বিয়েতে লোকবল কম? চাইলেই আত্মীয় থেকে পিঁড়ি ধরার সদস্য ভাড়ায় মিলবে সবই। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
মেয়ের বিয়েতে আত্মীয়স্বজন কম থাকলে যদি পাত্রপক্ষের বাড়ির লোক অসন্তুষ্ট হন? মেয়ের মন ভার হয়? বিয়ের আনুষঙ্গিক বিষয়ের চেয়ে এমন চিন্তা ত্রস্ত করে ফেলেছিল এক বাবাকে। কিন্তু চাইলে কী না পাওয়া যায়! মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ধুমধাম করে, ‘ভাড়া’ করা আত্মীয় নিয়েই।
আত্মীয় থেকে ভাই, এমনকি বিয়ের কাজে সাহায্য করার জন্য এয়োস্ত্রী— ভাড়ায় মেলে সবই। আর তাঁদের নিয়েই বসতে পারে জমজমাটি বিয়ের আসর।
এই সব কিন্তু গল্পকথা মোটেই নয়। বাড়িতে লোকবল কম? কনের পিঁড়ি ধরার ভাই থেকে হলুদ কোটার লোক, নিয়ম পালনের জন্য এয়োস্ত্রী— সবই এখন চাইলেই মিলবে। বিয়ের কেনাকাটা করার লোক নেই? মুখ ফুটে বললেই হাজির হয়ে যাবে। নিয়ে যাবে যে দোকানে আধুনিক সব জিনিসপত্র মেলে। কনের গাউন ধরা থেকে, বরের ছোটখাটো দরকার মেটানো, ব্যস্ত সময়ে ফোন ধরা— মিলবে এমন ছায়াসঙ্গীও। শুধু গ্যাঁটের কড়ি খসাতে হবে বিয়ের জন্য।
একসময় বিয়ে মানে ছিল ভিয়েন, সানাই। পাতে থাকত লুচি, মন্ডা-মিঠাই। কিন্তু আগেকার সেই চেনা ছবি পাল্টে গিয়েছে কবেই। বিয়ে এখন কার্যত চিত্রনাট্যের মতোই, বলছিলেন কলকাতার বিয়ে পরিকল্পক প্রিয়াঞ্জনা চৌধুরী।
গত কয়েক দশকে যেমন বিয়ের অনুষ্ঠানে-ভাবনায় বদল এসেছে, তেমনই বিয়ের জাঁকজমক বদলে গিয়েছে সম্পূর্ণ ভাবে। এখন বর আসেন ভিনটেজ কারে, বধূ সাত পাক ঘোরেন পালকিতে, এমনকি শ্বশুরবাড়িতে বধূবরণেও থাকে আলাদা রকম জাঁকজমক, সব কিছুতেই থাকে সিনেম্যাটিক ছোঁয়া।
এয়োস্ত্রী মিলবে ডাক পড়লেই!
বিয়ের কাজের জন্য এয়োস্ত্রী-ও জোগাড় হয়ে যায় এখন। ছবি:সংগৃহীত।
বাঙালি বিয়েতে নানা রকম আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য বিবাহিতাদেরই ডাক পড়ে। কিন্তু এখন সংসার ছোট হচ্ছে। পরিজন থাকেন এক জায়গায়, বিয়ে হয় অন্যত্র। তা ছাড়া, আত্মীয়েরাও সময়মতো আসতে পারেন না। ফলে অভাব হয় এয়োস্ত্রীদের। সেই সমস্যার সমাধানও করে দিচ্ছেন বিয়ের অনুষ্ঠান পরিকল্পনাকারীরা। কী দরকার, শুধু মুখের কথা খসার অপেক্ষা, সব ব্যবস্থা পাকা করে দেবেন আয়োজকেরা।
পিঁড়ি ধরার ভাই
ভাড়ায় মিলবে পিঁড়ি ধরার ভাইও! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
বাঙালি বিয়েতে পিঁড়িতে করে কনেকে সাত পাক ঘোরানো হয়। পিঁড়ি ধরেন কনের ভাই, জামাইবাবুরা। কিন্তু লোকবল কমে আসায়, এই কাজেও লোকের অভাব হয়। কলকাতার একটি বিবাহ পরিকল্পনাকারী সংস্থার তরফে রেহান ইমাম ওয়ারিস জানালেন, তাঁরা খুঁটিনাটি সব বন্দোবস্ত করে দেন। কেউ যদি বলেন, পিঁড়ি ধরার লোক চাই, ক’জন লোক চাই, তাঁরা সব আয়োজন করে দেবেন। যাঁরা কনের পিঁড়ি ধরবেন, বাড়ির লোক যদি চান তাঁদের সাজসজ্জাও বিয়ের অনুষ্ঠানের উপযোগী হবে, সে ব্যবস্থাও হয়ে যায়।
কিন্তু তা বলে ভাড়া করা আত্মীয়?
বন্ধুবান্ধব থেকে আত্মীয়, কম পড়লেও জোগাড় হয়ে যাবেই। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
বিয়েবাড়িতে লোক নেই বলে আত্মীয় ভাড়া! এমনই অভিজ্ঞতার গল্প শোনাচ্ছিলেন প্রিয়াঞ্জনা। বিয়েতে তাঁদের কাছ থেকে পরিষেবা নেওয়া এক পরিবার জানিয়েছিল, তাঁদের আত্মীয়েরা বিশেষ কারণে দেশের বাড়ি থেকে আসতে পারছেন না। কলকাতায় বিয়ে, অথচ বাড়িতে তেমন লোক নেই। কনের বাবার মনে হয়েছিল, এই অভাবটুকু যদি পূরণ হয়। পাত্রপক্ষের সামনে তিনিও দেখাতে চেয়েছিলেন তাঁদের লোকজনকে। ভেবেছিলেন মেয়ের মনখারাপের কথাও। এমন চাহিদা শুনেই প্রিয়াঞ্জনা বিয়েতে হাজির হয়েছিলেন তাঁদেরই বন্ধুবান্ধবের দল নিয়ে। ধুমধাম করেই বিয়ে হয়। পাত পেড়ে ভূরিভোজও হয়। আর অজানা 'আত্মীয়েরা’ কখন যেন আত্মীয়তার বন্ধনেই বাঁধা পড়েন।
চমকপ্রদ প্রবেশ
আমন্ত্রিতদের সামনে বর-কনের আসার জন্যও থাকে রাজকীয় উপস্থাপনা। ছবি:সংগৃহীত।
বিয়েবাড়িতে বর নিয়েই মাতামাতি হয় বেশি! থাকে বরণ, মিষ্টি খাওয়ানো, বেশ কিছু প্রথা। তবে এখন বউভাতের অনুষ্ঠানে থাকে বর-কনের চটকদার প্রবেশ। বিশাল স্টেজে রাজকীয় পোশাকে হাতে হাত ধরে আসেন নতুন বর-বউ। আকাশ জুড়ে তৈরি হয় বাজির রোশনাই। স্টেজে ওঠার আগে জ্বলে ওঠে তুবড়ি। বিয়ের পরিকল্পকেরা বলছিলেন, আগে যা ছিল নিতান্তই প্রথা, নিয়মকানুন, সেখানেই এখন জুড়েছে চাকচিক্য। অবাঙালিদের বিয়েতে এই সব বেশি দেখা যায় ঠিকই, বাঙালি বিয়েতেও এখন তা মোটেই অলভ্য নয়।
ঘোড়া-হাতিও চাইলে মেলে
চাইলে বর আসতে পারে হাতির পিঠেও! এমনও কিন্তু হয় আজকাল।
ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে আসবে বর, ভারতে কোনও কোনও রাজ্যে বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন প্রথা রয়েছে। কিন্তু তা বলে হাতি! কলকাতার একটি নামী ক্যাটারিং এবং বিবাহ পরিকল্পনাকারী সংস্থার তরফে আরণ্যক ঘোষের সঙ্গে কখা বলে জানা গেল, গত কয়েক বছরে বিয়ে নিয়ে ভাবনায় অনেক বদল এসেছে। খাওয়ার থেকে বিয়ের পরিকল্পনা— নানা মানুষের নানা মত, চাহিদা। এক বার কাজের সূত্রে কলকাতার বাইরের একটি বিয়েবাড়িতে বর আনার জন্য হাতির ব্যবস্থাও করে দিতে হয়েছিল। বরযাত্রী বসার জায়গা থেকে অতিথি আপ্যায়নে সব কিছুতেই এখন মানুষ অভিনবত্ব খোঁজেন। নতুন নতুন ধারণা দিতে হয়ে বিবাহ পরিকল্পকদের। ইন্টারনেটের যুগে ছবি দেখিয়ে অনেক সময় গ্রাহকদের তরফে তাঁদের কাছে বিশেষ বিশেষ দাবিও রাখা হয়। সংস্থার এক কর্মী জানালেন, বর বসার জন্য এখন তাঁবু, গম্বুজের আকারেও কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
থিম
বধূ আসতে পারে পালকিতেও, বিয়ের মণ্ডপ সাজানো যায় বিশেষ থিমেও। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
পুজোয় থিম হতে পারে, তবে বিয়ের মণ্ডপে, ভাবনায় কেন নয়? বহু বিয়েবাড়িতে চোখ রাখলে, বিয়ের বাসর থেকে আনুষঙ্গিক সাজ অনেক সময় থিম-নির্ভর পুজোর কথাও মনে করাতে পারে। এমনই একটি কাজের কথা বলছিলেন প্রিয়াঞ্জনা। যেখানে ‘আদি যোগী’ থিম ছিল। বিবাহ অনুষ্ঠানে অসংখ্য পুরোহিত একসঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে কখনও কনেপক্ষের ইচ্ছা মেনে জুড়েছেন রবীন্দ্রনাথ, কখনও আবার বরপক্ষের চাহিদা মেনে আধ্যাত্মিক ভাবনা। আর বাঙালির সাবেক থিমের বিয়ে তো এখন আকছার। খোড়ো চালের কুঁড়ে ঘরে লক্ষ্মীদেবীর আদলে কনে বসার জায়গা, বিয়ের মণ্ডপ ঝিলের মাঝে জলটুঙ্গিতে, খাবার পরিবেশকদের পরনে ধুতি-মেরজাই থেকে অভ্যাগতদের পাতে বোঁটাসমেত বেগুন ভাজা, কষা মাংসের বদলে কচি পাঁঠার ঝোল— এ সব এখন জলভাত।
ভাবনা যা-ই থাক না কেন, মনের মতো বিয়ে করতে চাইলে সব কিছুই মিলতে পারে নাগালে। ফিয়াট থেকে লিমুজ়িন, ভিনটেজ কার— ভাড়ায় মেলে সবই। হাতি, ঘোড়া, পালকি, পালকি বাহক, লোক-লস্কর, বিয়েবাড়ি যেন এখন ভাড়ার জগৎ। তবে কি ভবিষ্যতে ভাড়া মিলবে বর, বউও?