Munsi Premchand

কলম সেপাই

যে জগতের ছবি তিনি পাঠকের সামনে এনেছিলেন, তা রূঢ়, অথচ পরম সত্য। তিনি বুঝেছিলেন, জাতীয়তাবাদ তখনই সার্থক হবে যখন ধর্মীয় পোষণ-তোষণ নয়, অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলির সমাধান পাওয়া যাবে, কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন হবে। প্রেমচন্দর লেখায় ধরা পড়েছে মানব অস্তিত্বের রুক্ষতা।

সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১৫
মুন্সি প্রেমচাঁদ।

মুন্সি প্রেমচাঁদ।

জনা পঁচিশেক লোকের মিছিল, একটি মৃতদেহ কাঁধে করে এগোচ্ছে তারা। মণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে চলেছে। বেলা এগারোটা পেরিয়েছে। ১৯৩৬ সালের ৮ অক্টোবর। ভোরবেলার ঠান্ডা হাওয়ার তেজ তখন কিছু কমেছে, পুরোটা কমেনি। শবযাত্রীদের মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছে আশপাশের জনৈক পথচারী—‘কে মারা গেল?’ উত্তর পেয়ে বলছে, ‘ওহ, সেই স্কুলমাস্টার!’

আসলে, যিনি মারা গিয়েছেন, তিনি তাঁর জীবনের এক বড় অংশ বারাণসীতে কাটানো সত্ত্বেও সে নগরের অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই তিনি ছিলেন অপরিচিত, কয়েকজনের কাছে তাঁর পরিচয় কেবলই স্কুলমাস্টার। প্রায় কেউ-ই আন্দাজ করতে পারেনি যে, সে দিন মাত্র ৫৬ বছর বয়সে, চিরতরে প্রস্থান করলেন ভারতীয় উর্দু ও হিন্দি বা হিন্দুস্থানি সাহিত্যের প্রধানতম নক্ষত্র, প্রেমচন্দ।

শোনা যায়, প্রেমচন্দর প্রয়াণসংবাদ পেয়ে বোলপুরে কবি আলতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘তোমাদের এক রত্ন দেওয়া হয়েছিল, তোমরা তা হারালে!’

প্রেমচন্দের ছিল এক রাহুগ্রস্ত জীবন। নিয়তিতাড়িত এক প্রতিভা সৃষ্টির বিপুল সমারোহ সাজিয়ে, নিজে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেলেন।

বারাণসীর চার মাইল দূরে

লমহি নামে ছোট এক গ্রামে ডাকবিভাগের সাধারণ কর্মী অজায়বলাল শ্রীবাস্তব ও তাঁর স্ত্রী আনন্দীর যখন চতুর্থ সন্তান হল, ১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই, তখন তার নাম রাখা হয় ধনপত রাই শ্রীবাস্তব। ধনপতের কাকা মহাবীর আদর করে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে আরও একটি নাম দিলেন, নবাব।

অজায়বলাল আর আনন্দীর আগে তিনবারই কন্যাসন্তান হয়েছে, তাদের মধ্যে দু’জন অকালমৃত। একজনই বেঁচে, সুগ্গি। সুগ্গির সাত বছর পর ধনপতের জন্ম। স্থানীয় লোকাচার মতে, এই ছেলে ‘তেঁতর’। পরপর তিন মেয়ে বা তিন ছেলের পর যে ছেলে হয়, তাকে বলে তেঁতর। সাধারণত, এ পুত্রসন্তানকে অশুভ ধরা হয়। পিতা বা মাতার কারও একজনের মৃত্যু হয় তার জন্মের পর। এ এক আশ্চর্য যে, ধনপত রাই, যিনি উত্তরকালে ‘প্রেমচন্দ’ নাম গ্রহণ করবেন, সমাজের বহু স্তরের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অক্লান্ত ভাবে লিখে যাবেন, তাঁর নিজের জন্মক্ষণ থেকেই তিনি ছিলেন অশুভচিহ্নিত। আরও আশ্চর্য হল, ধনপতের যখন আট বছর বয়স তখন সত্যিই মারা গেলেন তাঁর মা আনন্দী। কুসংস্কার যেন স্পর্ধা দেখিয়ে ধনপতকে আহ্বান জানাল কোনও অসম এক সংঘর্ষে।

কাজ়াকির কাহিনি

কাজ়াকি ছিল একজন রানার। জাতে পার্সি। সে ডাক আনত ধনপতের বাবার অফিসে, আজ়মগড় তহশিলের ডাক অফিসে তখন অজায়বলাল কর্মরত। দিনের শেষে ডাক এনে, কাজ়াকি সে রাত ওখানেই কাটাত। পরের দিন ভোরে আবার ছুটত। তার অপেক্ষায় থাকত ছোট ধনপত। কারণ, কাজ়াকি কত অদ্ভুত গল্প বলত তাকে— ভূত-প্রেত, ডাইনি থেকে চোর-ডাকাতের সত্যিকারের গল্প। সেই গল্পের ডাকাতরা ছিল এমন সব মানুষ, যারা ধনীর ধন লুঠ করে তা বিলিয়ে দিত গরিবদের মাঝে। কাজ়াকির কাছে গল্প শোনা ছিল তার কাছে এক অন্য ভুবনের ডাক।

একদিন, খুব দেরি হচ্ছিল কাজ়াকির আসতে। সন্ধ্যাশেষে সে অবশেষে এল। সঙ্গে এক অবাক করা উপহার ধনপতের জন্য— জ্যান্ত একটি হরিণশাবক! ধনপত তার নাম রাখল মুন্নু। কিছু দিন পর মুন্নুকে একটা কুকুর তাড়া করে আক্রমণ করে, মেরেও ফেলে! বালক ধনপত যেন তখন থেকেই বুঝতে পারে, নিস্তরঙ্গ, স্থিত-শান্ত জীবন বলে আসলে কিছু হয় না। কোথাও না কোথাও থেকে তরঙ্গ ওঠে। পাল্টে দেয় সব কিছু। সে যখন লেখক হবে, তার বহু গল্পে এ সত্য ঠিকরে বেরিয়ে আসবে শব্দ আর কাগজের ঘেরাটোপ থেকে।

বইয়ের এজেন্ট, বইপোকাও

স্ত্রী আনন্দীর প্রয়াণের দু’বছরের মাথায় অজায়বলাল দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। ধনপতের আশপাশও যেন অতি দ্রুত অচেনা হয়ে ওঠে। নতুন পরিবারতন্ত্র— এক দিকে সৎমা (যাকে ‘চাচি’ বলে ডাকতে শুরু করে ধনপত), অন্য দিকে সৎমায়ের আত্মীয় (বিশেষ করে চাচির ভাই বিজয় বাহাদুর), তাঁদেরই পরিবার বলে গণ্য করা শুরু করতে হয় তাঁকে। তার উপর নিজের পিতাও কর্মসূত্রে সদাভ্রাম্যমাণ, পুত্রকে দেওয়ার মতো সময় তাঁর কাছে নেই।

এই সময়টায় ধনপত হয়তো খানিক বখে যেতেই পারত। কিন্তু না, বইয়ের প্রতি, সাহিত্যের প্রতি তীব্র টান, ভালবাসা তাকে তা হতে দেয়নি। অবসর পেলেই ধনপত পড়ত, গল্প-উপন্যাস যা পেত হাতের কাছে। সমসাময়িক উর্দু ভাষার তাবড় লেখকদের রচনা তো বটেই, মৌলানা ফয়জ়ির লেখা তিলিজ়ম-এ-হোশরুবা-র মতো বিপুলায়তন কাহিনিসঙ্কলন, সংস্কৃত ভাষায় রচিত পুরাণগুলির উর্দু অনুবাদ, ব্রিটিশ লেখক জর্জ ডব্লিউ এম রেনল্ডস-এর ‘দ্য মিস্ট্রিজ় অফ লন্ডন’— এমন সব বিচিত্র পাঠপৃথিবীতে আবিষ্ট হয়ে পড়ে ধনপত। শুধু উপন্যাসই শ’খানেকের বেশি পড়ে ফেলেছিল সে দু’তিন বছরের মধ্যে!

তার বই সংগ্রহর ঘটনাও স্মরণীয়। অজায়বলাল কর্মসূত্রে তখন গোরখপুরে। সেখানেই ধনপতের পড়াশোনা শুরু হয় স্থানীয় রাওয়াত পাঠশালায়। তার আগে লমহির কাছে লালপুরে এক মৌলবির কাছে উর্দু আর ফারসি ভাষা শিখেছিল ধনপত। নতুন পাঠশালায় এসে ওই দুই ভাষার সঙ্গে শিখতে শুরু করে ইংরেজি। পরে গোরখপুর শহরের মিশন স্কুলে ভর্তি হয় ধনপত। তার সামনে তখন উন্মুক্ত হয়ে পড়ে দেশি-বিদেশি ভাষা ও সাহিত্যের সৌন্দর্য।

গোরখপুরেই একজন বইবিক্রেতা ছিল। নাম, বুদ্ধিলাল। ধনপত তার দোকানেই বই পড়তে নিত। কেনার ক্ষমতা ছিল না। বুদ্ধিলালের বইয়ের দোকানে পাওয়া যেত নানা প্রকারের নোটস, ‘কি বুকস’ বলে যা বেশি পরিচিত ছিল। বুদ্ধিলাল শর্ত রেখেছিল, ধনপতকে ও সব ‘কি’ বই তার স্কুলের সহপাঠী-ছাত্রদের কাছে বিক্রি করতে হবে। পরিবর্তে ধনপত পড়তে পারবে দোকানের যাবতীয় সাহিত্যের বই। ব্যস, শর্ত লুফে নিয়ে বুদ্ধিলালের এজেন্ট হয়ে যায় সে, একই সঙ্গে হয়ে ওঠে সাঙ্ঘাতিক বইপোকা।

পিতা-পুত্র

অজায়বলালের সঙ্গে ধনপতের এক ধরনের দূরত্ব ছিল। প্রথমত, কাজের চাপে পিতা তাকে সময়ই দিতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, ধনপতের মায়ের মৃত্যুর পর পিতার দ্বিতীয় বিবাহ। দূরত্ব রীতিমতো বিরক্তিতে পরিণত হয়েছিল অন্য দু’টি ঘটনায়।

প্রথম ঘটনা— গ্রামে রামলীলা হবে। পিতার সঙ্গে উপস্থিত ধনপত। মূল অনুষ্ঠানের শেষে, রাত দশটার পর, সংগঠকদের একজন আয়োজন করল নৃত্য পরিবেশনের। আবড়িজান নামে এক নর্তকী নাচবে। আবড়িজান কুখ্যাত (বা বিখ্যাত) তার অতি উত্তেজক অঙ্গভঙ্গির জন্য। ধনপত ভেবেছিল, বাবা হয়তো উঠে যাবেন। অজায়বলাল ওঠেননি। আবড়িজানের নাচ শুরু হয়। এক-একজনের হাত ধরছে আবড়িজান, তার স্বতন্ত্র ভঙ্গিমায় শরীরী সংযোগ করছে সে-দর্শকের সঙ্গে। দর্শকটিও তাকে পাঁচ টাকা দিয়ে দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে। অজায়বলালের কাছে এসে, তাঁর হাত ধরেও একই জিনিস করল নর্তকী। সকলেই ভাবছে, এই রে, এ ভুল লোককে ধরল! কিন্তু না, অজায়বলাল সকলকে ও তাঁর পুত্রকে চমকে দিয়ে পকেট থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা আবড়িজানকে উপহার দিলেন! ধনপত বিশ্বাসই করতে পারছিল না নিজের চোখকে— ‘বাবার মুখে এমন এক আনন্দের ছটা ছিল যেন হাতিম তাইকে হারিয়ে দিয়েছেন... আমি যদি ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী না হতাম, তা হলে হয়তো অন্য কেউ বললে আমি বিশ্বাসও করতাম না’। ঘটনাক্রম এখানেই শেষ নয়।

পরের দিন সকালে ধনপত দেখল, রামলীলার অভিনেতাদের কোনও টাকাপয়সা দেওয়া হয়নি। কেউ তাদের কোনও দক্ষিণা দিতে রাজি নয়। ধনপত পিতার কাছে টাকা চাইতে যায় এই ভেবে যে, একজন নর্তকীকে তিনি যদি স্বর্ণমুদ্রা দিতে পারেন, গরিব কয়েকজন রামলীলা শিল্পীর জন্য অন্তত দু’টাকা তিনি নিশ্চয়ই দেবেন। কিন্তু সে টাকা অজায়বলালের কাছে চাইতে ভর্ৎসিতই হল ধনপত। উপায়ান্তর না পেয়ে, নিজের জমানো দু’আনা নিয়েই সে গিয়েছিল রামলীলার এক অভিনেতাকে দেওয়ার জন্য।

দ্বিতীয় ঘটনা— ধনপতের যখন পনেরো বছর বয়স, নবম শ্রেণির ছাত্র সে, সে সময় অজায়বলাল উঠে পড়ে লাগলেন পুত্রের বিবাহ দেওয়ার জন্য। দ্রুত পাত্রীও ঠিক হয়ে গেল, তাঁর দ্বিতীয় শ্বশুরমশায়ের পরিচিত একজনের কন্যা। বড়দের কথা শুনে ধনপত বিয়েও করলেন। ‘স্ত্রী’ নিয়ে তার নিজস্ব ভাবনা-কল্পনায় এক সুন্দর চিত্র ছিল। সে চিত্র ভেঙেচুরে গেল যখন ফুলশয্যার রাতে প্রথম বধূদর্শন হল। ধনপত মুষড়ে পড়ল, অসম্ভব বিরক্ত হল— এ কী! এমন কুদর্শন নারীকে কী করে তাঁর স্ত্রী করে আনল তাঁর নিজের পরিবার!

দশ বছর এই নারীর (যার নাম ইতিহাস মনে রাখেনি) সঙ্গেই থাকবে ধনপত। সাংসারিক জীবনে অসুখী হয়ে, স্ত্রীর সঙ্গে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে। অন্য দিকে, সৎ মায়ের সঙ্গে তার স্ত্রীর বচসা লেগেই থাকত। একদিন অশান্তি এমনই চরমে উঠল যে, স্ত্রী আত্মহত্যায় উদ্যত হল। আত্মহত্যা থেকে তাকে নিবৃত্ত করা গেলেও বাড়ি ছাড়া থেকে করা যায়নি। ধনপতও বোধহয় তা-ই চাইছিল। সেই যে তাঁর স্ত্রী নিজের পিতৃগৃহে চলে গিয়েছিল, আর ফেরেনি। ফেরানোর চেষ্টাও করেনি ধনপত। তার পিতা তত দিনে মারা গিয়েছেন। পুত্রবধূ হতাশ করেছিল অজায়বলালকেও, পুত্রের দুর্দশার জন্য নিজেকে ও নিজের স্ত্রীকে দোষারোপ করতেন। অনেকের মতে, পুত্রের বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে অজায়বলালের মৃত্যুর নেপথ্যে ছিল এই ভগ্ন মনই।

ধনপত দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছিল তার প্রথম স্ত্রীর গৃহত্যাগের কিছু পরেই, ১৯০৬ সালে। এ বারে নিজে দেখেশুনে। এবং, নিজের শর্ত অনুযায়ী একজন বাল্য বিধবা— শিবরানি দেবীকে। আমৃত্যু শিবরানির সঙ্গেই কাটাবে ধনপত। এক কন্যা ও দুই পুত্রের পিতাও হবে সে।

কর্মভূমি

গোরখপুরের মিশন স্কুল থেকে বারাণসীর কুইনস কলেজিয়েট স্কুলে আসে ধনপত। সেখান থেকে এনট্রান্স পাশ করে দ্বিতীয় বিভাগে। নানা কারণে উচ্চশিক্ষায় ছেদ পড়ে। অগত্যা ধনপত কাশীতেই প্রাইভেট টিউশনের কাজ নেয় পাঁচ টাকা মাইনেতে। গ্রাসাচ্ছাদন কোনও রকমে চললেও, স্থানীয় লাইব্রেরিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পড়াশোনা করতে থাকে সে। এক সময়ে আর পারে না। অভাবের তাড়নায় নিজের বইপত্র বিক্রি করতে যায় দোকানে। দোকান থেকে বেরোনোর সময় এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তার সঙ্গে কথাবার্তার পর ধনপতকে চুনারে মিশনারি স্কুলে শিক্ষকের চাকরি দেন তিনি। সে চাকরি বেশি দিন টেকেনি, এক মুসলিম সহকর্মীর প্রতি স্কুল কর্তৃপক্ষর অব্যবহারের প্রতিবাদের কারণে। এর পর ধনপতের চাকরি হয় বহরাইচের সরকারি স্কুলে। তার পর টিচার্স ট্রেনিং পরীক্ষা ইত্যাদি পাশ করে ইলাহাবাদ মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয় সে। একাধিক স্কুলে শিক্ষকতা করে ধনপত রাই, স্কুল ইনস্পেক্টরও হয়। তার যে সরকারি চাকরিজীবন শুরু হয়, তা স্থায়ী হয়েছিল কুড়ি বছর। যদিও ধনপত উত্তরোত্তর পড়াশোনা করবে, মূলত চাকরির কথা মাথায় রেখেই— ১৯১৬ সালে ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রি-ইউনিভার্সিটি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে সে। তার তিন বছর পর, ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইংরেজি সাহিত্য, ফারসি ভাষা ও ইতিহাস নিয়ে বিএ পাশ করে ধনপত।

প্রেমচন্দর জন্ম

কানপুরে শিক্ষকতার সময়েই পাকাপাকি ভাবে সূচনা হয় ধনপতের সাহিত্যজীবনের। তার আগে উর্দু ভাষায় একটি ছোট উপন্যাস লিখেছিল, নাম আসরার-এ-মা’আবিদ। এর পর, উর্দু ভাষার সে সময়ের অন্যতম সুপরিচিত পত্রিকা জ়মানা গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ হয় ধনপতের। পরিচয় ঘটে পত্রিকার সম্পাদক দয়ানারায়ণ নিগমের সঙ্গেও, হয় গাঢ় বন্ধুত্ব। দয়ানারায়ণের সঙ্গে বন্ধুত্ব ধনপতের জীবনের এক স্তম্ভের মতো হয়ে থাকবে আগামী দিনে।

ধনপতের দ্বিতীয় উপন্যাস হমখুরমা-ও-হমসাওয়াব (হিন্দি ভাষায় যা পরে প্রেমা নামে প্রকাশিত) প্রকাশ পায় জ়মানা-তে। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় ধনপতের প্রথম আলোড়ন-তোলা ছোট গল্প ‘দুনিয়া কা সবসে অনমোল রতন’। ধনপত তখন লিখতেন ‘নবাব রাই’ নামে। ১৯০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে উক্ত গল্প-সহ ধনপতের অন্য পাঁচটি উর্দু ছোটগল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় সঙ্কলন সোজ়-এ-ওয়াতন। এই বইটিই চিরতরে পাল্টে দেবে ধনপতকে। বইটি প্রকাশের কিছু সময় আগে মজঃফরপুর জেলে ফাঁসি হয়েছে বাংলার ১৭ বছরের কিশোর ক্ষুদিরাম বসুর। ধনপতের কাছে এ ঘটনার অভিঘাত ছিল প্রবল। সরকারি চাকুরে হওয়া সত্ত্বেও সে ক্ষুদিরামের একটি ছবি কিনে এনে টাঙিয়ে রাখে নিজের ঘরে।

সোজ়-এ-ওয়াতন-এর গল্পগুলিতে ছিল ধনপতের একান্ত উপনিবেশ বিরোধিতা ও স্বাধীনতাকামী চেতনার প্রজ্জ্বলন। সরকারের দৃষ্টি এড়িয়ে তা বেশি দিন থাকতেও পারেনি তাই। প্রকাশের বছরখানেক পর, একদিন রাতে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিস থেকে ডাক আসল ধনপতের। সে গিয়ে দেখল, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের টেবিলে রাখা সোজ়-এ-ওয়াতন-এর একটি কপি। ধনপতকে দেখেই সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনিই তো এ বই লিখেছেন?’

ধনপত বুঝে যায়, নবাব রাই যে সে, এ-কথা ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ধরে ফেলেছে। ধনপত তাই আর রাখঢাক না-করেই বলল, ‘হ্যাঁ আমিই এর লেখক’। সাহেব বললেন, ‘মোগল আমলে জন্মে এই সব লিখলে ওরা আপনার দুটো হাত কেটে নিত! আপনার ভাগ্য ভাল আপনি ইংরেজ সাম্রাজ্যে বাস করছেন। আপনার বইটি সিডিশনে পূর্ণ, ইংরেজ-বিরোধী।’ বইটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সাহেব আরও নির্দেশ দেন, বইয়ের সমস্ত কপি জমা করে যেতে হবে এবং ভবিষ্যতে সাহেবের অনুমতি ছাড়া ধনপত রাই যেন আর না-লেখে। সোজ়-এ-ওয়াতন হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। তিনশোর মতো বিক্রি হয়েছিল। ধনপত বাকি সাতশো কপি সাহেবের কাছে জমা করে আসে।

কিন্তু লেখা তো থামবে না। উপায় কী? ‘নবাব রাইকে সমাধিস্থ করতে হবে... খুঁজতে হবে তার উত্তরাধিকার’— দয়ানারায়ণকে লিখছিল ধনপত। উপায় বার করলেন দয়ানারায়ণই। বললেন, লেখো ‘প্রেমচন্দ’ ছদ্মনামে। ধনপতও লিখল, ‘প্রেমচন্দ নামটা ভাল। আমার ভাল লেগেছে’। সেই জন্ম হল প্রেমচন্দর। ধনপত রাই শ্রীবাস্তব সেই থেকে হয়ে উঠলেন ‘প্রেমচন্দ’। ১৯১০ সালে প্রেমচন্দ নামে প্রকাশিত হল প্রথম ছোটগল্প ‘বড়ে ঘর কি বেটি’।

আর ফিরে তাকাননি প্রেমচন্দ। অক্লান্ত ভাবে লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ। একের পর এক প্রকাশিত হয়েছে সেবাসদন (১৯১৮), রঙ্গভূমি (১৯২৫), কায়াকল্প (১৯২৬), গবন (১৯৩১), কর্মভূমি (১৯৩২), গোদান (১৯৩৬)-এর মতো বিখ্যাত সব উপন্যাস। তিনশোর কাছাকাছি ছোটগল্প লিখেছেন, যার মধ্যে বহু গল্প আজও অবিস্মরণীয়। হিন্দি বা উর্দুতে লেখা হলেও সে সব গল্প-উপন্যাসের আবেদন এমনই সর্বভারতীয় যে, একদিকে দক্ষিণী সিনেমার কে সুব্রহ্মণ্যম নির্মাণ করেছেন সেবাসদন (১৯৩৮), রাজকুমার-শশিকলাকে নিয়ে বলিউড তৈরি করেছে গোদান (১৯৬৩), বাঙালির দুই আইকন— সত্যজিৎ রায় করেছেন শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭), সদগতি (১৯৮১); মৃণাল সেন করেছেন ওড়িয়া ছবি ওকা উরি কথা (১৯৭৭) প্রেমচন্দর ‘কফন’ ছোটগল্প অবলম্বনে। আবার প্রেমচন্দর একাধিক গল্প নিয়ে ২৬ এপিসোডের টেলিসিরিজ় (২০০৪) নির্মাণ করেছিলেন কবি-পরিচালক গুলজ়ার।

এক সময়ে অর্থের তাড়নাতেই প্রেমচন্দ বম্বের চলচ্চিত্রজগতে— অজন্তা সিনেটোন ফিল্ম কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন। শর্ত, বছরে আট হাজার টাকা তাঁকে দেওয়া হবে চার-পাঁচটি চিত্রনাট্যের বিনিময়ে। একটিই ছবি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত, মজদুর (১৯৩৪)। প্রেমচন্দ বম্বের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। কন্ট্র্যাক্ট ফুরোনোর তিন মাস আগেই ছেড়ে চলে এসেছিলেন— ‘সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের জন্য সিনেমা সঠিক জায়গা নয়। আমি সাহিত্যে ফিরছি আবার’।

অভিযুক্ত

প্রেমচন্দর সাহিত্যজীবন যে সব সময় সুললিত থেকেছে, এমনটা নয়। তাঁর রচনা পাঠক ও সমালোচক, উভয়েরই সমাদর পেয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে এসেছিল কঠোর সমালোচনা। এবং প্লেজিয়ারিজ়ম বা কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগও! অওয়ধ উপাধ্যায় নামে জনৈক গণিত-শিক্ষক কয়েকটি প্রবন্ধের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে, ‘রঙ্গভূমি’ উপন্যাসটি আসলে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক উইলিয়ম মেকপিস থ্যাকারে-র বিখ্যাত রচনা ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ টুকে লেখা, ‘প্রেমাশ্রম’-এর উৎস টলস্টয়-এর ‘রেজ়ারেকশন’, ‘কায়াকল্প’ উপন্যাস ও ‘বিশ্বাস’ শীর্ষক ছোটগল্প ব্রিটিশ লেখক হল কেন-এর ‘দি ইটার্নাল সিটি’ দ্বারা অনুপ্রাণিত। অন্য এক জায়গা থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল ‘আভূষণ’ গল্পটির নেপথ্যে আছে টমাস হার্ডির একটি ছোটগল্প। এমনকি, জ়মানা-য় উর্দু ভাষায় প্রেমচন্দর একটি প্রবন্ধও আসলে মরাঠি ভাষায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধের অনুবাদমাত্র!

থ্যাকারে, টলস্টয়, হল কেন দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার অভিযোগ প্রেমচন্দ উড়িয়ে দিলেও ওড়াতে পারেননি হার্ডির গল্পের সঙ্গে তাঁর গল্পের সাদৃশ্য। বলেছিলেন, হতেই পারে যে, দুই লেখক একই পর্যবেক্ষণ করেছেন স্বতন্ত্র ভাবে। ওড়াতে পারেননি প্রবন্ধের সাদৃশ্যর অভিযোগও। তাঁর উত্তর ছিল, জ়মানা-র সম্পাদককে জানিয়েই তিনি তা লিখেছিলেন।

জাতীয়তাবাদ, ভাষা

বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, গ্যারিবল্ডি, মাতসিনি-র অনুরাগী প্রেমচন্দপ্রথম দিকে সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে মোহনদাস কর্মচন্দ গান্ধীর আগমনের পর থেকে গান্ধীবাদী আদর্শই তাঁকে প্রাণিত করতে থাকে। বলশেভিজ়মের প্রতি তাঁর পরোক্ষ সমর্থন যদিও রয়েই গিয়েছিল। সম্পত্তিকে তিনি ঘৃণা করতেন, ধনদেবী লক্ষ্মীর প্রতি ছিল তাঁর চরম বীতরাগ। লিখেছিলেন, ‘লক্ষ্মী দেবী নন, ডাইনি’। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছিলেন প্রেমচন্দ। ইস্তফা দিয়ে যে খুব সচ্ছল ভাবে বাঁচতে পারছিলেন, তা নয়। নিদারুণ অর্থাভাব জেঁকে বসেছিল। চরকা বিক্রি করেছিলেন কয়েকদিন। তাঁর অদম্য ইচ্ছে ছিল একটি স্বাধীন প্রেস কিনে চালানোর। সে ইচ্ছের বশেই কিনেছিলেন রুগ্‌ণ সরস্বতী প্রেস। প্রায় একই সঙ্গেজাগরণ ও হংস শীর্ষক দু’টি পত্রিকা প্রকাশও শুরু করেন। দু’টি পত্রিকাই তাঁকে আরও জেরবার করে দেয়।তাও, তিনি থামতে জানতেন না সারস্বত সাধনায়। তাঁর কাছে সারস্বতচর্চাই একাধারে ছিল প্রকৃত শিল্পীর সাধনা, প্রকৃত দেশপ্রেমিকের দেশব্রত ও একজন জাতীয়তাবাদীর জাতীয়তাবাদ। প্রেমচন্দ-পুত্র অমৃত রাই পিতাকে যথার্থ আখ্যা দিয়েছিলেন— ‘কলম সেপাই’।

একটা সময় ছিল যখন প্রেমচন্দ কিছুটা আর্য সমাজের প্রভাবে তৎকালীন মতানুযায়ী হিন্দুবাদী হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর লেখার ভাষা উর্দু না হিন্দি হবে, এই নিয়েও আজীবন দ্বন্দ্বে থেকেছিলেন প্রেমচন্দ। কোনও হিন্দু উর্দু ভাষায় লিখে নাম করতে পারেননি, এ ছিল তাঁর অবস্থান। আবার উর্দুতে লিখলে যা অর্থ পেতেন, তার চেয়ে বেশি পেতেন হিন্দি ভাষায় লিখলে। স্বাধীন ভারতীয় রাষ্ট্র প্রেমচন্দ দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু বারবার বলেছেন ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজির সামনে একমাত্র রুখে দাঁড়াতে পারে সর্বভারতমান্য কোনও ভাষা, যা তাঁর মতে, হিন্দুস্থানিই।

উর্দুকে তিনি ছাড়তে পারেননি, হিন্দিকেও যেন ঠিক আপন করে নিতে পারেননি। একটি ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি সারাজীবন উর্দুর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি... কায়স্থসন্তান হওয়ায় শৈশবে প্রথমে ফারসিই শিখেছি, তাই হিন্দির চেয়ে উর্দুতেই আমি বেশি স্বচ্ছন্দ।’

অমলিন

সাহিত্যে তিনি চেয়েছিলেন পৌরুষের প্রকাশ। প্রেমচন্দ তাই ভীষণ অপছন্দ করতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। বিশ্বভারতীর হিন্দি ভাষার শিক্ষক হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী একাধিকবার অনুরোধ করেছিলেন প্রেমচন্দকে শান্তিনিকেতনে আসার জন্য। এলে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারও সম্ভব হত। প্রেমচন্দ একবারও যাননি। উল্টে হজারীপ্রসাদকে সোজাসাপ্টা লিখেছিলেন, ‘ওখানে কোনও আকর্ষণ আমি পাই না’।

প্রেমচন্দ চেয়েছিলেন হিন্দি সাহিত্য খুঁজে পাক তার নিজস্বতা, রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রর অক্ষম অনুসরণ করতে যেন না হয়। নিজের সাহিত্যেও নিয়ে এসেছিলেন কাঠিন্য, রুক্ষতা, সামাজিক-অর্থনৈতিক রুক্ষতা, মানব অস্তিত্বের রুক্ষতা। বিখ্যাত হিন্দি কবি-গীতিকার ফিরাক গোরখপুরি একবার বলেছিলেন, প্রেমচন্দ উর্দু ভাষায় প্রেমের কাব্যমাধুর্য্য ধরতেই পারেননি।

তা হয়তো ধরার ইচ্ছেও ছিল না প্রেমচন্দর। তিনি যে জগতের ছবি পাঠকের সামনে এনেছিলেন, তা রূঢ়, অথচ পরম সত্য। তিনি বুঝেছিলেন, জাতীয়তাবাদ তখনই সার্থক হবে যখন ধর্মীয় পোষণ-তোষণ নয়, অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলির সমাধান পাওয়া যাবে, কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন হবে। প্রেমচন্দর সৃজিত চরিত্ররা আজও ভারতের সুবিশাল ভূমিতে ঘুরে বেড়ায়, আমাদের তাড়া করে ফেরে।

প্রয়াণ

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় থেকেই প্রেমচন্দ পেটের অসুখে ভুগতে থাকেন। উদরসমস্যা তাঁকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তোলে। দোসর ছিল অবসাদ, মানসিক অস্থিতি। ৫৬ বছর বয়সে প্রেমচন্দ প্রয়াত হন সিরোসিস অফ লিভারে আক্রান্ত হয়ে। ১৯৩৬-এর ৮ অক্টোবর মণিকর্নিকা ঘাটে যাঁর দেহ ভস্মীভূত হয়েছিল, তিনি নিছক স্কুলমাস্টার ছিলেন না, ছিলেন নিজেই এক প্রতিষ্ঠান।

ঋণ:

প্রেমচন্দ: হিজ় লাইফ অ্যান্ড টাইমস, অমৃত রাই, অনুবাদ: হরিশ ত্রিবেদী, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস; মাই লাইফ অ্যান্ড টাইমস: অ্যান অটোবায়োগ্রাফিকাল ন্যারেটিভ, প্রেমচন্দ, সম্পাদনা: মদন গোপাল, রোলি বুকস; মুনশি প্রেমচন্দ: দ্য ভয়েস অফ ট্রুথ, অনুপা লাল, রূপা অ্যান্ড কং; নির্বাচিত গল্পসংগ্রহ, প্রেমচন্দ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি; কমপ্লিট শর্ট স্টোরিজ়, চার খণ্ড, প্রেমচন্দ, সম্পাদনা: এম আসাউদ্দিন, পেঙ্গুইন; প্রেমচন্দের অন্যান্য উপন্যাসের ইংরেজি সংস্করণ

আরও পড়ুন