Art Exhibition review

যন্ত্রণার গর্ভ থেকে জন্মাল যে শিল্প

আর্ট শিক্ষার আগে এবং পরে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল জয়াকে। তাঁর যাত্রা সুখময় ছিল না। যখন তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে গেলেন, একমাত্র অবলম্বন ছিলেন তাঁর মা।

শমিতা বসু
শেষ আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ ০৭:১৭
রংরূপ: সিমা গ্যালারিতে জয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

রংরূপ: সিমা গ্যালারিতে জয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

জয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে সেন্টার অফ ইন্টারন্যাশনাল মডার্ন আর্ট এবং দিল্লির আর্ট ম্যাগনাম। এখানে শিল্পীর চার দশকের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন রাখি সরকার।

দক্ষিণ কলকাতার এক রক্ষণশীল পরিবারের সাত ভাইবোনের মধ্যে একজন ছিলেন জয়া। বাবা এবং মা দু’জনেই ও পার বাংলা থেকে এসে ভবানীপুরে থিতু হয়েছিলেন। কলকাতা শহরে পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে বামপন্থী প্রতিবাদ, পরবর্তী কালে নকশাল আন্দোলন দেখে বেড়ে ওঠা শিল্পীর। স্কুলের বায়োলজি ক্লাসে জন্তু-জানোয়ার এবং কীটপতঙ্গ আঁকা এবং বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর আলপনা দিয়ে ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয়েছিল জয়ার।

আর্ট শিক্ষার আগে এবং পরে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল জয়াকে। তাঁর যাত্রা সুখময় ছিল না। যখন তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে গেলেন, একমাত্র অবলম্বন ছিলেন তাঁর মা। কলেজ পাশ করে জীবনে প্রথম উপভোগ করলেন স্বাধীনতা, মুক্তি। ছবি আঁকার অদম্য ইচ্ছে নিয়ে শুরু হল কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়।

কলেজে শিল্পকৌশল শিখলেও জয়ার মন চেয়েছিল, মানুষের কথা বলতে। শিয়ালদহ স্টেশনে অপেক্ষারত এবং চলমান জনঅরণ্য পর্যবেক্ষণ করতেন জয়া। সোনাগাছিতে দেহপসারিণীদের জীবনযাত্রা স্টাডি করে ক্রমশ তিনি বদ্ধপরিকর হলেন যে, পুরুষশাসিত এই সমাজে অবহেলিত, অপমানিত মেয়েদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে তাঁকে কাজ করতেই হবে। যে সমাজে লিঙ্গবৈষম্য নারীকে পদে পদে নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে পুরুষের অধীন করে রাখতে শেখায়, সেখানে তাঁর নিজের একমাত্র মুক্তি শুধুই প্রতিবাদী ছবি আঁকায়।

প্রথম জীবনে সেরামিকস দিয়ে ভাস্কর্য গড়ায় মন ছিল তাঁর। ভাল লাগত ত্রিমাত্রিক কাজ। সেই সময়কার সব স্কেচ এবং পেন্টিং শুধু কালো রঙে করা। সত্তর এবং আশির দশকে জয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের কাজে ল্যান্ডস্কেপ এবং ফিগার স্টাডিজ় দেখা যায়। ফিগারগুলিতে প্রধানত কালো রং ব্যবহার করেছেন। সেই সময়কার কিছু ল্যান্ডস্কেপও বেশ রহস্যময়। আশির দশকের ফিগারেটিভ কাজে নারীর-মনের অস্থিরতা, বেদনা, অভাববোধ, একাকিত্ব, অসহায়তা এবং সামান্য বিদ্রোহের ভাব ফুটে উঠেছে। তবে তখনও শিল্পী ঠিক আপন স্বাক্ষরে প্রকাশিত হননি।

পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধে যে লড়াই, তা-ই জয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের শিল্পের অন্তরাত্মা। যদিও আশির দশকের কাজে আমরা পাখি, ফুল, প্রজাপতি ইত্যাদির আভাস পাই অনেক সময়েই। সেখানে শিল্পী নিশ্চিত ভাবেই আশা, স্বপ্ন, মুক্তি এবং আনন্দের কথাই বলতে চেয়েছেন। কিন্তু একটি ঝুলন্ত দড়ি এক নিমেষে দর্শককে মৃত্যু, হতাশা এবং বিপর্যয়ের মুখোমুখি এনে ফেলে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নারীর মুখাবয়বের মধ্যে আমরা অনেক সময়ে দুঃখের ছায়া অনুভব করি। কিন্তু সেগুলিতে রমণীর মনের গভীর একাকিত্বের কথা বলেছেন কবি। যেন একান্ত ভাবে প্রতিটি নারীর মনোজগতের সন্ধান রাখতেন তিনি। রেখার ব্যবহারে, রঙের অভাবে প্রতিটি অবয়ব যেন মূর্ত করে তুলেছিলেন।

জয়ার নব্বইয়ের দশকের কাজে আবার আমরা দেখতে পাই পরিবর্তন। এ বারে ছবির গঠন অনেকাংশে আধুনিক। এখানে আমরা আমেরিকার উইলেম ডি কুনিং-এর অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজ়মের কিছু ছোঁয়া পাই। রঙের ব্যবহার সীমিত রেখে অনেক পুরুষ চরিত্র এঁকেছেন জয়া। সেগুলি আনন্দদায়ক নয়, বরং ভয়ভীতির সঞ্চার করে। নারীচরিত্রে দেখা যায় বিভ্রান্তি। সে যেন জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজছে।

এর পর একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কাজে শিল্পী এনেছেন আমূল পরিবর্তন। এই পর্যায়ে তিনি রেখা, টেক্সচার, গঠন এবং রঙের আতিশয্যে নিজের মূল বক্তব্য‌ প্রকাশ করেছেন। সুন্দরের উপাসনা তিনি করেননি। তাঁর কাছে এখন ভাঙন মুখ্য বিষয়বস্তু। নারীশরীরের ভাঙচুর এবং ধ্বংসের আভাস তাঁর কাজে স্পষ্ট, কারণ এই সময়কার সব ছবিই একাকিত্ব, অসহায়তা এবং পুরুষের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভিতর থেকে উঠে আসা।

এই ছবিগুলিতে যেন নারীদের বিশ্বাসপ্রাকার ধসে পড়ছে। চারদিকে শুধু ভয়। মস্ত এক বনস্পতি যে ভাবে টুকরো টুকরো হয়ে, মূলসুদ্ধ উপড়ে, ডালপালা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে যায়, ঠিক সেই ভাবে নারীর ক্ষতবিক্ষত আত্মসম্মানবোধ, ব্যথা-বেদনা, এমনকি মেরুদণ্ড খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙে পড়তে চাইছে। কিন্তু শিল্পী তার অদম্য সত্তাকে ধরে রেখেছেন। সে ভেঙেও ভাঙছে না। খণ্ডিত মেরুদণ্ড নিয়েও সে অনমনীয়।

২০১৪ সালের মিশ্র মাধ্যমে আঁকা কাগজের ছবিগুলিতে নারীকে কিছুটা যেন বিজয়িনী হিসেবে দেখানো হয়েছে। নীলাকার এই সুন্দরী আপন আত্মবিশ্বাসের জোরে গর্বিত। অন্য কাগজের ছবিতে আরও একটি নারী চেয়ারে বসে আছে। তার মেজাজটি কিন্তু প্রতিবাদী এবং আহ্বানপূর্ণ।

২০০৯-এর একটি ছবিতে দুই অত্যাশ্চর্য মহিলা যন্ত্রণায় কাতর, যেন পুরুষের পদাঘাতে তারা নত। আবার ২০২০-র একটি ছবিতে এক মহিলা একটি পুরুষের মস্তিষ্কে কামড় দিয়েছেন। সে ছবির ঊর্ধ্বাংশে পুরুষের দল শক্তিহীন এবং নির্বাক দর্শক। কিছুটা যেন মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্যে পাণ্ডবদের উদাসীনতা। এতে রঙের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত। আর একটি ছবিতে পুরুষটি নারীশরীরে ভোগলিপ্ত। অপর একটি ভীত মুখ পর্যবেক্ষণরত।

কোভিডের সময়ের চরম একাকিত্ব থেকে উঠে আসা কষ্টদুঃখ নিংড়ে সেখান থেকে এক নির্যাস নিয়ে শিল্পীর এই সব সৃষ্টি। এই সময়ের ছবিগুলি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তী পুরো সিরিজ়টিতেই ক্ষয়িত, দূষিত সমাজব্যবস্থার শিকার না হয়ে নারীজাতির নিজেদের পরিপূর্ণ ভাবে খুঁজে পাওয়ার কাহিনি যেন স্তরে স্তরে নান্দনিকতার লেপনে এঁকেছেন জয়া গঙ্গোপাধ্যায়।


আরও পড়ুন