বাঁচা-মরা এখন নির্ধারিত অ্যাপের হাতে! চিন জুড়ে ঝড় তুলেছে অদ্ভুত এক অ্যাপ। নিঃসঙ্গদের ভরসা হয়ে উঠছে ভাইরাল এই অ্যাপটি। কর্মব্যস্ত জীবনে যখন কেউ কারও খোঁজ পর্যন্ত রাখেন না তখন তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে চিনা অ্যাপটি।
‘আর ইউ ডেড’ বা ‘আপনি কি মৃত’? পিলে চমকানোর জন্য নামই যথেষ্ট। অদ্ভুতনামা এই অ্যাপটি চিনে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। নিরাপত্তা অ্যাপটির জন্য গ্রাহক গাঁটের কড়ি খরচ করতেও পিছপা হচ্ছেন না। অ্যাপ্লের অ্যাপ স্টোরের ‘পেড চার্টের’ শীর্ষে উঠে এসেছে ‘আর ইউ ডেড’।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বহুচর্চিত অ্যাপটির নির্মাতা তিন তরুণ তুর্কি। অ্যাপটির নির্মাতারা জানিয়েছেন, একাকী অফিসকর্মী, বাড়ি থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থী এবং যাঁরা নিঃসঙ্গ জীবনযাপন পছন্দ করেন তাঁদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে। একাকিত্ব পছন্দ করেন এমন মানুষদের জীবনে অবাঞ্ছিত বিপদের আশঙ্কা থেকেই যায়। সেই ভাবনা থেকেই এই অ্যাপটির জন্ম।
অ্যাপের নাম যতই ভয়ের উদ্রেক ঘটাক না কেন, অ্যাপটিকে ‘জীবনরক্ষাকারী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একাকী বাসিন্দাদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে বলে আশাবাদী অ্যাপনির্মাতারা।
অ্যাপটির ধারণা বেশ সহজ। ততটাই সহজ এর কাজের পদ্ধতি। যিনি অ্যাপটি ব্যবহার করবেন তিনি সুস্থ আছেন কি না বা বেঁচে আছেন কি না তা নিশ্চিত করবে এটি। তার জন্য প্রতি দু’দিন অন্তর অ্যাপকে জানান দিতে হবে। যদি কোনও ব্যবহারকারী টানা দু’দিন অ্যাপকে জানাতে ব্যর্থ হন, তা হলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করা শুরু করবে ‘আর ইউ ডেড’।
অ্যাপ গ্রাহকের দেওয়া পূর্বনির্ধারিত যোগাযোগের ঠিকানায় জরুরি ভিত্তিতে একটি সতর্কবার্তা পাঠাবে অ্যাপটি। এই অ্যাপটির জন্য কোনও লগইন বা ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন হয় না। অত্যন্ত সহজ তথ্যের আদানপ্রদানের মাধ্যমে মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সংযোগ ঘটে। একটি বোতামে চাপ দিলেই তথ্যটি অ্যাপের কাছে পৌঁছে যায়।
মুনস্কেপ টেকনোলজিস নামে সংস্থাটি মাত্র ১,০০০ ইউয়ান (প্রায় ১৩,০০০ টাকা) দিয়ে অ্যাপটি তৈরি করেছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি অ্যাপটির জনপ্রিয়তা লক্ষ করে তারা বিনিয়োগকারীর সন্ধান করছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য প্রায় ১ কোটি ইউয়ানে পৌঁছে গিয়েছে।
প্রাথমিক ভাবে অ্যাপটি ডাউনলোড নিখরচায় করা যেত। প্রচারের আলোয় আসার পর এখন এটির দাম ৮ ইউয়ান (প্রায় ১০৩ টাকা) করা হয়েছে। তার পরও এটির গ্রাহকসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। টাকা দিয়েও চিনের লোকজন এটিকে নিজেদের মোবাইলে ঠাঁই দিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, হংকং, অস্ট্রেলিয়া এবং স্পেনের মতো দেশগুলিতেও অ্যাপটি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। গ্রাহকদের মধ্যে অধিকাংশই বিদেশে কর্মরত বা পাঠরত চিনা নাগরিক।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, চিনে একাকী নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তরুণ শহুরে পেশাদারদের মধ্যে। শহরাঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ বেশি হওয়ার কারণে বহু তরুণ-তরুণীই পরিবার ছেড়ে শহরকেই বেছে নিচ্ছেন। অবাধ স্বাধীনতা, সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তন কারণে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ একাকী জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছেন।
শিউরে ওঠার মতো একাধিক তথ্য উঠে এসেছে তাঁদের অভিজ্ঞতায়। কখনও এমন হয়েছে, দুর্ঘটনা বা গুরুতর অসুস্থ এমনকি মৃত্যু হওয়ার পরও স্বজনদের কাছে কোনও খবর পৌঁছে দেওয়ার লোক পাওয়া যায়নি। সেই সব হতভাগ্য মানুষের মৃত্যুর খবর বাইরে কারও কাছে এসে পৌঁছোয়নি। একাকী, নিঃসঙ্গ অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়েছে তাঁদের।
শুধু বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী নয়, তরুণদের মধ্যেও একা থাকার প্রবণতা বেড়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা এক সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গার্হস্থ্য হিংসার পর বিবাহবিচ্ছিন্না এক তরুণী একা একটি সঙ্কীর্ণ ঘরে থাকতেন। বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন তিনি। এক বছর পর সেই ছোট্ট ঘরেই আত্মহত্যা করেন তরুণী। জিনিসপত্রের স্তূপ আর পচা খাবারে বিছানা ঢেকে গিয়েছিল। ফলে একাকিত্ব উপভোগ করলেও বহু ক্ষেত্রে তা চরম ক্ষতি করছে তরুণ প্রজন্মকে।
২০ বা ৩০-এর কোঠায় থাকা তরুণেরা পরিবারে চেয়ে শহরে একা থাকতেই বেশি পছন্দ করতে শুরু করেছেন। এই নিঃসঙ্গতা এতটাই বেড়েছে যে, কেউ মারা যাচ্ছেন, অথচ জানতেই পারছেন না আশপাশের লোকেরা। একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যা দেখলে বোঝা যায়, কতটা একাকিত্বের মধ্যে বেঁচে আছে তরুণ প্রজন্ম। জীবনের শেষ মুহূর্তেও এঁদের পাশে থাকেননি কোনও প্রিয়জন।
দীর্ঘ দিন ধরেই জনসংখ্যা হ্রাসের সমস্যায় ভুগছে চিন। সূত্রের খবর, চিনে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। দম্পতিরা সন্তানপালনে আগ্রহ হারিয়েছেন। ফলে পরিবার নামক বস্তুটির ধারণা ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। জন্মহার কমে এসেছে। যে বয়সে মানুষ সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম থাকে, সেই বয়সের মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে।
৩৮ বছর বয়সি উইলসন হাউ। কর্মসূত্রে পরিবারের থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন। কারণ তিনি ভাড়াবাড়িতে একাই থাকেন। আগে তিনি সপ্তাহে দু’বার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। বর্তমানে একটি প্রকল্পের জন্য তাঁদের থেকে দূরেই থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় তাঁকে অফিসেই রাত কাটাতে হয়। নিঃসঙ্গ মৃত্যুভয় তাঁকেও কাবু করে ফেলেছিল। তাই অ্যাপটির গ্রাহক হয়েছেন হাউ।
শে নামের এক চিনা তরুণী সমাজমাধ্যমে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, যাঁরা একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাঁরা সকলের অলক্ষে বা অজান্তেই মারা যেতে পারেন। সাহায্যের জন্য ডাকার কেউ থাকবে না। আতঙ্ক ফুটে উঠেছে তরুণীর পোস্টে। শে লিখছেন, ‘‘আমি মাঝেমাঝে ভাবি, যদি একা মারা যাই, তা হলে আমার মৃতদেহ কে নেবে?’’
চিনা সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চিনে একাকী বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, তরুণ চাকুরিজীবী এবং যাঁরা অন্তর্মুখী স্বভাবের, তাঁদের জন্য এটি দারুণ কাজের।
বেশ কয়েক বছর ধরেই আর্থিক এবং সামাজিক দু’দিক থেকেই দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে চিন। দীর্ঘ দিন ধরেই জনসংখ্যা হ্রাসের সমস্যায় ভুগছে চিন। করোনা অতিমারি বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই দেশটিকে বিবিধ সমস্যার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল জন্মহারে তীব্র হ্রাস।
অ্যাপটি ব্যাপক ভাবে সফল হলেও, এর নামটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে অশুভ বা দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করছেন। ফলে নির্মাতা সংস্থা নাম বদলে ‘তুমি কি ঠিক আছ?’ বা ‘তুমি কি বেঁচে আছ?’ এর মতো বিকল্পগুলি বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। সংস্থাটি গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া স্বীকার করেছে এবং অ্যাপটির নাম পরিবর্তন করার কথা বিবেচনা করছে বলে সূত্রের খবর।
সব ছবি: সংগৃহীত।