Art Exhibition

ইতিহাস ও অন্তর্লোকের সংলাপ

এ বছর ললিত কলা অ্যাকাডেমির উদ্যোগে তৃতীয় প্রিন্ট বিয়েনাল ইন্ডিয়াকে ঘিরে কলকাতার শিল্পপরিসরে যে সজীব আবহ তৈরি হয়েছিল, তারই এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন ‘ইটারনাল কনট্রাস্ট’।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৯:২১
নিবিড়: ‘দ্য ফ্রেম’ আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

নিবিড়: ‘দ্য ফ্রেম’ আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

ভারতীয় প্রিন্টমেকিং দীর্ঘ দিন ধরেই এক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পধারা। মিশনারি ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে গোয়ায় প্রথম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে বই, পোস্টার ও সাময়িকপত্রের মাধ্যমে তা জনজীবনে প্রবেশ করে। ঔপনিবেশিক শিল্পবিদ্যালয়ে প্রিন্ট ছিল মূলত পুনরুৎপাদনের কৌশল।

পরবর্তীতে রাজা রবি বর্মার ক্রোমোলিথোগ্রাফি এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিথোগ্রাফিক কাজ প্রিন্টকে জনপ্রিয়তার স্তরে নিয়ে আসে। তবু এটি দীর্ঘ দিন স্বাধীন শিল্পভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। এর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে কলাভবনের ফরাসি শিল্পী আন্দ্রে কার্পেলেসের লিনোকাট প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে। প্রিন্ট তখন আর শুধুই পুনর্মুদ্রণ নয়, হয়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম। কাঠখোদাই থেকে সেরিগ্রাফি— প্রতিটি পদ্ধতির নিজস্ব পরিভাষা রয়েছে। বিয়েনাল এই বৈচিত্রকে একত্রিত করে বৃহত্তর শিল্পসমাজের সামনে উপস্থাপন করে। সম্পর্কটা নিয়ে একটু আলোচনার পরিধি বাড়ালে পাঠকের কিছুটা সুবিধা হতে পারে। বিশেষত যারা এ ব্যাপারে কিছুটা অপরিচিত।

প্রিন্ট বিয়েনাল ইন্ডিয়া শিল্পমঞ্চের এক বিশ্বজনীন রূপরেখা। এ বছর ললিত কলা অ্যাকাডেমির উদ্যোগে তৃতীয় প্রিন্ট বিয়েনাল ইন্ডিয়াকে ঘিরে কলকাতার শিল্পপরিসরে যে সজীব আবহ তৈরি হয়েছিল, তারই এক তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন ‘ইটারনাল কনট্রাস্ট’। বাংলার বটতলা প্রিন্ট থেকে লিনোকাট পর্যন্ত যে সমৃদ্ধি, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘দ্য ফ্রেম’ শিল্পীগোষ্ঠী সম্প্রতি তাঁদের গ্রাফিক্স কর্ম উপস্থাপন করেছিল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভিতরেই দাঁড়িয়ে গ্রুপের প্রদর্শনী ‘ইটারনাল কনট্রাস্ট’।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘দ্য ফ্রেম’ নিয়মিত প্রদর্শনী, কর্মশালা ও সেমিনারের মাধ্যমে দলগত শিল্পচর্চাকে জীবিত রেখেছে। গত দু’বছর সেরিগ্রাফ্রি ও লিনোকাটে তাঁদের নিবিড় অনুশীলন এই প্রদর্শনীর ভিত্তি। আয়োজনে শিল্পী সদস্যদের কাজের ভিতর বৈপরীত্যের ধারণা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও প্রকৃতি ও শিল্পায়নের সংঘাত, কোথাও মানবমুখের ভিতরে প্রতীকী চিহ্ন। আবার কোথাও সমকালীন উদ্বেগের বিমূর্ত ভাষা এবং লোকশিল্পের স্মৃতি। লিনোকাটের দৃঢ় কাটিং, সেরিগ্রাফ্রির স্তরবিন্যাস, সাদা-কালোর তীব্র দ্বন্দ্ব— সব মিলিয়ে প্রকৃতই এক সংহত চিত্রনির্মাণ।

নজর দেওয়া যাক গ্রুপের শিল্প পরিচিতির দিকে। নিজস্ব ভবনে আয়োজিত সাদা দেওয়ালে ক্রমান্বয়ে প্রথমেই আকর্ষণ করে সৌমিত্র করের কাজ। তাঁর প্রিন্টে লোকশিল্পের অনুরণন স্পষ্ট। মানবমুখ, পাখি ও অলঙ্কারধর্মী রেখায় নবান্নের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা পায়। লিনোকাট এবং সেরিগ্রাফির সমতল বিভাজন ও রৈখিক ছন্দে আধুনিকতার সহাবস্থান ধরা পড়ে। বিভূতি চক্রবর্তীর কাজে প্রকাশ পায় শক্তিশালী রেখার আঁচড়। দু’টি কাজেই কালো সাদার জোরালো গতি চোখে পড়ার মতো।

হলুদ প্রেক্ষিতে বিশ্বজিৎ সাহার সেরিগ্রাফি (জ্ঞানপদ্ম) অন্তর্জগতের প্রতীক। পাশাপাশি লিনোকাটের ‘বাহুবলী’ মিশ্র রেখার এক রহস্যময় অভিমুখ। সূক্ষ্ম টোনাল ভেদ ও রেখার স্তরায়নে প্রাণগোপাল ঘোষ প্রকৃতিকে সহজ ছন্দে মেলে ধরেছেন। জয়ন্ত ভট্টাচার্যের লিনোকাটে মানব অবয়ব এক বিস্ফোরক শক্তির প্রতিরূপ। ঘন কালো সাদার কনট্রাস্ট এবং ঘূর্ণায়মান রেখা অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করে।

স্বপন কুমার মল্লিকের কাজে প্রতীকী সরলতা বেশ স্পষ্ট। চোখ, আপেল, সর্পিল রেখার ন্যূনতম উপাদানে অন্তর্দ্বন্দ্বের ভিসুয়াল ভাষা নির্মিত হয়েছে। সেরিগ্রাফির সমতল রং গভীরে গিয়ে এক সংযত মননের পরিচয় দেয়। ভাল লাগে রবীন রায়ের শিরোনামহীন সেরিগ্রাফির কাজটি। গঠনগত শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য ছবিটির মান বাড়িয়ে দেয়। শেখরবরণ কর্মকারের উত্তাল তরঙ্গের স্ক্র্যাচের মুখোমুখি নারীশক্তির নৃত্যবিলাস সুন্দর সেজে ওঠে।

চমৎকার লাগে সুমিতাভ পালের জ্যামিতিক গঠনের পরিমিতিবোধ। লাল কালোর সলিড বিন্যাসে আধুনিক বিমূর্তায়নে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে। শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজে অবয়বের ভাঙন ও রেখার জটিল বুনন বর্তমান অস্থিরতার শামিল। দেবাশিস সামন্ত প্রতীকী রূপক ও টেক্সচারের ব্যবহারে কল্পনার সীমারেখা ঝাপসা করেছেন।

কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে শীতাংশু মণ্ডলের ‘ইন সার্চ অব গ্রিন’ (সেরিগ্রাফি)। জেরিক্যানের ভিতরে বন্দি সবুজ প্রকৃতি এবং উপর থেকে আসা যান্ত্রিক ক্রেন— সমকালীন পরিবেশ-সঙ্কটের এক তীক্ষ্ণ প্রতীক। এখানে জৈব ও যান্ত্রিক ফর্মের সংঘাতে বিষয়টি সরাসরি দৃশ্যমান। মানিক কুমার ঘোষের কাজে যান্ত্রিক গিয়ার ও মানব হৃদয়ের সম্মিলন, সংবেদন ও যন্ত্রসভ্যতার দ্বন্দ্বকে সামনে আনে।

‘ইটারনাল কনট্রাস্ট’ প্রদর্শনীর মূল সুর বিপরীতমুখী হলেও তা কেবল বিষয়বস্তুর স্তরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মাধ্যম ও নির্মাণপ্রক্রিয়ার ভিতরেও এই দ্বন্দ্ব কার্যকর। লিনোকাটের ক্ষেত্রে ম্যাট্রিক্স থেকে অংশ অপসারণের মাধ্যমে চিত্র গঠিত হয়। অর্থাৎ অনুপস্থিতিই উপস্থিতিকে নির্ধারণ করে। সেরিগ্রাফিতে স্তর সংযোজনের মাধ্যমে রূপ নির্মিত হয়। একটি বিয়োজনমুখী, অন্যটি সংযোজনমুখী। এই প্রক্রিয়াগত পার্থক্যই প্রদর্শনীর ধারণাকে গভীরতা দিয়েছে। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য দিক হল, প্রতি শিল্পীর মাধ্যমগত সচেতনতা এবং সম্ভাবনার পুনরুচ্চারণ।

‘দ্য ফ্রেম’ শিল্পী গোষ্ঠীর এই প্রয়াস কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, বরং প্রিন্ট মাধ্যমের ধারাবাহিক অনুশীলনের সুস্পষ্ট উদাহরণ।


আরও পড়ুন