একটি যুদ্ধ কোনও অঞ্চলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় হয়েছিল। যুদ্ধের পর ‘শান্তির মহাদেশে’ রূপান্তরিত হয়েছিল ইউরোপ। পরবর্তী পাঁচ দশকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সীমান্ত প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। মিলেমিশেই থাকছিল বেশির ভাগ দেশ।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাত দশকেরও বেশি সময় পরে এখন দু’টি দেশের যুদ্ধ আবারও মহাদেশটির মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। অনেক ইউরোপীয় দেশে সেনাবাহিনীতে অতিরিক্ত নিয়োগ শুরু হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হিসাবেও আবির্ভূত হয়েছে মহাদেশটি!
সুইডেনের প্রতিরক্ষা সমীক্ষা সংস্থা ‘স্টকহলম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (সিপ্রি)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, ইউক্রেন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ এবং সাতটি ইউরোপীয় দেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অস্ত্র আমদানিকারক দেশের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হিসাবে ইউক্রেনের পরে রয়েছে ভারত (৮.২ শতাংশ), সৌদি আরব (৬.৮ শতাংশ), কাতার (৬.৪ শতাংশ) এবং পাকিস্তান (৪.২ শতাংশ)।
সিপ্রির ২০২১-২০২৫ সালের তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ইউরোপ বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হিসাবে এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়াকে ছাপিয়ে গিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র আমদানির ৪২ শতাংশ আমদানি করেছে এশিয়া এবং ওশিয়ানিয়া। তার পরে ছিল পশ্চিম এশিয়া। পশ্চিম এশিয়া আমদানি করত ৩২ শতাংশ। অন্য দিকে, ওই সময়ের মধ্যে ইউরোপ আমদানি করেছিল মাত্র ১২ শতাংশ অস্ত্র।
তবে গত চার বছরে বিশ্ব জুড়ে চলা অস্ত্রবাণিজ্য সম্পূর্ণ ভাবে বদলে গিয়েছে। ২০২১-’২৫ সালের মধ্যে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের রফতানি হয়েছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ। তার পরে রয়েছে এশিয়া এবং ওশিয়ানিয়া। ৩১ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করেছে তারা। পশ্চিম এশিয়ায় রফতানি হয়েছে ২৬ শতাংশ অস্ত্র।
অর্থাৎ, মাত্র চার বছরে ইউরোপে অস্ত্রের আমদানি প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ১২ শতাংশ থেকে সটান পৌঁছে গিয়েছে ৩৩ শতাংশ, যা রাশিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। ইউরোপের মধ্যে অস্ত্র আমদানিকারকদের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইউক্রেন এবং পোল্যান্ড।
২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র আমদানির মাত্র ০.১ শতাংশ হয়েছিল ইউক্রেনে। তবে ২০২২ সালে রাশিয়ার সঙ্গে সে দেশের সংঘর্ষ বাধার পর পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ৯.৭ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করে ইউক্রনের প্রেসি়ডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির সরকার।
২০২২ সালে রাশিয়ার তরফে ইউক্রেনের মাটিতে আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে কমপক্ষে ৩৬টি দেশ থেকে অস্ত্র ঢুকেছে ইউক্রেনে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউক্রেনে সবচেয়ে বেশি যে তিনটি দেশ থেকে অস্ত্র ঢুকেছে সেগুলি হল— আমেরিকা (৪১ শতাংশ), জার্মানি (১৪ শতাংশ) এবং পোল্যান্ড (৯.৪ শতাংশ)।
একই ভাবে ২০১৬-’২০ সালের মধ্যে যেখানে সারা বিশ্বের অস্ত্র আমদানির ০.৪ শতাংশ পোল্যান্ডে হয়েছিল, সেখানে ২০২১-’২৫ সালের মধ্যে ওই দেশে অস্ত্র আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩.৬ শতাংশ। সিপ্রির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘‘রাশিয়ার হুমকি এবং ইউরোপীয় বন্ধুদের রক্ষা করার জন্য আমেরিকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে অস্ত্রের চাহিদা বাড়িয়েছে।’’
গত চার বছরে ইউরোপের নেটো সদস্য দেশগুলি তাদের অস্ত্র আমদানি বৃদ্ধি করেছে। ২০১৬-’২০ এবং ২০২১-’২৫ সালের মধ্যে ২৯টি ইউরোপীয় নেটো রাষ্ট্রের অস্ত্র আমদানি ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১-’২৫ সালের মধ্যে ওই দেশগুলির মোট অস্ত্র আমদানির অর্ধেকেরও বেশি (৫৮ শতাংশ) এসেছে আমেরিকা থেকে।
২০২৫ সালে নেদারল্যান্ডসের হেগে অনুষ্ঠিত নেটো শীর্ষ সম্মেলনে ৩২টি নেটো সদস্য দেশ (স্পেন বাদে) ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের বার্ষিক জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কিত খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। ‘হেগ বিনিয়োগ পরিকল্পনা (দ্য হেগ ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান)’ নামে পরিচিত সেই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি হুমকির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা জোরদার করা।
ইউক্রেন এবং পোল্যান্ড ছাড়াও বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অস্ত্র আমদানিকারকের তালিকায় আরও পাঁচটি ইউরোপীয় দেশ রয়েছে— ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, গ্রিস এবং নরওয়ে। ২০১৬-’২০ সালের তুলনায় ২০২১-’২৫ সালে নেদারল্যান্ডসে অস্ত্র আমদানি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই ভাবে গত চার বছর ধরে জার্মানির অস্ত্র আমদানির পরিমাণ ০.২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১.৭ শতাংশ হয়েছে। ০.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১.৫ শতাংশ হয়েছে গ্রিসে। ডেনমার্কে ০.২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে আবার হয়েছে ১ শতাংশ। শেষ চার বছরে বেলজিয়ামেও অস্ত্র আমদানি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে ইউরোপীয় দেশগুলির ক্রমবর্ধমান অস্ত্রের চাহিদা সরাসরি উপকৃত করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, দু’দশকের মধ্যে প্রথম বারের জন্য ২০২১-’২৫ সালে মার্কিন অস্ত্র রফতানির সবচেয়ে বড় অংশ (প্রায় ৩৮ শতাংশ) ইউরোপে গিয়েছে। ফলে এর থেকে স্পষ্ট যে, ইউরোপ এখনও সামরিক প্রযুক্তি এবং অস্ত্র আমদানির জন্য আমেরিকার উপরেই নির্ভরশীল।
আমেরিকা থেকে এখনও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ইউরোপে রফতানির অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ১২টি ইউরোপীয় দেশের কাছে মোট ৪৬৬টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বরাত পেয়েছিল আমেরিকা। ইউরোপের ক্রমবর্ধমান অস্ত্র আমদানি আমেরিকাকে যেমন উপকৃত করেছে, তেমনই কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রও উপকৃত হয়েছে। কারণ, ওই দেশগুলির অস্ত্রে রফতানিও বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ ফ্রান্স ইতিমধ্যেই আমেরিকার পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রফতানি করা দেশ। বিশ্বব্যাপী অস্ত্র রফতানির প্রায় ২১ শতাংশ যায় ফ্রান্স থেকে। একই ভাবে উপকৃত হয়েছে জার্মানিও। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক হিসাবে চিনকে ছাড়িয়ে গিয়েছে দেশটি। তবে ইউরোপের মধ্যে ইটালি তার অস্ত্র রফতানি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি করেছে।
তবে শুধু ইউরোপ নয়, গত চার বছরে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র রফতানির পরিমাণ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সিপ্রি গবেষণার অন্যতম ম্যাথিউ জর্জ লিখেছেন, ‘‘রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে অন্য বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশ তাদের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি অস্ত্র আমদানি শুরু করেছে।’’
বিগত কয়েক বছরে বিশ্বের অনেক অংশে অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ অস্ত্রবাণিজ্য বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ভারত-পাকিস্তান, তাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া, পাকিস্তান-আফগানিস্তান, ইজ়রায়েল-আমেরিকা-ইরানের মধ্যে সংঘাত এবং সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান এবং লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ হয়েছে। ফলে অস্ত্রের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামগ্রিক ভাবে আমেরিকা কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হিসাবে রয়ে গিয়েছে। এমনকি অস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। ২০১৬-’২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র রফতানির ৩৬ শতাংশ করেছিল আমেরিকা। ২০২১-’২৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে তা হয়েছে ৪২ শতাংশ।
বেশি অস্ত্র রফতানিকারক হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। অস্ত্র রফতানিতে তীব্র পতন সত্ত্বেও রাশিয়া তৃতীয় স্থানেই রয়েছে। রাশিয়ার পরে রয়েছে জার্মানি, চিন, ইটালি, ইজ়রায়েল এবং ব্রিটেন। দক্ষিণ কোরিয়া নবম এবং স্পেন দশম স্থানে রয়েছে।
সব ছবি: সংগৃহীত।