Food offerings in Kali Puja

কোথাও মা, কোথাও মেয়ে! কালীর ভোগের পাতে তাই থাকে বাটা চিনি থেকে বোয়ালের পদ

Advertisement
রূম্পা দাস ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০২
The variation of bhoga or food offerings to goddess Kali in Kalipuja

বিভিন্ন কালীবাড়ির পুজোয় মায়ের ভোগে বিপুল বৈচিত্র। ছবি: সংগৃহীত।

ঠান্ডার দেশে জন্মেও সব ছেড়েছুড়ে যখন তিনি অন্য ভূগোলে পাড়ি দিয়েছিলেন, জানতেন না একদিন এটাই হয়ে যাবে তাঁর নিজের দেশ। আমৃত্যু কাজ করতে করতে যেমন তিনি চিনেছিলেন নিজেকে, ভারতের সংস্কৃতিকে, তেমন তিনি আবিষ্কার করেছিলেন কালীকেও। ভগিনী নিবেদিতার কাছে তাই কালীর ব্যাখ্যা অন্য রকম। ভারতের নারীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কালীর সত্তাকে তিনি দেখেছিলেন দর্শন এবং যুক্তির আলোকে। সেখানে কালী যেমন ভয় ও ধ্বংসের প্রতীক, তেমন সেই ধ্বংসের মধ্য দিয়েই সৃষ্টিরও প্রতীক কালীই। তাঁকে বোঝা দায়। তাই তাঁর উপাসনা, নৈবেদ্যের রকমসকমও আলাদা।

Advertisement

কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি। কালী পূজিতা হন দীপান্বিতা রূপে। আঁধার থেকে আলোয় উত্তরণের উদ্‌যাপন। সারা রাত জেগে তাঁর পুজো, ভোগ রান্না, নৈবেদ্য সাজানো— সব কিছু নিষ্ঠা আর সমর্পণের কথাই বলে। কালীপুজোর ভোগে এক রকমের নিয়ম নেই। পুজো এবং স্থানবিশেষে কোথাও নিরামিষ, কোথাও আমিষ, কোথাও শুধুই ফল-মিষ্টি সাজিয়ে দেওয়া হয়।

The variation of bhoga or food offerings to goddess Kali in Kalipuja

তারাপীঠে মা তারাকে কালীপুজোর দিন সকালের প্রথম ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় ডাবের জল। ছবি: সংগৃহীত।

কালীর আর এক রূপ তারা। সাধক বামাক্ষ্যাপা নিজেকে অর্পণ করেছিলেন মা তারার চরণতলে। দিনে দিনে বীরভূমের তারাপীঠের স্থানমাহাত্ম্য বেড়েছে। কালীপুজোর দিন সকালের প্রথম ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় ডাবের জল। এর পরে যে অন্নভোগ দেওয়া হয়, তাতে থাকে সাদা ভাত, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি, মাছ, পায়েস, মিষ্টি। শোল মাছ ছাড়া দেবীর নৈবেদ্য অসম্পূর্ণ। তবে সঙ্গে থাকে চারাপোনা, কাতলা, রুইমাছ। অন্নভোগে সাদা ভাতের পাশাপাশি থাকে পোলাও, এমনকি ফ্রায়েড রাইসও। তবে রাতের ভোগ মূলত খিচুড়ি-কেন্দ্রিকই। এক কুইন্টালেরও বেশি পরিমাণ চালের খিচুড়ির সঙ্গে তারাপীঠে মাকে থরে থরে সাজিয়ে দেওয়া হয় ভাজা, তরকারি, শোলমাছ পোড়া, বলি হওয়া পাঁঠার মাংস এবং কারণবারি। তবে তারাপীঠে শুধু মা তারাই নন, শ্মশানকালীর জন্যও রান্না করা হয় ভোগ। শিষ্য বামদেবের সমাধিতে আগে তাঁর জন্য করা বিশেষ ভোগ অর্পণ করা হলে তবেই মা ভোগ গ্রহণ করেন। এমনকি, সাধক বামার প্রিয় কুকুরের স্মরণেও থাকে ভোগের ব্যবস্থা। ডাকিনী-যোগিনীদের জন্যও প্রেতভোগ সাজিয়ে দেওয়া হয়।

শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালী আবার বামা কালী বা মহিষখাগী। যেখানে দক্ষিণাকালিকার ডান পা থাকে শিবের বুকের উপর, এখানে তার ঠিক উল্টো। আগমেশ্বরী কালীর বাঁ পা থাকে মহাদেবের বুকের উপর। সেই থেকেই নাম বামাকালী। শাক্ত ও বৈষ্ণব মতের সংমিশ্রণে এই পুজো। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন পাটখিলান অনুষ্ঠানের পর থেকেই শুরু হয় দেবীর মূর্তি নির্মাণ। এক পক্ষ ধরে মূর্তি গড়ার পরে অমাবস্যার রাতে হয় মায়ের চক্ষুদান। বামাকালীর ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ। ছত্রিশ ব্যঞ্জন ভোগের মধ্যে থাকে কচুশাক, লাল নটেশাক, পালংশাক, বিউলির ডাল, মুগ ডাল। যেহেতু নিরামিষ ভোগ সাজিয়ে দেওয়া হয় মাকে, তাই ব্যঞ্জন ভরে থাকে হরেক সব্জিতে। বিভিন্ন আনাজ দিয়ে শুক্তো, চালকুমড়ো, কচু, বাঁধাকপি, মিষ্টি কুমড়ো, এঁচোড়ের পদের পাশাপাশি পোলাও রান্না করা হয় মায়ের জন্য। চালতা, টম্যাটোর চাটনি ছাড়া থাকে নানা মিষ্টান্ন, ফল, লুচি,পায়েস।

The variation of bhoga or food offerings to goddess Kali in Kalipuja

শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালী আবার বামা কালী বা মহিষখাগী। ছবি: সংগৃহীত।

একই ভাবে নিরামিষ ভোগ পড়ে কলকাতার ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতেও। পর্তুগিজ সাহেব অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির নামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির মূল আকর্ষণ রাবড়ি। ভোগে রান্না করা হয় খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, তরকারি, পোলাও, আলুর দম, ফুলকপির ডালনা, ছানার কোফতা, পনিরের তরকারি। সঙ্গে চাটনি, পাঁপড়, পায়েস, মিষ্টি ছাড়া ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির ভোগ অসম্পূর্ণ। নানা ধর্মের মানুষের অবাধ প্রবেশ মন্দির চত্বরে। কালীপুজোর পরের দিন অন্নকূট সাজিয়ে দেওয়া হয়। এর পর সেই প্রসাদ বিতরণ করা হয় ভক্তদের মাঝে।

The variation of bhoga or food offerings to goddess Kali in Kalipuja

নিরামিষ ভোগ পড়ে কলকাতার ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতেও। ছবি: সংগৃহীত।

কলকাতার কালীঘাট শক্তিপীঠ। মা কালীর সঙ্গে এখানে পূজিতা হন লক্ষ্মীও। অমাবস্যা তিথি শুরু হওয়ার আগে মা কালীর জন্য থাকে বিশেষ ভোগ। তাতে ঘি ভাত, পোলাও, শুক্তো, পাঁচ ভাজা, পোলাওয়ের পাশাপাশি রুই, ইলিশ, চিংড়ির পদ থাকা বাধ্যতামূলক। সঙ্গে থাকে কচি পাঁঠার মাংস। ভোগ খাওয়া শেষে মা গ্রহণ করেন জল। রাতে অবশ্য ভোগ হয় সম্পূর্ণ নিরামিষ। তখন ভোগের থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় লুচি, খিচুড়ি, ভাজা, তরকারি, রাবড়ি, নানা ধরনের মিষ্টি, দই। খড় দিয়ে অলক্ষ্মী গড়ে তাকে বিদায় দেওয়ার পরে ভক্তেরা প্রসাদ পান।

দক্ষিণেশ্বরে মা কালী পূজিতা হন ভবতারিণী রূপে। এই পুজোয় কারণবারি থাকে না। বরং মাকে দেওয়া হয় নারকেলের জল। শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দিরে মা ভবতারিণী কালীপুজোর দিন ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় ভাত, ঘি ভাত, পাঁচ ভাজা, পাঁচ রকমের তরকারি, পাঁচ রকমের মাছ। চাটনি, পায়েসের পাশাপাশি থাকে পাঁচ রকমের মিষ্টিও। সন্ধের শীতলভোগে থাকে নানা রকমের ফল। শ্রীরামকৃষ্ণের করা নিয়ম মেনেই আজও পুজো করা মা ভবতারিণীকে।

শ্রীরামকৃষ্ণের নিয়ম মানা হয় আর এক কালীবাড়িতেও। কুমোরটুলির সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির। রামকৃষ্ণদেব সেখানে আসতেন ডাব আর চিনি সাজিয়ে। তাঁর মতে, মা নাকি অল্পেই সন্তুষ্ট হন। তাই প্রথা মেনে আজও সবচেয়ে আগে সাজিয়ে দেওয়া হয় এই দুই পদ। সারদাদেবী নিয়ম করে আসতেন এই মন্দিরে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ নাটক মঞ্চস্থ করার আগে মা সিদ্ধেশ্বরীর পায়ে ছুঁইয়ে নিয়ে যেতেন নাটকের পাণ্ডুলিপি। সেই মন্দিরে দেবী ভোগ গ্রহণ করেন তিন দফায়। মন্দিরের সেবায়েতের সপ্তম প্রজন্ম চন্দ্রমৌলি মুখোপাধ্যায়ের কথায়, "সকালে দেওয়া হয় বাল্যভোগ। তাতে থাকে চিঁড়ে, দই, ফল, মিষ্টি। এর পরে দুপুরে মূলত ভাত, খিচুড়ি, ডাল, ভাজা, দু’ধরনের মাছের তরকারি, চাটনি, দই, মিষ্টি, পায়েস দেওয়া হয় মাকে।" রুই, কাতলার পাশাপাশি পারসে ছাড়া মায়ের ভোগ যেন অসম্পূর্ণ। রাতের ভোগে এলাহি আয়োজন। ভাত, খিচুড়ি, পোলাও, বিভিন্ন আনাজ ভাজা, আলুর দম, মাছ ভাজা, মাছের ঝোল, মাংস, দই, মিষ্টি থাকেই। বলিও দেওয়া হয়। চন্দ্রমৌলি মুখোপাধ্যায়ের কথায়, "রাত বারোটা না বাজলে পুজো শুরু হয় না। জনবহুল এলাকায় এই কালীবাড়ি। তাই প্রকাশ্যে বলি দেওয়া হয় না। রাত দুটোর পর ভিড় যখন অনেকটাই হালকা হয়ে আসে, তখন পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। আগে বছরে পাঁচ বার বলি দেওয়া হত। ফলহারিণী, দুর্গাষ্টমী, কার্তিক অমাবস্যা, রটন্তী এবং ফুলদোলে। ফলহারিণীতেও বলি দিয়ে মাকে তা অর্পণ করা হত। কিন্তু এখন শুধুমাত্র কালীপুজোতেই বলি হয়। চালকুমড়ো, আখ বলির নিয়মও আছে।’’

আর এক উল্লেখযোগ্য স্থান সেবকেশ্বরী কালী মন্দির। সেবক পাহাড়ে শুরু হয়েছিল এই পুজো। এখানে মায়ের ভোগে দেওয়া হয় সাদা ভাত, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি, পায়েস, লুচি, দই, মিষ্টি। মাছ হিসেবে থাকে বোয়ালের পদ। তা না হলে সেবক কালীবাড়ির পুজোর ভোগ সম্পূর্ণ হয় না।

The variation of bhoga or food offerings to goddess Kali in Kalipuja

উত্তর কলকাতার তারক প্রামাণিক রোডের প্রামাণিকদের কালীবাড়ির পুজো চারশো বছরেরও বেশি পুরনো। ছবি: অর্পিতা প্রামাণিক।

বোলপুরে কোপাই নদীর ধারে কঙ্কালীতলা সতীপীঠের অন্যতম। কালীপুজোর দিন দু’বার ভোগ দেওয়া হয় মাকে। দুপুরে নিরামিষ এবং রাতে আমিষ। নিরামিষ ভোগে থাকে ভাজা, ডাল, অন্ন, তরকারি, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি। আমিষ ভোগে পড়ে নানা ধরনের মাছের পদ।

উত্তর কলকাতার তারক প্রামাণিক রোডের প্রামাণিকদের কালীবাড়ির পুজো চারশো বছরেরও বেশি পুরনো। সিমলে পল্লির কাঁসারিপাড়ার কংসবণিক পরিবারের হাতে শুরু এই পুজোর। ঐতিহাসিক এই পুজোর নিয়ম অন্য সব পুজোর চেয়ে একেবারে আলাদা। কংসবণিক হওয়ার দরুন পরিবারের কেউ ভোগ রান্না করতে পারেন না। প্রামাণিক পরিবারের গৃহকর্ত্রী বন্দনা প্রামাণিকের কথায়, "ব্রাহ্মণ আসেন বাড়িতে ভোগ রান্না করতে। তবে আসলে ভোগ হল বাটা চিনি, ডাবের জল এবং সন্দেশ। যার যেমন সামর্থ্য, তা একটা সন্দেশ হোক অথবা পাঁচটা… ঠাকুর তাতেই খুশি হন। এখানে দেওয়া হয় ফল আর মিষ্টি ভোগ। তবে রান্না করা হয় লুচি এবং পাঁচ রকমের ভাজা। তবে কোনও রান্নাতেই নুন পড়ে না। এটা আমাদের ভোগের বিশেষত্ব।" আগে কালীবাড়িতে বাইশ-তেইশটা করে ছাগবলি হলেও সময়ের দাবি মেনে এখন বন্ধ হয়েছে বলিপ্রথা। তবে চালকুমড়ো বলি হয়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রামাণিক কালীবাড়িতে কালী মা নন, পূজিতা হন মেয়ে রূপে। সেখানে একই সঙ্গে পুজো করা হয় লক্ষ্মী ও নারায়ণকে। বন্দনা প্রামাণিকের কথায়, "দোতলায় থাকেন লক্ষ্মী। মাটির সরার ভিতরে কুনকে। আমরা 'কুনকে লক্ষ্মী' পুজো করি। নারায়ণ যখন ছাতা মাথায় বাড়িতে প্রবেশ করেন, তখন দোতলা থেকে মাথায় করে নামিয়ে আনা হয় লক্ষ্মীকে। মা কালীর পাশে বসিয়ে পুজো শুরু হয় ঠিক রাত দশটায়।" মেয়ে যেমন নিয়ম মেনে বিয়ের পর চলে যায় বাপের বাড়ি ছেড়ে, তেমনই এ বাড়িতেও বিসর্জনের আগে হয় কনকাঞ্জলি প্রথা। বন্দনার কথায়, "আঁচলে চাল নিয়ে ঠাকুরদালানে বসে থাকি। আর ফিরে তাকাই না। মেয়ে চলে গেলে উঠে আসি। আবার অপেক্ষা করে থাকি। আর এক মেয়ে জগদ্ধাত্রীর জন্য।"

Advertisement
আরও পড়ুন