Cannibalism In Papua New Guinea

মৃত প্রিয়জনকে খেয়ে ফেলাই ছিল রীতি, মস্তিষ্ক যেত মহিলা, শিশুদের পেটে! ‘মাথাখেকো’ কীটের দংশনে উজাড় হয় জনজাতি

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনির জনগোষ্ঠীটি বিশ্বাস করে, প্রিয়জনের দেহ কীটপতঙ্গ এবং পোকামাকড়ের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মৃত ব্যক্তির নিকটজনেরাই তাঁকে খেয়ে ফেললে অনেক ভাল। সেই বিশ্বাস থেকেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তিদের ভক্ষণ করতেন পুরুষ, নারী, শিশু নির্বিচারে সকলেই।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২৪
০১ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

বড় আদিম সেই প্রথা। সময়ের সারণি বেয়ে মানবসভ্যতা আধুনিক হলেও পৃথিবী থেকে এখনও পুরোপুরি লুপ্ত হয়ে যায়নি নরখাদকদের অস্তিত্ব। নরখাদকদের নিয়ে বহু ঘটনাই উঠে আসে। এই মানবগ্রহের বিচ্ছিন্ন অংশে এমনও কিছু প্রথা রয়েছে যা হতবাক করে দেওয়ারই মতো। এমনই একটি প্রথা হল স্বজনকে ভক্ষণ।

০২ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনিতে বাস করেন ফোর সম্প্রদায়ের লোকজন। দ্বীপটির পূর্বাঞ্চলীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত লক্ষ করা যেত এক অদ্ভুত প্রথা। তার নাম এন্ডোক্যানিবলিজ়ম, নিজের সম্প্রদায়ের মৃত সদস্যদের ভক্ষণ।

০৩ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

এটি শোক এবং শ্রদ্ধার মিলিত আচার। ফোর সম্প্রদায়ের কাছে এন্ডোক্যানিবলিজ়ম ছিল মৃতদের সম্মান জানানোর এবং পরিবারের মধ্যে তাঁদের সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার রীতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসা এই রীতিকে ভালবাসা এবং করুণা বলে মনে করতেন সদস্যেরা। ফোর সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিশ্বাস করতেন, মৃতদেহ মাটিতে সমাধি দিয়ে পোকামাকড়ের গ্রাসে যাওয়ার চেয়ে প্রিয়জনদের পেটে যাওয়া বহু গুণে শ্রেয়।

Advertisement
০৪ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

তাঁরা বিশ্বাস করতেন, কীটপতঙ্গ এবং পোকামাকড়ের চেয়ে মৃতদেহটি মৃতের নিকটজনেরা খেয়ে ফেললে অনেক ভাল। এই ধারণা থেকেই অস্বাভাবিক এই প্রথাটির জন্ম বলে মনে করেন নৃতাত্ত্বিকদের একাংশ। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তিদের ভক্ষণ করতেন পুরুষ, নারী, শিশু নির্বিশেষে সকলেই।

০৫ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

পুরুষেরা তাঁদের মৃত আত্মীয়দের মাংস খেতেন। অন্য দিকে মহিলা এবং শিশুরা মৃত ব্যক্তির মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের অংশ খেতেন। হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে গিয়ে গোটা জনজাতি নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে। দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যবাহী ‘ভোজের’ কারণে নিশ্চিহ্ন হতে শুরু করেন মহিলা ও শিশুরা।

Advertisement
০৬ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

মহিলারা সাবধানে মস্তিষ্ক বার করে, ফার্নের সঙ্গে মিশিয়ে বাঁশের নলের ভিতরে রান্না করতেন। পুরুষেরা শরীরের প্রায় সমস্ত অংশ ভেজে খেয়ে ফেলতেন। পড়ে থাকত কেবল পিত্তথলি। প্রাপ্তবয়স্ক মহিলারাই মূলত এই কাজের জন্য বেশি উৎসাহী হতেন। শিশুরা মাঝেমাঝে তাদের মায়ের কাছ থেকে অল্প পরিমাণে খাবার গ্রহণ করে এই রীতিতে অংশগ্রহণ করত।

০৭ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

গোষ্ঠীটি বিশ্বাস করত, মহিলাদের দেহ মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিপজ্জনক আত্মাকে নিরাপদে ধারণ এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নিউ ইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী শার্লি লিন্ডেনবাউমের মতে, ফোরের মহিলারা মৃতদেহ গ্রহণ করার এবং এটিকে শরীরের ভিতরে একটি নিরাপদ স্থান দেওয়ার ভূমিকা গ্রহণ করতেন।

Advertisement
০৮ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পাপুয়া নিউ গিনির পূর্বাঞ্চলে উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে এক রহস্যময় রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর ফলে পুরো গ্রাম প্রাপ্তবয়স্ক নারীহীন হয়ে পড়ে। সেই অজানা রোগকে ফোর সম্প্রদায়ের সদস্যেরা ‘কুরু’ বলে ডাকতেন, যার অর্থ কাঁপুনি।

০৯ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগী হাত-পায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেন। প্রথমে হাঁটতে সমস্যা অনুভব করতেন এবং এক বছরের মধ্যে তাঁরা দাঁড়াতে, খেতে বা তাঁদের শারীরিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। এমনকি অনিচ্ছাকৃত হাসির মতো সমস্যাও দেখা দিতে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের মধ্যে।

১০ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

১৯৩০ সাল পর্যন্ত এই উপজাতিটি বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বলা চলে। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে মহামারির তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্ব জুড়ে সেই সব গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যাঁরা এই রোগটির কারণ বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কারণ তখনও এর কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মানুষেরা মনে করতেন, মৃত মানুষের আত্মা ভর করেছে বা কোনও জাদুবিদ্যার প্রভাবে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে ফোর সমাজে।

১১ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

কিছু গ্রামে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা এবং আট বছরের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল এই রোগে। কিছু অঞ্চলে প্রায় কোনও ফোর যুবতীই অবশিষ্ট ছিলেন না। ৫০-এর দশকে, মহামারিটি ফোর উপজাতিকে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে দিচ্ছিল। পাপুয়া নিউগিনির এই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে পুরুষ-মহিলার অনুপাতের ভারসাম্য ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

১২ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

গবেষকেরা প্রথমে আশঙ্কা করেছিলেন কোনও দূষিত পদার্থ থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়ার। তত দিন এই এন্ডোক্যানিবলিজ়মের ধারণাটি লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। জীববিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদদের ধারণা ছিল, কোনও জিনগত ত্রুটি এই মহামারির নেপথ্যকারণ হতে পারে। পরে ফোরের আত্মীয়-ভক্ষণের প্রথা প্রকাশ্যে আসার পর বিজ্ঞানীদের ধারণা মুহূর্তে পাল্টে যায়।

১৩ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

কুরু নামের রোগটির কারণ হল প্রিয়ন নামের সংক্রামক প্রোটিন কণা। এই কণা মস্তিষ্কের সাধারণ প্রোটিনকে অস্বাভাবিক আকারে রূপান্তরিত করে স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক রোগ ডেকে আনে। এই রোগের নিরাময় নেই। চিকিৎসকেরা দেখেন, কুরুর সঙ্গে নরমাংস ভক্ষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আক্রান্ত রোগীর মস্তিষ্ক খাওয়ার ফলে তরুণীদের মধ্যে বহু বছর ধরে সংক্রামিত হয়ে আসছে রোগটি। সংক্রামিত মানুষের কলা-কোষ খাওয়ার ফলে কুরু নামক এই মারাত্মক নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ দেখা দেয়। এক পর্যায়ে প্রতি বছর ফোর জনসংখ্যার ২ শতাংশ এই রোগে প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।

১৪ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

রোগজীবাণুদের শ্রেণিবিন্যাসে, প্রিয়ন একটা ভাইরাসের চেয়েও ভয়াবহ এবং একে দমন করা কঠিন। অ্যান্টিবায়োটিক বা রেডিয়েশন দিয়েও এর চিকিৎসা করা যায় না। ফরমালিনের মতো শক্তিশালী জীবাণুনাশক প্রিয়নকে আরও বেশি বিষাক্ত করে তোলে। প্রিয়ন পরিষ্কার করার একমাত্র উপায় হল প্রচুর পরিমাণে কড়া ব্লিচ ব্যবহার করা, যেটি মানুষের উপর প্রয়োগ করা অসম্ভব।

১৫ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

১৯৫০ সালে এই মারাত্মক প্রথাটি নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরেই কুরুর প্রকোপ কমতে শুরু করে। এই প্রথা বন্ধ হওয়ার কয়েক দশক পরেও, কিছু গ্রামে কুরুর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব স্পষ্ট ছিল। যে হেতু প্রিয়ন আক্রান্ত কলা-কোষগুলিতে বছরের পর বছর ধরে সুপ্ত থাকতে পারে, তাই মৃতদের মাংস খাওয়া বন্ধ হওয়ার অনেক পরেও কিছু কিছু ঘটনা দেখা দিতে থাকে।

১৬ ১৬
Cannibalism In Papua New Guinea

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল আল্পার্স কয়েক দশক ধরে কুরু রোগের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন। আল্পার্সের মতে, কুরুতে আক্রান্ত শেষ ব্যক্তি ২০০৯ সালে মারা যান। এই রোগের উপর নজরদারি ২০১২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তার পরই এই ভয়ঙ্কর মহামারিটিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সমাপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি