Art Exhibition

সাতটি রঙের সিম্ফনি

অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সেন্ট্রাল গ্যালারিতে এটি ছিল তাঁদের দ্বিতীয় যৌথ প্রদর্শনী। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকেও এঁদের মূল লক্ষ্য নিজের শিল্পভূমিকে আরও দৃঢ় করা।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৫
শৈল্পিক: অ্যাকাডেমিতে সৃজনা শিল্পীগোষ্ঠীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

শৈল্পিক: অ্যাকাডেমিতে সৃজনা শিল্পীগোষ্ঠীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

সমসাময়িক চিত্রকলার পরিমণ্ডলে সম্প্রতি উঠে এসেছেন সাতজন মহিলা শিল্পী। বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা এই ‘সপ্তপর্ণী’র শিল্পচর্চা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বর্ণিল ট্যাপেস্ট্রি। ‘সৃজনা’ গোষ্ঠী হিসেবে তাঁদের যাত্রা শুরু ২০১৮-তে। তারুণ্যের শক্তি এবং শিল্পবোধের ক্রমবিকাশ আজ তাঁদের কাজকে সুস্পষ্ট পরিচয় দিয়েছে। এই সাতজনের নেপথ্যে ছিলেন শিল্পী পার্থ ভট্টাচার্য। সম্প্রতি তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ যেমন শূন্যতা তৈরি করেছে, তেমনই শিক্ষাগুরু হিসেবে তাঁর উপস্থিতি আজও নিঃশব্দে বহমান। কোনও আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই শুধু নিষ্ঠা আর অনুশীলনে ভর করে কতটা এগোনো যায়— এই প্রদর্শনী তার জীবন্ত প্রমাণ।

অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সেন্ট্রাল গ্যালারিতে এটি ছিল তাঁদের দ্বিতীয় যৌথ প্রদর্শনী। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকেও এঁদের মূল লক্ষ্য নিজের শিল্পভূমিকে আরও দৃঢ় করা। প্রতিটি কাজ মৌলিক দৃষ্টিসম্পন্ন এবং ব্যক্তিগত অনুভবের স্বাক্ষর বহন করে।

দলের অন্যতম সক্রিয় সদস্য দূর্বা কাঞ্জিলাল চক্রবর্তী। তাঁর ‘ইকোস অব দ্য ব্লু’-তে প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুল, নীলের গভীরতা, মাছের অবাধ চলাচল, সব মিলিয়ে এক ধ্যানমগ্ন আবহ তৈরি হয়। প্রকৃতি ও মানবমনের অনির্বচনীয় সংযোগ এখানে রূপক হয়ে ওঠে। বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত হলেও দূর্বার শিল্পভাষা অত্যন্ত নিবিষ্ট। তাঁর ‘ডিভাইন ইউনিটি’— সবুজ পটে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা পঞ্চমুখ ঐক্যের প্রতীকী ভাবনা। কদমফুলের আলোছায়ায় কাজটি আরও সংবেদী অনুভূতির জ্বলন্ত উদাহরণ। শ্রীচৈতন্য–দর্শনে বিশ্বাসী শিল্পীর ভাবনা হল, ঈশ্বর কোনও ধর্মের মালিক নন, ঈশ্বর হলেন প্রেম, যা চিত্রের অন্তরালে ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত।

ওড়িশার সাংস্কৃতিক মাটি এবং বাংলার শৈল্পিক শস্য— দু’টিরই আলোয় বড় হওয়া জানালি মিশ্র পেশায় একজন মনোবিজ্ঞানী। ফলে মানবমনের স্তরগুলি তাঁর কাজে সহজেই ধরা দেয়। ‘মৎস্য’স মিরর’-এ ন’টি মাছ নবরাত্রি, ন’টি গ্রহ ও ‘কই’ পুরাণের প্রতীক। ছ’টি সাদা মাছ মানবিক আবেগের সম্প্রসারণ, যা আমাদের চেতনাকে প্রসারিত করে। ‘হারমনি অব ফাইভ’— আঞ্চলিক লোকনকশার আদলে পঞ্চাবেগের চিত্রায়ণ। রঙের ভিন্নতা ও নকশার ঐক্যে, পাঁচ অন্তঃপুরিকার মিলন সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে।

এর পর আসে সায়নী দাশগুপ্ত মণ্ডলের ভাবনার জগৎ। তাঁর কাজের মূল কথা— ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ও কর্মযোগের দার্শনিক পথ। মুম্বইনিবাসী শিল্পীর এই সিরিজ় স্বামী বিবেকানন্দের মতবাদে প্রভাবিত— দুঃখ আসে আসক্তির কারণে, কর্মের কারণে নয়। হলুদ আলোময় পট, তবে তার ভিতরে বিষাদের ক্ষীণ সুর— আত্মার অনুসন্ধানে নিবেদিত এক তপস্যা। যত্নশীল ব্রাশের সুনির্দিষ্ট রূপক ও ভাষা ছবিগুলিকে তীব্র অভিব্যক্তি দেয়।

সন্ধ্যা শ-এর ‘দি আর্ট অব ডিভোশন’ ছবিটি ভারতীয় লোকশিল্প এবং পৌরাণিক শিল্পের সুললিত ভঙ্গিতে আঁকা। রাখালের গরু চরানো, শুভ্রতার মায়া— সবই পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় রূপায়িত। ‘টিউন অব ইয়ার্নিং’ আত্মার আকাঙ্ক্ষার রূপক, প্রেম ও নিবেদন এখানে নিঃশব্দ লয়ের মতো।

প্রদর্শনীতে ভাষ্টী মিত্রর ‘দ্য ফ্র্যাজাইল ক্লিং’ কাজটি বেশ পরিণত। গ্রাফিক ডিজ়াইনের স্নাতকোত্তর শিক্ষা তাঁর কাজে এনেছে ভিসুয়াল ব্যালান্স এবং সুপরিকল্পিত ফ্রেমিং। অ্যাক্রিলিকে রঙিন গ্লাসের ধারাবাহিক বিন্যাস— লাল, নীল, হলুদ, কমলা, যা মানুষের অনুভবের বহুস্তরীয় প্রতীক হিসেবে গ্রাহ্য। গ্লাসের রূপক শুধুই বিনোদন নয়, স্মৃতির ভাগাভাগি, অন্তরঙ্গ আলাপের সংরক্ষণ। তাই প্রতিটি বর্ণময় গ্লাসই যেন জমে থাকা বদ্ধতার প্রতিফলন। ফর্মের টানাপড়েন, রঙের অস্থিরতা শিল্পীর অগ্রগতির বার্তা আনে।

এর পর শ‍্যামা ঘোষের কাজ। স্বশিক্ষিত এই শিল্পীর মিশ্র মাধ্যমে নকশিকাঁথার ঐতিহ্য, মিনিয়েচার এবং নারীচরিত্রের অন্তর্নিহিত অনুভূতি একাত্ম হয়ে ওঠে। তাঁর সিরিজ় ‘নকশিকাঁথায় কৃষ্ণকথা’য় বাংলার লোকঐতিহ্য এবং ভারতীয় পুরাণ সমান তালে বোনা। রুক্মিণীর অপেক্ষা, চিঠিতে লেখা আকুলতা, জানলার ফ্রেমে আটকে থাকা আকাশখণ্ড, ভেসে যাওয়া কাগজ— সব মিলিয়ে এক নির্মল প্রেম ও প্রত্যাশার সময়কে ফুটিয়ে তোলে। নকশিকাঁথার সূক্ষ্ম রেখাপাত এবং রঙের মৃদু কম্পন শ‍্যামার ছবিকে আলাদা মর্যাদা দেয়।

ওড়িশার পরিমণ্ডল থেকে উঠে আসা সিদ্ধিব্রতা মহাপাত্র রং, টেক্সচারের মেলবন্ধনে তৈরি করেন ঐন্দ্রজালিক দৃশ্যভুবন। ‘ইটার্নাল সাগা’য় জানলার মুখ, বাঁশির সুর, দু’টি গরুর প্রশান্ত উপস্থিতি, পাতার সবুজ নিঃশ্বাস— সব মিলিয়ে প্রতীক্ষা ও সংযোগের এক অনাদি মুহূর্ত। তাঁর রং-প্রয়োগ উজ্জ্বল অথচ কোমল, যেন আবেগের ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠা এক প্রেমকাব্য। তবে এই প্রেমকাব্য কোনও রোম্যান্টিকতা নয়, বরং নিবেদন। বলা ভাল, মানবজীবনের অস্তিত্বদর্শনের চিত্রভাষা।

এই সাত নারীর শিল্পভাষা ভিন্নধর্মী হলেও, তাঁদের কাজ এক অদৃশ্য শক্তির মিলন। অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান, প্রকৃতি ও পুরাণ— সব মিলেমিশে এই প্রদর্শনী হয়ে উঠেছে চেতনার এক সম্মিলিত দিগন্ত। তরুণ সৃজনশীলতার এই যাত্রা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আরও সুদৃঢ় করে।

আরও পড়ুন