দেশ-বিদেশ ঘুরে সাধ মিটে গিয়েছে। স্বাদবদলের জন্য পৃথিবীর গণ্ডি ছাড়িয়ে চাঁদে বে়ড়াতে যেতে চাইলে তারও ব্যবস্থা পাকা। ভবিষ্যতে চাঁদে মধুচন্দ্রিমা বা অবকাশযাপনের ইচ্ছা হলে সেই স্বপ্ন বাস্তব হতে পারে আমার-আপনার। তার জন্য অবশ্য মোটা টাকা খসাতে হবে পকেট থেকে। পৃথিবী থেকে কয়েক লক্ষ কিলোমিটার দূরে উপগ্রহে নির্মাণ করা হবে বিলাসবহুল হোটেল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টার্ট আপ সংস্থার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে আসতেই হইচই পড়ে গিয়েছে। পৃথিবীর বাইরে স্থায়ী কোনও বাসস্থান তৈরির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ করতে চলেছে গ্যালাকটিক রিসোর্স ইউটিলাইজ়েশন স্পেস। সংক্ষেপে জিআরইউ স্পেস। হোটেলের বুকিংয়ের জন্য এক ধাপ এগিয়ে সংস্থাটি ঘোষণা করেছে যে তারা হোটেলে থাকার জন্য অগ্রিম বুকিংও চালু করে দিয়েছে।
২০৩২ সালের মধ্যে চন্দ্রপৃষ্ঠে একটি বাসযোগ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে জিআরইউ। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেলেই তা কার্যকর হবে। সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ঘোষণা করা হয়েছে যে, জনপ্রতি অতিথির জন্য আনুমানিক খরচ ২.২ কোটি টাকা (২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার) থেকে ৯ কোটি টাকা (১০ লক্ষ ডলার) পর্যন্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর উপগ্রহে অবকাশযাপনের অভাবনীয় অভিজ্ঞতার জন্য ৯০ কোটি টাকাও যথেষ্ট নয়। এক বার চাঁদে ঘুরে আসতে এর থেকেও বেশি টাকা খরচ হতে পারে, এমনটাই আভাস দিয়েছে স্টার্ট আপ সংস্থা। জিআরইউ স্পেস চাঁদে ছুটি কাটানোর জন্য ১২ জানুয়ারি থেকে হোটেল বুকিং শুরু করে দিয়েছে বলে খবর।
আবেদনকারীদের বুকিং নিশ্চিত করার জন্য ১,০০০ ডলার ধার্য করা হয়েছে। প্রথমেই আগ্রহীকে এই আবেদনের টাকা জমা দিতে হবে। এই টাকা ফেরতযোগ্য নয়। সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত জমা দেওয়া যাবে। জিআরইউ স্পেস আরও জানিয়েছে যে আবেদনকারীদের বাছাই করার আগে তাঁদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পৃথিবীর বুক থেকে উড়িয়ে চাঁদে নিয়ে যাওয়া থেকে ঘোরাঘুরির পর নিরাপদে আবার ফিরিয়ে আনা, সমস্ত দায়িত্ব এই সংস্থার।
যাঁরা মহাকাশ ভ্রমণের স্বাদ পেতে চান তাঁদের সমস্ত কিছু যাচাই করে দেখবে ক্যালিফোর্নিয়ার এই স্টার্ট আপ প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকদের নিরাপদে চন্দ্র অভিযানের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত। বুকিংয়ের বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, তাঁদের এই প্রকল্প প্রচলিত মহাকাশ পর্যটনের মতো নয়। মাত্র ১২ জন মানুষ চাঁদে হেঁটেছেন। যাঁরা আগ্রহী হবেন, তাঁরাই প্রথম পৃথিবীর বাইরে জীবনের ভিত্তি স্থাপনের পরিকল্পনায় সংস্থার সঙ্গী হতে পারবেন।
অভিযানের সময়সূচির দিকে তাকালে দেখা যাবে, ২০২৯ সালে জিআরইউয়ের ল্যান্ডারটি চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবে বলে আশা করা হয়েছে। পৃথিবীতেই হোটেলের প্রাথমিক পরিকল্পিত কাঠামোটি তৈরি করা হবে। ল্যান্ডারের কাজ হল সেই কাঠামোটি বহন করে নিয়ে চাঁদের মাটিতে পৌঁছে দেওয়া।
সেই অভিযানের সাফল্যের উপরেই পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নির্ভর করবে। নাসার সহায়তায় মার্কিন সংস্থাটি চাঁদের ধুলোকে ইটে পরিণত করার পরিকল্পনাও করেছে, যা পরবর্তী কালে হোটেলটিকে বিকিরণ এবং চরম তাপমাত্রা থেকে সুরক্ষা দিতে কাজে লাগানো হবে। এ ছাড়াও মহাকাশ নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হল পৃথিবী থেকে ভারী উপকরণ পরিবহণের অত্যধিক খরচ। সেই খরচ মোকাবিলা করতে চাঁদের মাটি দিয়েই ইট তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে অস্থায়ী বাসস্থানের স্থায়িত্ব এবং পরিবেশের খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রথমে একটি স্ফীত কাঠামো স্থাপন করা হবে। সেই প্রকল্প সফল হলে সংস্থাটি একটি বিশেষ গঠনের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার কাজে হাত দেবে। চাঁদের মাটিতে প্রাকৃতিক গর্তের ভিতরে পরিপূর্ণ হোটেলের নকশা ফুটিয়ে তুলবেন সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারেরা।
জিআরইউ স্পেসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তরুণ উদ্যোগপতি স্কাইলার চ্যানের হাত ধরে। ২০২৫ সালে। ২২ বছরের এই আমেরিকান-কানাডীয় ই়ঞ্জিনিয়ার জানিয়ে দিয়েছেন, মানবজাতি ও মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্য গ্রহে বসতি স্থাপন ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে থেকে ইলেকট্রিক্যাল ই়ঞ্জিনিয়ারিং এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক চ্যান। পড়াশোনা শেষ করার পর বেশ কিছু দিন বৈদ্যুতিক গাড়িনির্মাতা সংস্থা টেসলায় ইন্টার্ন হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। এই স্টার্টআপটির কর্ণধার চ্যানের দাবি, স্পেসএক্স, ওয়াই কম্বিনেটর এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যান্ডুরিল’-এর মতো সংস্থা তাঁর এই প্রকল্পের অংশীদার।
চ্যানের মতে, অন্যান্য মহাকাশ পর্যটনের মতো এই ভ্রমণ শুধু বেড়ানোর আনন্দ দেবে না। বরং চাঁদকে ঘিরে নতুন এক অর্থনীতির সূচনা হতে পারে বলে আশাবাদী তিনি। তাঁর মতে, চন্দ্র অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য চন্দ্র পর্যটনই সেরা পদক্ষেপ। এই প্রকল্প সাফল্যলাভ করলে মহাকাশে বসবাসের সম্ভাবনার নতুন নতুন দিক উন্মোচিত করবে বলে মনে করেন তরুণ এই উদ্যোগপতি।
যদিও হোটেলভাড়ার চূড়ান্ত মূল্য আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ওয়াকিবহাল মহলের অনুমান একটি একক কক্ষের ভাড়া ১ লক্ষ ডলারেরও বেশি হতে পারে। নির্বাচিত হওয়ার পরেও অতিথিদের বিস্তারিত চিকিৎসা নথি, ব্যক্তিগত এবং আয়ের নথি জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাঁরা এই ভ্রমণের জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য কি না তা খতিয়ে দেখা হবে, এমন শর্তই দিয়েছে সংস্থাটি।
২০৩২ সালের মধ্যে অতিথিদের চাঁদে ঘুরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়ে যাবে বলে অনুমান সংস্থাটির। প্রাথমিক পর্যায়ে, শুধুমাত্র বাণিজ্যিক মহাকাশযানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভ্রমণকারীদের চাঁদের অভিযানে পাঠানো হবে। হোটেলটি শুরু হলে চাঁদের মাটিতে পা রাখার ছাড়পত্র মিলবে সাধারণ মানুষদের। তবে তার জন্য পকেটে থাকতে হবে অন্তত ১০০ কোটি টাকা।
সব ছবি: সংগৃহীত।