল, শেঠ বাড়ির কর্তারা ভোজঘরে ঢুকে বাহবায় সিলিং কাঁপিয়েই দাঁতনখ বার করতেন! খুব ভাল আয়োজন... তুমিই তো করবে? বাউন কোথাকার? দর্জিপাড়া না আহিরীটোলা? দইটা বাগবাজারের ঘোষেদের তো! পোলাওয়ে জাফরান নির্ঘাত পোস্তার? আর বাদামটা হগ মার্কেট? ওই জন‍্যই তো এলুম, দেখলুম বলে তেনারা সরে পড়বেন, একটি দানাও দাঁতে না-কেটে! এই নৃশংস কুটুম্বিতার সামনে জোড়হস্ত আয়োজনকারীরাও সুযোগ এলে এহেন ভদ্রতা ফিরিয়ে দিতেন সুদে আসলেই!

বিয়েবাড়ির যে বিপুল আয়োজন অস্পৃশ্য থাকত, তা না কী, সেই প্রাক্‌-ফ্রিজ যুগে বরফের চ‍্যানেল করা ব্রিস্টলের বড় বড় বাক্সে চালান হত। রসের মিষ্টি ফের রসে ডুবিয়ে সংরক্ষণ চলত। কিন্তু কুচুটে কুটুম কিচ্ছুটি স্পর্শ করবে না বলে আয়োজনের ঘটাপটা কমতির মধ্যে হত, ভাববেন না। মল্লিকদের ঘরে জগন্নাথ। মাংস ঢোকার উপায় নেই। তা বলে আলাপ থেকে সমে পৌঁছনোর মতো সুচারু একটি মেনুর নকশা আর পেশকারি এ আতিথেয়তার জাত চেনাত। কার্পেটের মেঝেয় পুব দিকে মেয়েরা আর পশ্চিমে ছেলেদের লাইন। কলাপাতায় আগে থেকে নুন, পাতিনেবু ছাড়াও লেবুর জলে মজানো আদাকুচি, গোটা মুগ ছড়ানো শসার জারক, ছোট্ট বাটিতে ঘি (বরের বাটিটি রুপোর), ছোলাযোগে লাল শাক, অল্প রসুন মাখা আলু, ঝুরো পোস্ত ছড়ানো আলুভাজা রাখা থাকত। শীতের আনাজযোগে ঘন মুগের ডাল, পেঁয়াজ দিয়ে কাতলার কালিয়া, রুই মাছের মুড়ো এবং সুদৃশ‍্য দাঁড়া বিশিষ্ট চিংড়ির মালাইকারি, জাফরানি পোলাও, কেওড়াগন্ধি জল ছাড়া বেবাড়ির রাত বলে মনেই হবে না! এখানে আবার নারীপুরুষে মধুর বৈষম‍্য। মেয়েরা হাফ মুড়ো পেতেন। তবে তাঁদের জন‍্য বাটি ভরা ক্ষীরে বীজ ছাড়ানো কমলালেবুর স্পেশ্যাল বন্দোবস্ত থাকত। সবার জন‍্য জলপাইয়ের চাটনি, তিন রকমের বাদাম, পেস্তা বিশিষ্ট নতুন গুড়ের পায়েস ছাড়াও চার-পাঁচ রকম মিষ্টি, ফলের দর্শন মিলত।

আজকের কোনও কোনও ভাগ‍্যবান ষাটোর্ধ্বের সম্ভবত বিয়েবাড়ির শেষপাতে গ্রীষ্মে ম‍্যান্ডেটরি বোঁটা ভাঙা, আঠা মোছা নিটোল একটি সুদর্শন আম চাখার স্মৃতিও রয়েছে। আম-মিষ্টি খেতে গিয়ে বেনারসি বা গরদের পাঞ্জাবিতে দুর্ঘটনা ঘটা কেউই গ্রাহ্যি করতেন না। এ গেঁটে বাতের যুগে ফরাস পাতা মেঝেয় খাওয়ার হিড়িক নিয়েও বিস্মিত হই। হাটখোলার দত্তবাড়ির আস্তিক দত্ত বলেন, ষাটের দশকে শুধু ওঁর মেসোমশাই নিউ থিয়েটার্সের সুবিখ‍্যাত বীরেন সরকারের অপারেশন হলে তাঁকে স্পেশ্যাল টেবিলচেয়ারে বসানো হয়।

অতীতের গর্ভ থেকে নানা রত্নরাজি আজকাল সমুদ্রের মতো ফিরিয়ে দেয় ইন্টারনেট। তাতে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রানিমা অমৃতা রায়ের শ্বশুরমশাই সৌরীশচন্দ্র রায়ের আশীর্বাদের মেনুর ফিরিস্তি মিলেছে। সেটা ১৯৪৭ (অগ্রহায়ণ, ১৩৫৪)। ১৩৮ রকম আইটেমে কঙ্কা শাক ভাজা থেকে চার-পাঁচ রকম পায়েস, দই, রাবড়ি, বীরভূমের মোরব্বা, লিমনেড, জিঞ্জারেট থেকে সিগারেট, জোয়ানের আরক মায় স‍্যারিডন, ব্রোমাইড ট‍্যাবলেটেরও ব‍্যবস্থা ছিল। লক্ষণীয়, মাটনের ক্রুকেট পোলাও থেকে রোস্ট, চপ, হাঁড়ি কাবাব, রুই মাছের টিকলি পোলাও-সুদ্ধ মাছের নানা রকম থাকলেও চিকেন তখনও প্রবেশাধিকার পায়নি। শোনা যায়, সত্তরের দশকে এক প্রথিতযশা বঙ্গীয় সাহিত‍্যিকের পরিবারের বিয়েতে বিজলি গ্রিলের ফিশ ওরলি চেখে সে নামের ঠিকুজি-কোষ্ঠী নিয়েই মগ্ন হয়ে পড়েন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তা বাঁধাকপির মির্জাপুরি, বুক ধড়ফড়ি, আলুর জয়হিন্দ, মাংসর হোসেনি কারিদের কথা শুনে আজকের ডাকসাইটে খাদ‍্যবিদেরাও রিসার্চে নামেন।

নকশাল আমলের বিয়েবাড়িতে স্থানীয় ভিখারিদের খাওয়ানোর দাবিতে বোমাবাজির ঘটনাও ‘হারমোনিয়াম’-এ দেখান তপন সিংহ। তবে অতিথি নিয়ন্ত্রণ বিধি শিকেয় তুলে অভ্যাগত, কুটুমকে খাইয়ে ফেল করানোটাই ছিল বড়বাড়ির মোক্ষ। খাইয়েরাও তেমন ছিলেন বটে, কারও পেটেন্ট ডায়ালগ, ‘হেঁটে হেঁটে বাড়ি যাচ্ছি, ধুর মশাই কী খাওয়ালেন!’ রসিক আমন্ত্রণকর্তাও পাল্টা শোনাতেন, ‘আর কী-ই খাবেন, অ‍্যাম্বুল্যান্স ডেকে আনছি, শুয়ে শুয়ে বাড়ি যাবেন!’ শোভাবাজার রাজবাড়ির অলককৃষ্ণ দেবের প্রিয় দাদা বাগওলা বাড়ির সৌরেন্দ্রনারায়ণ দেব (বাবুল) একবার নেমন্তন্নে যাওয়ার আগে চারটে মেগাসাইজ় ক্রিম কাটলেট আর এক কুঁজো মশলা সোডার সরবত খেয়ে নেন। তার পরে বলেন, ‘গুঁড়ো গুঁড়ো খাবার থাক-থাক নেমে গেল! এ বার পরতে পরতে খাব!’

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ব্ল‍্যাকআউটের দিনকালেও ছাদে টেনিস লনের মতো পর্দা টাঙিয়ে বাঙালির ভূরিভোজের দলিল রয়েছে বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’-এ। মধ‍্যবিত্তের টানাটানি বাস্তব। তবে পাঁচ মেয়ের সবার ছোট স্বাতীর মধ‍্যবিত্ত বাবা রাজেনবাবুর সেই আয়োজনে মেয়ের প্রতি গভীর ভালবাসা আর নান্দনিকতার সুরটিও জড়িয়ে। টেবিল, চেয়ার, মাটির থালার আয়োজন। সম্ভবত লেখকের নিজস্ব রুচিবোধ ও অভিলাষটুকুও বাস্তবের সঙ্গে মিশেছে। আজকের বুফে-কেটারিং যুগের সঙ্গে ফারাকটা পাঠকপাঠিকা বুঝে নেবেন। ‘তিথিডোর’-এ কলকাতার বিয়েতে বিক্রমপুরের প্রতাপ ঠাকুরের সেই ১৮ পদ রান্নার আয়োজন নিছকই আড়ম্বর নয়। ‘হারমোনিয়াম’-এ আরও কিলোটাক ছানার পায়েস দিতে পাড়ার পরিবেশনকারীদের গৃহকর্তার হাঁকডাকও আজ দুর্লভ। ইতিহাসের নিয়মেই সে-সবের পাট চুকেছে।

আরও পড়ুন