মঞ্চে অরুন্ধতী ও তাঁর ছাত্রছাত্রীরা।
সম্প্রতি নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল রবীন্দ্রনাথের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে কবিপ্রণাম ‘শতকণ্ঠে সহস্রকণ্ঠ’। ‘চিরনূতন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি নিবেদন করল সঙ্গীতভারতী মুক্তধারা। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেন ভারতের ১১টি রাজ্যের এগারোশো কণ্ঠশিল্পী।
আলো প্রজ্জ্বলিত হতে দেখা গেল, সারা মঞ্চ জুড়ে একশো জনেরও বেশি শিল্পী শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে বসে আছেন। সামনের সারিতে উপবিষ্ট তাঁদেরই শিক্ষক-শিক্ষিকারা। অপূর্ব পরিবেশ। এ দৃশ্য বিরল। মঞ্চ পরিকল্পনায় মুনশিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। সারা দেশ জুড়ে এত জন রবীন্দ্রানুরাগী শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে দেখতে ভাল লাগে।
এটি একটি ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান। সম্মেলক সহস্রকণ্ঠের গানের সূচনা হল একই সময়ে, একই গানে, একই মিউজ়িক ট্র্যাক ব্যবহার করে। সমগ্র অনুষ্ঠানে যে শহরগুলি থেকে শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে ছিলেন ভিলাই, দিল্লি, জামশেদপুর, হায়দরাবাদ, ভোপাল, শিলচর, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, রৌরকেল্লা, চেন্নাই ও নবি মুম্বইয়ের শিক্ষার্থীরা। যে ১১টি শহরের প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠান চলছিল একই সময়ে, সেখানে অন্যান্য জায়গাগুলির অনুষ্ঠানও পর্দায় একযোগে ফুটে উঠছিল। এই কৃতিত্ব বৈদ্যুতিন মাধ্যমের। মঞ্চের দু’দিকের দু’টি স্ক্রিনে দর্শক-শ্রোতাদেরদৃষ্টিগোচর হচ্ছিল।
এক হাজার গায়ক গায়িকাকে একত্র করে ও তাঁদের ঠিক পদ্ধতিতে শিক্ষা দিয়ে সম্মেলক গানের জন্য তৈরি করা সহজ নয়। এই দুরূহ কাজটি যিনি করেছেন, তিনি হলেন অরুন্ধতী দেব। তাঁর এই অক্লান্ত প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।
সঙ্গীতভারতী মুক্তধারা একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ, যা হাজার কণ্ঠে সম্মেলক রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো বিশাল আয়োজন করে আসছে গত ২০ বছর ধরে। এক হাজার গায়ক-গায়িকার গলাকে এক তারে মেলানো, ঠিক সুরে ছন্দে গাওয়ানো, রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে গভীর ভাব তাকে সকলের অন্তরে জাগানো তো কম কথা নয়। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের গান, যাকে আয়ত্তে আনতে যথেষ্ট সময় লাগে, তা এই মঞ্চে গাওয়া হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। এমন কাজ তো প্রশংসার দাবি রাখেই। এখানে একটি কথা অবশ্যই উল্লেখ্য। সঙ্গীতভারতী মুক্তধারার অনুষ্ঠানটি একসঙ্গে এক মঞ্চে বসে হাজার কণ্ঠে গাওয়া আর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই সময়ে, একই সঙ্গে, একই যন্ত্রানুষঙ্গে সহস্রকণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া কখনওই এক নয়। দু’টি পদ্ধতির মধ্যে অনেক পার্থক্য। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ ভাবে প্রযুক্তিনির্ভর। যৎসামান্য সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তা হয়নি, দু’-একটি গান ছাড়া। ভারতের ১১টি প্রান্ত থেকে শত শত কণ্ঠ জুড়ে হয়েছে হাজার কণ্ঠ। সংস্থার কর্ণধার অরুন্ধতী দেবের তত্ত্বাবধানে সকলে মিলে একসঙ্গে গেয়ে উঠেছেন একই সুরে। অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, স্বরলিপির নিবিড় পাঠ এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা এই প্রযোজনায় একটি দৃষ্টান্ত।
অনুষ্ঠান শুরু হল ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’ গানটি দিয়ে। এর পর একে একে পরিবেশিত হল ‘হে চিরনূতন, আজি এ প্রথম গানে’, ‘আজ কি তাহার বারতা পেল রে কিশলয়’, ‘আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলায়’, ‘নব আনন্দে জাগো’, ‘এ কি সুধারস আনে’, ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন করে’, ‘হে নবীনা’, ‘আমরা নূতন প্রাণের বর’, ‘পুরানো জানিয়া চেয়ো না’, ‘পুরাতনকে বিদায় দিলে না যে’, ‘দূর রজনীর স্বপন লাগে’, ‘বারেবারে পেয়েছি যে তারে’, ‘অজানা খনির নূতন মণির গেঁথেছি হার’, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’, ‘তার অন্ত নাই গো’ এবং শেষ গান ছিল ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক’।
প্রতিটি গানই সুগীত। তবু তার মধ্যে ‘আজ কি তাহার বারতা পেল রে কিশলয়’, ‘নব আনন্দে জাগো’, ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন করে’ এবং ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক’ উল্লেখযোগ্য। সঙ্গীতায়োজন ছিল প্রশংসনীয়। শব্দপ্রক্ষেপণে বিশ্বজিৎ প্রসাদ এই অনুষ্ঠানটিতে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিলেন।
অনুষ্ঠান