এ যেন ঢিলটি মারলে পাটকেল ছোড়ার হুমকি! আর সেই ওষুধে কাজ হল ম্যাজিকের মতো। বিশ্বের সর্ববৃহৎ দ্বীপ দখলের জেদ থেকে অনেকটা সরে এলেন সুপার পাওয়ার দেশের ‘খ্যাপা’ প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি, শুল্ক-সংঘাত মিটিয়ে ফেলার ইঙ্গিতও দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ইউরোপের কোন চালে ভেস্তে গেল তাঁর ধনুকভাঙা পণ? এই ঘটনায় কতটা লাভবান হবে ভারত?
চলতি বছরের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই গ্রিনল্যান্ড কব্জা করতে চেয়ে সুর চড়ান মার্কিন প্রেসি়ডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ইস্যুতে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে বিরোধ তীব্র হলে, তাদের শুল্ক হুমকি দিতে শুরু করেন তিনি। বলেন, ‘‘আটটি বন্ধু রাষ্ট্রের পণ্যের উপর এ বার অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর চাপাবে মার্কিন প্রশাসন।’’ এর পরই যুক্তরাষ্ট্রের উপর ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ প্রয়োগ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ২৭ দেশের সংগঠনটি জানিয়ে দেয়, ওয়াশিংটন শুল্ক-বাণ প্রয়োগ করলে ‘বাজ়ুকা’য় জবাব দেবে তারা।
ইইউ-এর এই হুঁশিয়ারির পর পিছু হটেন ট্রাম্প। তড়িঘড়ি ঘোষণা করেন, ওই আট ‘বন্ধু’ দেশের পণ্যে শুল্ক চাপানো হচ্ছে না। পাশাপাশি, ‘সবুজ দ্বীপ’-এর ব্যাপারেও যথেষ্ট নরম অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সম্প্রতি সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেন, ‘‘অনেকেই ভেবেছিলেন, আমি বলপ্রয়োগ করব। কিন্তু সেটা আমায় করতে হবে না। আমি বলপ্রয়োগ করতে চাই না। আমি বলপ্রয়োগ করব না।’’
দাভোসে ট্রাম্পের মুখে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে এ-হেন মন্তব্য শোনার পর দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ‘বাজ়ুকা’র ভয়ে আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর থেকে যাবতীয় শুল্ক প্রত্যাহার করবেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট। গত বছরের জুলাইয়ে হওয়া বাণিজ্যচুক্তিতে সহমতের ভিত্তিতে তা ধার্য করে ওয়াশিংটন। এর অঙ্ক ১৫ শতাংশ ঠিক করা হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হল কী এই ‘বাজ়ুকা’? কেন এর ভয়ে থরহরি কম্প দশা হচ্ছে সুপার পাওয়ার দেশের প্রেসিডেন্টের? এক কথায় বলতে গেলে, ‘বাজ়ুকা’ একটি আর্থিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তা চালু করতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট। যে দেশের বিরুদ্ধে ‘বাজ়ুকা’ প্রয়োগ করা হবে, তার সঙ্গে আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ২৭টি রাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে বিপুল লোকসানের মুখে পড়তে পারে আমেরিকা। ট্রাম্প যে সেই আতঙ্কে ভুগছেন, তা বলাই বাহুল্য।
২০২১ সালের শেষের দিকে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে প্রথম বার ওঠে ‘বাজ়ুকা’র প্রস্তাব। ২০২৩ সালে তাতে অনুমোদন দেয় ২৭টি দেশের ওই সংগঠন। ঠিক তার পরেই এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিবৃতি দেয় তারা। বলা হয়, ইইউ-বহির্ভুত দেশগুলির আর্থিক চাপ থেকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে রক্ষা করবে ‘বাজ়ুকা’। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এতে সবুজ সঙ্কেত দেওয়ার আগে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাতে জড়িয়েছিল ইইউ-ভুক্ত লিথুয়ানিয়া। সেখানে নিষেধাজ্ঞা নীতি ম্যাজিকের মতো কাজ করায় ‘বাজ়ুকা’র আইনি স্বীকৃতি পেতে সময় লাগেনি।
২০২১ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে (রিপাবলিক অফ চায়না) দূতাবাস খোলার অনুমতি দেয় ইইউ-এর সদস্য লিথুয়ানিয়া। শুধু তা-ই নয়, সাবেক ফরমোজ়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তারা। বিষয়টিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি বেজিং। কারণ, তাইওয়ানকে বরাবরই নিজেদের অভিন্ন অংশ বলে দাবি করে এসেছে ড্রাগন। লিথুয়ানিয়ার পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির পৃথক পরিচিতি যে জোরালো হয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে ইইউ সদস্যটিকে উচিত শিক্ষা দিতে তৎপর হয় চিন।
ওই বছরই ডিসেম্বরে ড্রাগনভূমির বন্দরগুলিতে লিথুয়ানিয়ার পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বেজিং। তাদের বেশ কিছু সামগ্রী আটকে রাখার অভিযোগও ওঠে চিনা শুল্ক দফতরের বিরুদ্ধে। ফলে রাতারাতি তলানিতে চলে যায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় লিথুয়ানিয়ার পাশে দাঁড়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাকি ২৬টি সদস্য রাষ্ট্র। পাল্টা মান্দারিনভাষীদের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় তারা। ফলে পিছু হটতে বাধ্য হয় চিন। লিথুয়ানিয়ার উপর থেকে যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় তারা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের দাবি, এই ঘটনা ‘বাজ়ুকা’ তৈরির ভিত গড়ে দিয়েছিল। আমেরিকার উপর এই অমোঘ অস্ত্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রয়োগ করলে ট্রাম্প যে বেকায়দায় পড়বেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ২০ শতাংশ চলে ইইউ-এর সঙ্গে। অর্থাৎ, সাড়ে সাত লক্ষ কোটি ডলারের আমদানি-রফতানির মধ্যে দেড় লক্ষ কোটি ডলারের পণ্য ইউরোপের ওই ২৭টি দেশের সংগঠন থেকে কেনাবেচা করে থাকে ওয়াশিংটন।
গত আর্থিক বছরে (২০২৪-’২৫) ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি পণ্যের অঙ্ক ছিল ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অন্য দিকে, ওয়াশিংটন থেকে ৫৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার মূল্যের সামগ্রী কিনেছিল ওই ২৭ রাষ্ট্রের সংগঠন। যদিও পরিষেবা খাতে ইইউ-এর সঙ্গে আমেরিকার বেশ কিছুটা বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে। এর অঙ্ক ১৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে।
২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে পরিষেবা খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের থেকে আমেরিকার আমদানির পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। অন্য দিকে ওই ২৭ দেশের সংগঠনকে ৩২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের পরিষেবা রফতানি করেছে ওয়াশিংটন। বর্তমানে পণ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে ইইউ-এর ঘাটতির অঙ্ক ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাপিয়ে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই কারণেই ভারত বা চিনের মতো দেশগুলির তুলনায় ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি লাভজনক, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
গত বছর এপ্রিলে হঠাৎ করেই পুরনো নিয়ম ভেঙে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নীতি চালু করেন ট্রাম্প। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলির পণ্যের উপর চড়া হারে কর চাপিয়ে দেয় ওয়াশিংটন। এর পর কিছুটা বাধ্য হয়েই জুলাইয়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সেরে ফেলে ইইউ। সেখানে কিছু পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে উভয় পক্ষ। বাকি ক্ষেত্রগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের ব্যাপারে সম্মত হয় ২৭ রাষ্ট্রের ওই সংগঠন।
এই বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার কিছু দিন পর ইইউ-এর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন জের লেইনকে হোয়াইট হাউসকে ডেকে এনে ধমকান ট্রাম্প। তাঁর দাবি, সমঝোতা অনুযায়ী আমেরিকার থেকে ৭০ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে বাধ্য ইউরোপের ওই ২৭ দেশের সংগঠন। এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ৬০ হাজার কোটি ডলার লগ্নি করতে হবে তাদের। অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হতে বলে উরসুলাকে চাপ দেন তিনি।
ট্রাম্পের ওই হুমকিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ড কব্জা করতে চাইলে জটিল হয় পরিস্থিতি। কানাডা সংলগ্ন বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপটির প্রকৃত মালিকানা রয়েছে ডেনমার্কের হাতে। সেই কারণেই একে ইউরোপের অংশ বলে মনে করে ইইউ। নতুন বছরে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালাবে বলে জল্পনা তীব্র হতেই রুখে দাঁড়ায় ২৭ দেশের ওই সংগঠন। এ ব্যাপারে ব্রিটেনকেও পাশে পেয়েছে তারা।
গত বছর জুলাইয়ে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তিকে এখনও অনুমোদন দেয়নি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প সুর চড়াতেই সেই প্রক্রিয়া স্থগিত করে তারা। সেই সঙ্গে ‘বাজ়ুকা’ চালু করার পাল্টা হুমকি দেয় ২৭ দেশের ওই সংগঠন। ইইউ শেষ পর্যন্ত সেই পদক্ষেপ করলে ইউরোপের বিস্তীর্ণ বাজার হারাবেন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপতিরা। সেই চাপেই ‘পোলভল্ট’ দিতে দেখা গিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘বাজ়ুকা’ চালু করলে রাতারাতি শূন্যে নেমে আসবে ১.৬৮ লক্ষ কোটি ডলারের মার্কিন বাণিজ্য। সে ক্ষেত্রে ঘরোয়া বাজারে তৈরি হতে পারে বিপুল ঘাটতি। সেটা পূরণ করার মতো কোনও বিকল্প তাস আপাতত হাতে নেই ট্রাম্পের। তবে ‘সবুজ দ্বীপের’ দাবি যে সহজে ছাড়ছেন না, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসি়ডেন্ট। সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অনুষ্ঠানে গ্রিনল্যান্ডকে ‘আমাদের অঞ্চল’ বলে উল্লেখ করতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
তবে ‘সবুজ দ্বীপের’ ব্যাপারে আগামী দিনে ট্রাম্প ফের নাছোড় মনোভাব দেখালে অন্য তাস বার করতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সে ক্ষেত্রে মার্কিন বন্ড থেকে পুরোপুরি মুখ ঘোরাতে পারে এই ২৭ দেশের সংগঠন। তা ছাড়া ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আমেরিকার সম্পত্তি আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অবশ্য বলেছেন, ‘‘ইইউ এই ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত নিলে চরম প্রত্যাঘাত হানবে ওয়াশিংটন।’’
এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ়ে বিশেষ অতিথি হয়ে ভারতে আসছেন উরসুলা ভন জের লেইন। ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এ দেশে থাকবেন তিনি। এই সফরের মধ্যে নয়াদিল্লির সঙ্গে মেগা বাণিজ্যচুক্তি করার কথা রয়েছে তাঁর, যাকে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ বলে উল্লেখ করেছে ইইউ। আগামী দিনে ট্রাম্পের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক আরও খারাপ হলে ২৭ দেশের সংগঠনটি আরও বেশি করে ভারতের দিকে ঘুরতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
সব ছবি: সংগৃহীত।